Image description

ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ পেশায় আইনজীবী এবং আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) সাধারণ সম্পাদক। খুলনার খালিশপুরে জন্ম হলেও তার পৈতৃক বাড়ি বরিশালের বাবুগঞ্জে। গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল ও ঢাকা কলেজের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়েছেন। পরে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন। ২০০৮ সালে ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল হিসেবে স্বীকৃতি পান। জুলাই আন্দোলনের আগে ও পরে তার বিভিন্ন বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থান আলোচনার জন্ম দেয়। ২০২৫ সালে এবি পার্টির প্রথম কাউন্সিলে তিনি দলটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সম্প্রতি এশিয়া পোস্টের ধারাবাহিক আয়োজন আলাপনে অতিথি হয়ে এসেছিলেন। কথা বলেছেন জুলাই আন্দোলনের অর্জন ও অপূর্ণতা, বর্তমান জাতীয় রাজনীতি, নির্বাচন, জুলাই সনদ এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেছেন রাহাত রূপান্তর

 

এশিয়া পোস্ট: ‘পলাশির প্রান্তরের ২৬০ বছর পর এই দেশের মানুষ আবার জেগে উঠবে’ আপনার এই বক্তব্যটি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় তরুণ প্রজন্মকে ব্যাপকভাবে আন্দোলিত করেছিল। ২০২৪ সালের সেই উত্তাল জুলাইয়ের পর এখন আমরা ২০২৬ সালের জুলাইয়ে দাঁড়িয়ে আছি। এই সময়ের ব্যবধানে জুলাইয়ের প্রাপ্তি ও পার্থক্যকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

 

ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ: পার্থক্যের জায়গাটা আসলে আমাদের তরুণ প্রজন্মের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার পরিবর্তনের মধ্যেই নিহিত। সত্যি বলতে, একসময় আমরা এই প্রজন্মকে নিয়ে প্রায় হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। আমরা দেখতাম, তাদের যেন কোনো বিষয়ে তেমন মাথাব্যথা নেই। ফুটবল, ক্রিকেট, কনসার্ট কিংবা মাদকের নেশাতেই তারা ব্যস্ত। দেশ কোন পথে যাচ্ছে, তা নিয়ে যেন তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিল না। তরুণদের এই উদাসীনতা আওয়ামী লীগকে আরও শক্তিশালী করেছিল। তারা ধরে নিয়েছিল, যা খুশি তাই করতে পারবে।

 

সেই সময় গণমাধ্যমের বড় দায়িত্ব ছিল সমাজের অসঙ্গতি তুলে ধরা। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল বা ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ হলেই যে দেশের সব সমস্যা সমাধান হয়ে যায় না, সেই সত্যটি জাতির সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু আমাদের দেশের বড় বড় লেখক, সাহিত্যিক ও সাংবাদিকদের অনেকেই সেই দায়িত্ব ভুলে ফ্যাসিবাদের তল্পিবাহক হয়ে গিয়েছিলেন।

 

সেই সংকটময় সময়ে আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ছিল তরুণদের তাদের লড়াইয়ের ইতিহাস মনে করিয়ে দেওয়া। লড়াই ছাড়া কোনো জাতি টিকে থাকতে পারে না। ব্যক্তিগত জীবনে আমরা প্রতিদিন বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করি। কিন্তু আমাদের সম্মিলিত জাতীয় জীবনের লড়াইটা কোথায়? যখন কোনো জাতি তার চৈতন্য হারিয়ে ফেলে, তখন রাজনৈতিক কর্মীদের দায়িত্ব হয় তাকে প্রবল ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে তোলা। জুলাইয়ের সেই লড়াই ছিল তরুণদের আত্মপরিচয় খুঁজে পাওয়ার লড়াই।

 

এশিয়া পোস্ট: দীর্ঘ সময় এই তরুণ প্রজন্মকে ফেসবুক, মোবাইল গেমস কিংবা ইউটিউবে আসক্ত বলে সমালোচনা করা হয়েছে। কিন্তু সেই তরুণরাই রাজপথে প্রাণ দিয়ে জুলাই অভ্যুত্থান সফল করল। তাদের ভেতরে এই আমূল পরিবর্তনের মূল কারণ কী ছিল বলে আপনি মনে করেন?

 

ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ: পরিবর্তনের প্রথম কারণ ছিল সরাসরি স্বার্থের প্রশ্ন। মানুষ জন্মগতভাবেই নিজের অস্তিত্ব ও স্বার্থের বিষয়ে সচেতন। গণতন্ত্র বা ভোটের অধিকার হরণ করলে সাধারণ মানুষ অনেক সময় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখায় না। কারণ, তারা মনে করে ভোট দিলেও পরদিন জীবিকার জন্য কাজে বের হতে হবে। কিন্তু কোটা ছিল এমন একটি ইস্যু, যা সরাসরি তরুণদের চাকরির অধিকার ও ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত। তারা যখন দেখল, মেধা থাকা সত্ত্বেও তথাকথিত মুক্তিযোদ্ধা কোটার কারণে তারা চাকরি থেকে বঞ্চিত হতে পারে, তখন তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়। এই স্বার্থ রক্ষার লড়াই জেদে পরিণত হয় যখন আবু সাঈদ, মুগ্ধসহ শত শত তরুণকে রাজপথে গুলি করে হত্যা করা হয়। তখন আন্দোলন আর শুধু কোটার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, এটি আত্মমর্যাদার লড়াইয়ে রূপ নেয়।

 

শেখ হাসিনা মূলত নিজের পতন নিজেই ডেকে এনেছেন। ২০১৮ সালে যে সমস্যার সমাধান হয়ে গিয়েছিল, ২০২৪ সালে আদালতকে ব্যবহার করে তিনি আবার সেই ক্ষত খুঁচিয়ে তুলেছিলেন। মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, যেমন— দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, ভোটাধিকারহীনতা, ভারতের আধিপত্যবাদ এবং আওয়ামী লীগের দুঃশাসন, সব মিলিয়ে এক মহাপ্রলয় বা সুনামির সৃষ্টি হয়েছিল। তরুণদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া সেই জনস্রোত ঠেকানোর ক্ষমতা আর কারও ছিল না।

 

এশিয়া পোস্ট: ২০২৪ সালের জুলাইয়ের অনুভূতির সঙ্গে আজ, অর্থাৎ ২০২৬ সালের জুলাইয়ের অনুভূতির কি কোনো পরিবর্তন ঘটেছে? প্রাপ্তির পাল্লা কতটা ভারী বলে আপনি মনে করেন?

 

ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ: পরিবর্তন হওয়াটাই স্বাভাবিক। মানুষের আকাঙ্ক্ষা সময়কে ছাপিয়ে যায়। যেমন— একজন ছাত্র ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় খারাপ ফল করে মনে করতে পারে তার জীবন শেষ। কিন্তু ১০ বছর পর সেই মানুষই হয়তো দেশের সবচেয়ে সফল বা ধনী ব্যক্তিদের একজন হতে পারে। তাই সফলতাকে তাৎক্ষণিকভাবে বিচার করা যায় না।

 

আজ হয়তো অনেকে মনে করছেন, বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রতিশ্রুতি রাখছে না। ফলে জনমনে কিছুটা হতাশা তৈরি হয়েছে। কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, দীর্ঘ ১৭ বছরের একটি ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান হয়েছে এবং কয়েক দশকের ভারতীয় আধিপত্যবাদ প্রথমবারের মতো পরাজিত হয়েছে।

 

আমাদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের লড়াই একটি চলমান প্রক্রিয়া। আমরা লড়াই করছি বলেই পরিবর্তন হচ্ছে। রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের লড়াই চিরন্তন। শাসকরা সবসময় কম জবাবদিহি করতে চায়, আর জনগণ চায় তাদের জবাবদিহির মধ্যে আনতে। জনগণ জেগে আছে বলেই আজ ক্ষমতার অপব্যবহার হলে মানুষ প্রতিবাদ করছে এবং সরকারও অনেক ক্ষেত্রে তা সংশোধন করতে বাধ্য হচ্ছে।

 

এশিয়া পোস্ট: ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? ১৮ মাসের সাফল্য বা ব্যর্থতাকে দশে কত নম্বর দেবেন?

 

ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ: অন্তর্বর্তী সরকারকে শুধু নম্বর দিয়ে বিচার করা সম্ভব নয়। তারা এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিয়েছিলেন, যখন দেশটা ছিল ডুবে যাওয়া টাইটানিকের মতো। একটি জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন ক্যাপ্টেনের প্রথম কাজ সেটিকে কোনোমতে তীরে ভেড়ানো, কেবিন সাজানো নয়।

 

গত ৮০০ বছরের ইতিহাসে বাংলাদেশে এমন জেনোসাইড বা গণহত্যা আর কখনো হয়নি। আমাদের নিজেদের ট্যাক্সের টাকায় কেনা বুলেট দিয়ে আমাদেরই মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। অর্থনীতি ছিল ধ্বংসের মুখে। ব্যাংকগুলোতে টাকা ছিল না, রিজার্ভ তলানিতে নেমে গিয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণত দুর্ভিক্ষ বা গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা থাকে। কিন্তু ড. ইউনূসের নেতৃত্বে দেশ সেই ভয়াবহ পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠেছে।

 

ভারত থেকে অনলাইনে ব্যাপক অপপ্রচার ও গুজব ছড়ানো হয়েছে। দেশের ভেতরে আওয়ামী লীগের বিশাল সুবিধাভোগী একটি গোষ্ঠীও সক্রিয় ছিল। তাদের ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে দেশকে স্থিতিশীল রাখাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আমি বলব, ড. ইউনূস এমন একটি পর্যায়ে ডেলিভারি দিয়েছেন, যা অভাবনীয়। দেশের আমলাতন্ত্রের বড় একটি অংশ যখন আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী ছিল এবং চারদিক থেকে নানা আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করা হয়েছে, সেই পরিস্থিতিতেও তিনি রাষ্ট্রকে সচল রেখেছেন। একে আপনি শতভাগ সফল বলতে পারেন।

 

এশিয়া পোস্ট: আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যেমন মুক্তিযুদ্ধকে পুঁজি করে রাজনীতির অভিযোগ আছে, আপনাদের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ তোলা হয় যে আপনারা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। এ বিষয়ে আপনার ব্যাখ্যা কী?

 

ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ: আমরা জুলাইকে পুঁজি করছি না, বরং আমরা ফ্যাক্টস বা সত্যের ওপর জোর দিচ্ছি। আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ব্যবসা করেছে, কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত সম্মান দেয়নি। তারা ৩০ লাখ শহীদের কথা বলে, কিন্তু ৩০০ জনেরও তালিকা দিতে পারে না। দুই লাখ নারী নির্যাতনের কথা বলে, কিন্তু তারও কোনো নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই। একেই আমি চেতনার ব্যবসা বলি।

 

আমরা তথাকথিত আড়াই, তিন হাজার গাজাখুরি গল্পের বই চাই না। আমরা চাই, প্রতিটি শহীদের নাম সাভার স্মৃতিসৌধে লেখা থাকুক। আমরা যারা ২৪-এর পক্ষের শক্তি, তারা সবসময় তথ্যের ওপর গুরুত্ব দিই। জুলাইয়ে কতজন শহীদ হয়েছেন, তার সঠিক তালিকা হোক। আমরা জুলাই সনদ এবং গণভোটের দাবি জানাচ্ছি, যেন জনগণের রায় প্রতিফলিত হয়। জুলাইকে ভুলে যাওয়ার বা সাইডলাইন করার চেষ্টা যারা করছে, তারা আসলে জুলাইয়ের প্রকৃত আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে না। ৭১-এর ব্যবসায়ীরা যা করেছে, ২৪-এর পক্ষের শক্তি তা করবে না।

 

এশিয়া পোস্ট: সম্প্রতি বিএনপির মহাসচিব বলেছেন তারা বিপ্লবে বিশ্বাসী নয়। বিএনপির এই অবস্থান এবং জুলাই নিয়ে তাদের বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গিকে আপনি কীভাবে দেখেন?

 

ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ: এটি বিএনপির এক ধরনের হীনমন্যতা। ১৯৭৫-এর পটপরিবর্তন, ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান, সবগুলোরই প্রধান সুবিধাভোগী বিএনপি। কিন্তু যেহেতু জুলাই অভ্যুত্থান তাদের একক নেতৃত্বে হয়নি, তাই তারা একে ছোট করে দেখানোর চেষ্টা করছে। আওয়ামী লীগ যেমন মনে করত, শেখ পরিবার ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ সম্ভব ছিল না, বিএনপিও তেমনি মনে করছে, তাদের নেতৃত্ব ছাড়া কিছু হলে সেটি গুরুত্বহীন। এমনকি তারা জুলাইসংক্রান্ত অর্ডিন্যান্সগুলো র্যাটিফাই করছে না, গণভোটের প্রশ্নগুলোকে অবৈধ বলছে। অথচ জুলাই থেকে সব সুবিধা তারাই নিচ্ছে। একেই আমি বলছি ‘জুলাই ব্যবসা’। বিএনপি যদি জুলাইয়ের প্রকৃত চেতনাকে ধারণ করতে না পারে এবং তাদের ঘোষিত ৩১ দফা সংস্কার বাস্তবায়ন না করে, তাহলে তারা জনগণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। তাদের রাজনীতি বাংলাদেশের জন্যই হুমকির মুখে পড়বে।

 

এশিয়া পোস্ট: এবি পার্টি জুলাই আন্দোলনে অত্যন্ত সক্রিয় ছিল, কিন্তু নির্বাচনে আপনাদের ফলাফল আশানুরূপ হয়নি কেন? মানুষ কি আপনাদের গ্রহণ করেনি?

 

ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ: বিষয়টিকে এভাবে দেখলে চলবে না। বাংলাদেশের নির্বাচনি রাজনীতির নিজস্ব কিছু গ্রামার বা ব্যাকরণ আছে। আমাদের দেশে এখনও জেনুইন ভোটার বা সচেতন নাগরিক তৈরি হয়নি, আছে শুধু ১৮ বছর বয়স পূর্ণ করা ভোটারদের একটি বিশাল তালিকা। এই ব্যবস্থায় অনেক সময় সৎ মানুষের চেয়ে টাকা ও পেশিশক্তির অধিকারী গুন্ডা-মাস্তানরা বেশি ভোট পায়। আমরা করছি ‘চৈতন্যের রাজনীতি’, ক্ষমতার রাজনীতি নয়। আমরা তরুণদের মধ্যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বুনে দিচ্ছি। আমরা যে রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করেছি, যেমন— ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ কিংবা ‘দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্রের সংস্কার’, তা আজ দেশের মানুষের মুখে মুখে। আমরা ক্ষমতার জন্য লড়াই করছি না, আমরা একটি জাতির চিন্তা পরিবর্তনের লড়াই করছি। নির্বাচনের ফলাফল দিয়ে এই চৈতন্যের রাজনীতিকে পরিমাপ করা যাবে না। আমাদের লক্ষ্য আরও সুদূরপ্রসারী।

 

এশিয়া পোস্ট: আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফিরে আসার সম্ভাবনা কতটুকু? শেখ হাসিনা সম্প্রতি একটা সাক্ষাৎকারে বলেছেন তিনি দেশে ফিরবেন।

 

ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ: আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে একটি মৃত শক্তি। ইতিহাসে যুদ্ধ বা গণ-অভ্যুত্থানে পরাজিত কোনো শক্তি কার্যকরভাবে রাজনীতিতে ফিরে আসতে পারেনি। মুসলিম লীগ বা জাতীয় পার্টির দিকে তাকালেই তা পরিষ্কার বোঝা যায়। আওয়ামী লীগ হয়তো একটি নিবন্ধিত দল হিসেবে কাগজে-কলমে থাকবে, কিন্তু জনগণের হৃদয়ে তাদের আর স্থান নেই। শেখ হাসিনা বাংলাদেশে অবশ্যই আসবেন, তবে তা হবে বিচারের মুখোমুখি হওয়ার জন্য এবং ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার জন্য। নাগরিক হিসেবে আওয়ামী লীগ কর্মীদের অধিকার থাকবে, কিন্তু দল হিসেবে তারা আর বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারবে না। তাদের সমর্থকেরা ধীরে ধীরে অন্য দলে বা নতুন রাজনৈতিক ধারায় মিশে যাবে।

 

এশিয়া পোস্ট: ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত? তরুণদের মধ্যে যে ভারতবিরোধী মনোভাব তৈরি হয়েছে, তার যৌক্তিকতা কী?

 

ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ: আমরা ভারতের বিরোধী নই, আমরা ভারতের আধিপত্যবাদের বিরোধী। আমাদের সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে। ভারত গত ৫৬ বছর ধরে আমাদের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করেছে, সীমান্তে মানুষ হত্যা করেছে এবং আমাদের ন্যায্য পানির অধিকার দেয়নি। তারা আওয়ামী লীগকে ব্যবহার করে বাংলাদেশে তাদের সাম্রাজ্যবাদ কায়েম করতে চেয়েছিল। আমাদের পাঁচটি অভিন্ন নদীতে তারা পানির বেড়া দিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। ভারত আমাদের আলু, পেঁয়াজ বা চাল দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও অনেক সময় তা বাস্তবায়ন করে না। অথচ ভারত ছাড়া আমরা অনায়াসেই চলতে পারি। আমরা কি ভারত থেকে গরু আমদানি বন্ধ হওয়ার পর মরে গেছি? বরং আমাদের কৃষকেরা আরও স্বাবলম্বী হয়েছেন। ভারত ছাড়া বাংলাদেশ অচল, এই ধারণাটি ভুল। বরং আমাদের ছাড়া ভারতের সেভেন সিস্টার্স অঞ্চলের অর্থনীতি বড় ধরনের চাপে পড়বে। আমরা চাই মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক। ভারত যদি মনে করে তারা আমাদের ওপর খবরদারি করবে, তাহলে এ দেশের তরুণরা তা মেনে নেবে না।

 

এশিয়া পোস্ট: পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের স্বরূপ কী হওয়া উচিত? অনেকে মনে করেন, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থি।

 

ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ: রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক স্বার্থের ভিত্তিতে হওয়া উচিত। ৫৫ বছর আগে একটি যুদ্ধ হয়েছে বলে আমরা কি অনন্তকাল সেই শত্রুতা পুষে রাখব? ফ্রান্স ও জার্মানি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এখন একই ভবনে দূতাবাস চালায়। ইংল্যান্ড আমাদের ১৯০ বছর শাসন করেছে, লুটপাট করে ফকির বানিয়েছে। অথচ আমরা ইংল্যান্ডে পড়তে যাওয়াকে গর্ব মনে করি। তাহলে পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাভাবিক কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক রাখতে বাধা কোথায়? আমাদের নিরাপত্তার স্বার্থেই চীন, তুরস্ক কিংবা পাকিস্তানের মতো রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা জরুরি। পাকিস্তান আমাদের আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য সামরিক সরঞ্জাম দিতে চায়, যা ভারত কখনও দেবে না। আমাদের টিকে থাকতে হলে সব রাষ্ট্রের সঙ্গেই সম্পর্ক রাখতে হবে।

 

এশিয়া পোস্ট: ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস পালন নিয়ে আপনার কিছু বক্তব্য বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। সমালোচনার পর বিষয়টাকে কীভাবে দেখেন?

 

ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ: আমি ইতিহাসকে নতুন করে পাঠ করার কথা বলেছি। ১৬ ডিসেম্বরের সেই আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে আমাদের সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানী উপস্থিত ছিলেন না। তাকে আসার পথে ভারতের পক্ষ থেকে বাধা দেওয়া হয়েছিল, তার বিমানে গুলি করা হয়েছিল। ছবিটা দেখলে মনে হয়, এটি ভারত ও পাকিস্তানের যুদ্ধ ছিল। সেখানে বাংলাদেশের অস্তিত্ব কোথায়? এমনকি ভারত তখন ১৯ জেলায় তাদের ১৯ জন ডিসি নিয়োগ করে ফেলেছিল। আমরা কি সেদিন প্রকৃত বিজয় পেয়েছিলাম, নাকি কয়েক মাসের জন্য ভারতের কলোনিতে পরিণত হয়েছিলাম? আমাদের প্রকৃত বিজয় তো সেদিন হয়েছিল, যেদিন শেখ মুজিবের দাবিতে ভারতীয় সৈন্যরা এ দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিল। ইতিহাসের এই অস্পষ্ট জায়গাগুলো নিয়ে আমাদের খোলামেলা আলোচনা করা দরকার। ৫০ বছর ধরে আমাদের ওপর যে পচা ইতিহাস চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, তার ফলই আজকের এই পরাধীন মানসিকতা।

 

এশিয়া পোস্ট: আপনার এই সাহসী বক্তব্যগুলো নিয়ে অনেক সময় জোটসঙ্গীরাও বিব্রত হন। আপনি কি মনে করেন, এতে আপনার জন্য বড় কোনো ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে?

 

ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ: কে বিব্রত হলো, তা নিয়ে আমি বিচলিত নই। আমি মনে করি, একটি জাতিকে সঠিক ইতিহাস জানানো জরুরি। আমরা যদি সিকিম বা হায়দ্রাবাদ হতে না চাই, তাহলে আমাদের ইতিহাস নতুন করে শিখতে হবে। আমি ২০১৯ সালে ইউরোপের আরামদায়ক জীবন ছেড়ে ফ্যাসিবাদের অন্ধকার সময়ে দেশে ফিরেছিলাম এই লড়াই করার জন্য। ডিজিএফআই বা এনএসআই আমাকে গুম করার হুমকি দিয়েছিল, কিন্তু আমি দমে যাইনি। আমি ক্ষমতার জন্য নয়, চৈতন্যের জন্য কাজ করছি। পালিয়ে যাওয়ার মানুষ আমি নই। ফাঁসির মঞ্চে যেতে প্রস্তুত আছি, কিন্তু সত্য বলা থেকে বিচ্যুত হব না।

 

এশিয়া পোস্ট: আগামীর ভাবনা কী? তরুণদের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী থাকবে?

 

ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ: আমার লক্ষ্য একটি পুরো প্রজন্মকে রাজনৈতিকভাবে শিক্ষিত করা। তরুণদের চশমাটা বদলে দেওয়া, যেন তারা তাদের চারপাশ এবং রাষ্ট্রকে নতুনভাবে দেখতে পারে। আমরা একটি নতুন রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করছি, যা ধীরে ধীরে ফল দেবে। দেশের মানুষই শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেবে, আমাদের এই বয়ান তারা গ্রহণ করবে কি না।

 

এশিয়া পোস্ট: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

 

ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ: আপনাকেও ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন।