Image description

গুমের শিকার ব্যক্তির মৃত্যু হলে, লাশ পাওয়া গেলে কিংবা ঘটনার পাঁচ বছর পরও তাকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব না হলে দায়ী ব্যক্তির সর্বোচ্চ শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড। বিকল্প হিসেবে যাবজ্জীবন অথবা কমপক্ষে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া যাবে। পাশাপাশি সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

এছাড়া সাধারণভাবে গুমের অপরাধে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন অথবা কমপক্ষে তিন বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে। অভিযোগ পাওয়ার পর ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত এবং অভিযোগ গঠনের পর ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার শেষ করতে হবে।

‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’ নামে প্রস্তাবিত বিলে এসব বিধান রাখা হয়েছে। মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা ১৩ পৃষ্ঠার বিলটিতে গুমের সংজ্ঞা, অভিযোগ দায়ের, তদন্ত ও বিচার, শাস্তি, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দায়, গোপন আটককেন্দ্র, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীর সুরক্ষা, ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং নিখোঁজ ব্যক্তির সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিস্তারিত বিধান রয়েছে।

 

বিলে বলা হয়েছে, মানবাধিকার, মানবিক মর্যাদা, ব্যক্তি-স্বাধীনতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা রাষ্ট্রের অন্যতম অঙ্গীকার। গুম এসব অধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন। ব্যাপক বা পরিকল্পিতভাবে সংঘটিত গুমকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের অধীনে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিচারের সুযোগও রাখা হয়েছে।

কোন ঘটনা গুম হিসেবে গণ্য হবে

 

প্রস্তাবিত আইনে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বা রাষ্ট্রের অনুমোদন, সমর্থন কিংবা সম্মতিতে কাজ করা কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মাধ্যমে কাউকে গ্রেফতার, আটক, অপহরণ বা অন্যভাবে স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করার ঘটনাকে গুমের আওতায় আনা হয়েছে।

তবে শুধু আটকের ঘটনাই যথেষ্ট হবে না। আটকের পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির স্বাধীনতা হরণের বিষয়টি অস্বীকার করা, তার অবস্থান বা পরিণতি গোপন রাখা এবং এর ফলে তাকে আইনের সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করা হলে সেটি গুমের অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

আইনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রমও রাখা হয়েছে। কোনও ব্যক্তিকে গ্রেফতারের পর সংবিধানের ৩৩(২) অনুচ্ছেদে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হলে, হাজির করার আগ পর্যন্ত তার অবস্থান গোপন রাখা হলেও সেটিকে গুম হিসেবে বিবেচনা করা হবে না। তবে আটককালে অন্য কোনও অপরাধ সংঘটিত হলে প্রচলিত আইনে তার বিচার করা যাবে।

বিলে গুমকে ‘চলমান অপরাধ’ বলা হয়েছে। গুম হওয়া ব্যক্তির অবস্থান, অবস্থা বা পরিণতি প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত অপরাধটি চলমান থাকবে। ব্যক্তি মারা গেছেন বলে নিশ্চিত হলে তার মরদেহ বা দেহাবশেষ শনাক্ত করে আইনগত উত্তরাধিকারীর কাছে হস্তান্তর না করা পর্যন্তও অপরাধটির সমাপ্তি হয়েছে বলে গণ্য হবে না।

মৃত্যু বা পাঁচ বছরেও সন্ধান না মিললে কঠোর শাস্তি

বিলের সাধারণ শাস্তির ধারায় বলা হয়েছে, গুমের জন্য দায়ী ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন অথবা কমপক্ষে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া যাবে। এর সঙ্গে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড আরোপ করা যাবে।

গুমের কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মৃত্যু হলে বা তার লাশ পাওয়া গেলে শাস্তি আরও কঠোর হবে। একই বিধান প্রযোজ্য হবে ঘটনার পাঁচ বছর পরও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব না হলে। এসব ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কিংবা কমপক্ষে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া যাবে। সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডও আরোপ করা যাবে।

অন্য কোনও অপরাধে অভিযুক্তের বিচার হয়ে থাকলেও গুমের অভিযোগে নতুন করে মামলা ও বিচার করতে বাধা থাকবে না।

গুমের আলামত, সাক্ষ্য-প্রমাণ বা নথি নষ্ট, গোপন, বিকৃত কিংবা পরিবর্তন করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড হবে। গোপন আটককেন্দ্র নির্মাণ, স্থাপন বা ব্যবহার করলেও একই শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।

গুমের চেষ্টা, আদেশ, নির্দেশ, সহায়তা, প্ররোচনা বা অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের ক্ষেত্রে মূল অপরাধের জন্য নির্ধারিত শাস্তিই প্রযোজ্য হবে।

রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়

রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, জরুরি অবস্থা কিংবা অন্য কোনও বিশেষ পরিস্থিতিকে গুমের পক্ষে যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। সরকারি বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ বা নির্দেশ পালন করার যুক্তিও গ্রহণযোগ্য হবে না।

অর্থাৎ কোনও কর্মকর্তা শুধু ঊর্ধ্বতনের নির্দেশ পালন করেছেন— এমন দাবি করে দায় এড়াতে পারবেন না। প্রত্যেক ব্যক্তির নিজস্ব ফৌজদারি দায় নির্ধারণ করা হবে।

সামরিক ঊর্ধ্বতনের কমান্ড রেসপনসিবিলিটি

সশস্ত্র বাহিনীর কোনও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কমান্ডার বা দলনেতার অধীন ব্যক্তিরা গুমে জড়িত হলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দায় নির্ধারণের বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে।

ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিজে অপরাধে অংশ নিলে, আদেশ বা অনুমোদন দিলে কিংবা গুম-সংক্রান্ত পরিকল্পনায় যুক্ত থাকলে মূল অপরাধের শাস্তি পাবেন। অধীনদের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও গুম প্রতিরোধে ব্যবস্থা না নিলে বা অপরাধের তথ্য জেনেও ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করলে তিনিও দায়ী হবেন।

সামরিক বাহিনীর সদস্য নন— এমন বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও কাছাকাছি বিধান রাখা হয়েছে। তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যক্তি গুম করতে যাচ্ছেন বা করেছেন, এমন তথ্য জানার পরও প্রতিরোধ, দমন, তদন্ত বা বিচারের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি পাঠাতে ব্যর্থ হলে মূল অপরাধের শাস্তি হতে পারে।

এর মাধ্যমে শুধু মাঠপর্যায়ের সদস্য নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ও নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তাদেরও বিচারের আওতায় আনার পথ রাখা হয়েছে।

থানায় অভিযোগ না নিলে সরাসরি আদালতে

ভুক্তভোগী নিজে, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, সাক্ষী অথবা ঘটনা সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য জানা যে কোনও ব্যক্তি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ দিতে পারবেন।

থানা অভিযোগ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে অভিযোগকারী সরাসরি এখতিয়ারসম্পন্ন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নালিশি মামলা করতে পারবেন।

অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশকে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অভিযোগ গেলে তিনিও প্রচলিত বিধান অনুসারে তদন্ত বা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিতে পারবেন।

সরকারি কর্মকর্তা বা বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা নেওয়া কিংবা বিচার শুরু করতে সরকারের পূর্বানুমোদন লাগবে না। সরকারি দায়িত্ব পালনের সঙ্গে অভিযোগের সম্পর্ক রয়েছে— এমন যুক্তিতেও অনুমতির বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি হবে না।

তদন্তে ৯০ দিন, সর্বোচ্চ আরও ৩০ দিন

তদন্তকারী কর্মকর্তাকে দায়িত্ব পাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করে সাক্ষ্য-প্রমাণসহ প্রতিবেদন দিতে হবে। যুক্তিসংগত কারণে ম্যাজিস্ট্রেট তদন্তের সময় সর্বোচ্চ ৩০ দিন বাড়াতে পারবেন। বর্ধিত সময়েও তদন্ত শেষ না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

তদন্ত শেষে প্রতিবেদন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে উপস্থাপন করতে হবে। ম্যাজিস্ট্রেট প্রতিবেদন ও তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে অভিযোগ আমলে নেওয়ার মতো উপাদান পেলে মামলাটি বিচারের জন্য এখতিয়ারসম্পন্ন দায়রা আদালতে পাঠাবেন।

অভিযোগ যদি কোনও সামরিক বা বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে হয়, ম্যাজিস্ট্রেট তদন্তকারী কর্মকর্তাকে ‘অন্তর্বর্তীকালীন তদন্ত প্রতিবেদন’ দিতে বলতে পারবেন। তখন সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা বাহিনীর কমান্ড কাঠামো, নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণের পরিধি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।

প্রাথমিক প্রতিবেদনে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরাসরি প্রমাণ না মিললেও তদন্তের স্বার্থে তাকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া যেতে পারে। পরে পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া গেলে তার নাম আবারও প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে।

গোপন আটককেন্দ্রে তল্লাশি

গুমের শিকার ব্যক্তিকে খুঁজে বের করতে আদালত আটককেন্দ্র, সরকারি বা বেসরকারি স্থাপনা এবং সন্দেহভাজন অন্য কোনও জায়গায় তল্লাশি পরোয়ানা জারি করতে পারবেন।

আদালতের নির্দেশে পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনী বা অন্য কোনও উপযুক্ত ব্যক্তি তল্লাশি চালাতে পারবেন। গোপন আটককেন্দ্র নির্মাণ, স্থাপন বা ব্যবহার করাকে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে রাখা হয়েছে।

৯০ কার্যদিবসে বিচার

গুমের মামলার বিচার কেবল এখতিয়ারসম্পন্ন দায়রা জজ আদালতে হবে। অভিযোগ গঠনের পর ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার শেষ করতে হবে।

নির্ধারিত সময়ে বিচার শেষ না হলে আদালত কারণ উল্লেখ করে আরও ৩০ কার্যদিবস সময় নিতে পারবেন। বিলম্বের কারণ লিখিতভাবে সুপ্রিম কোর্টে প্রতিবেদন আকারে পাঠাতে হবে।

অভিযুক্ত পলাতক থাকলে অভিযোগপত্র গ্রহণের পরবর্তী ২০ দিনের মধ্যে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া যাবে। নোটিশ তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে, জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে, বিদেশে অবস্থান করলে দূতাবাস বা ইন্টারপোলসহ অন্য উপায়ে পাঠানো যাবে।

নির্ধারিত সময়ে হাজির না হলে আদালত অভিযুক্তের অনুপস্থিতিতে বিচার করতে পারবেন। তবে আদালতে হাজির হওয়ার পর বা জামিন পাওয়ার পর কেউ পলাতক হলে নতুন করে বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার প্রয়োজন হবে না।

বাংলাদেশের বাইরের ঘটনাও বিচারের আওতায়

বাংলাদেশের স্থল, সমুদ্র বা আকাশসীমায় সংঘটিত গুমের বিচার এই আইনে হবে। বাংলাদেশের নিবন্ধিত জাহাজ, বিমান বা অন্য কোনও যানে অপরাধ সংঘটিত হলেও আইনটি প্রযোজ্য হবে।

অভিযুক্ত অথবা গুম হওয়া ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক হলে বিদেশে সংঘটিত অপরাধেরও বিচার করা যাবে।

তবে কোনও স্বীকৃত আন্তর্জাতিক আদালত বা ট্রাইব্যুনালে অভিযুক্তকে সমর্পণ করা হলে অথবা আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী অন্য রাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ করা হলে বাংলাদেশের আদালতের কার্যক্রম সে অনুযায়ী নিষ্পত্তি হবে।

মিথ্যা অভিযোগেও শাস্তি

বিচার শেষে আদালতের কাছে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হলে যে অভিযোগটি মিথ্যা ও হয়রানিমূলক ছিল, অভিযোগকারীকে শাস্তি দেওয়া যাবে।

ক্ষতিগ্রস্ত অভিযুক্ত বা ব্যক্তিকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। প্রয়োজন হলে মিথ্যা অভিযোগকারীকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডও দেওয়া যাবে।

তবে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ামাত্রই সেটিকে মিথ্যা অভিযোগ হিসেবে বিবেচনা করা হবে—বিলে এমন কথা বলা হয়নি। অভিযোগটি ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক ছিল বলে আদালতের কাছে প্রমাণিত হতে হবে।

ক্ষতিপূরণ আদায়, না পারলে দেবে রাষ্ট্র

আদালত অর্থদণ্ডকে ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণ হিসেবে গণ্য করতে পারবেন। অর্থদণ্ড বা ক্ষতিপূরণের টাকা দণ্ডিত ব্যক্তির স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ থেকে আদায় করা যাবে। অন্য দাবির তুলনায় ক্ষতিপূরণের দাবি অগ্রাধিকার পাবে।

সম্পদ থেকে টাকা আদায় করা সম্ভব না হলে রাষ্ট্রকে ভুক্তভোগী বা তার পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পত্তি শনাক্ত করে নিলাম বা প্রকাশ্য বিক্রির মাধ্যমে ক্ষতিপূরণের অর্থ সংগ্রহের নির্দেশও আদালত দিতে পারবেন।

ভুক্তভোগীর পরিবার অভিযুক্তের সম্পত্তি ব্যবহার করতে পারবে

গুম হওয়া ব্যক্তির স্ত্রী বা তার ওপর নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণ, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং যৌক্তিক ব্যয় মেটাতে তার সম্পত্তি ব্যবহার বা হস্তান্তরের অনুমতি দেওয়ার বিধান রয়েছে।

পরিবারের আবেদনের পর আদালত প্রয়োজনীয় পরিমাণ সম্পত্তি ব্যবহারের জন্য ‘প্রত্যয়ন’ বা ‘গুম সনদ’ দিতে পারবেন।

কোনও ব্যক্তি টানা পাঁচ বছর গুম থাকা এবং জীবিত ফিরে না এলে আদালত তার বৈধ উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টনের অনুমতি দিতে পারবেন। তবে এজন্য উত্তরাধিকারীদের আবেদন করতে হবে এবং আদালতকে গুমের বিষয়টি নিশ্চিত হতে হবে।

চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও আলাদা তহবিল

গুমের শিকার ব্যক্তি ফিরে এলে তার চিকিৎসা, মানসিক ও সামাজিক পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরণ এবং আইনি সহায়তার জন্য সরকারকে একটি তহবিল গঠন করতে হবে।

তহবিলে অর্থ সংগ্রহ ও ব্যয়ের বিধান পরবর্তী সময়ে বিধিমালায় নির্ধারণ করা হবে। বিধি না হওয়া পর্যন্ত সরকার আদেশ দিয়ে তহবিল পরিচালনা করতে পারবে।

ভুক্তভোগীর বিস্তারিত ঘটনা, তদন্তের অগ্রগতি ও ফলাফল এবং গুম হওয়া ব্যক্তির অবস্থান বা পরিণতি সম্পর্কে জানার অধিকার থাকবে। তারা সংগঠন গঠন, অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রমে স্বাধীনভাবে অংশগ্রহণ এবং সরকারি আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকারও পাবেন।

সাক্ষী ও তথ্যদাতার পরিচয় গোপন থাকবে

গুমের তথ্য প্রকাশকারী ব্যক্তি জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ (সুরক্ষা প্রদান) আইন, ২০১১-এর অধীনে সুরক্ষা পাবেন।

আদালত অভিযোগকারী, তথ্যদাতা, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীর পরিচয় গোপন রাখা এবং প্রতিশোধ, ভয়ভীতি, হুমকি বা অন্য ক্ষতি থেকে সুরক্ষায় আদেশ দিতে পারবেন।

অনলাইন যোগাযোগ, ডিজিটাল মাধ্যমে সম্পাদিত কথোপকথন, স্থিরচিত্র, ভিডিও এবং অন্যান্য ডিজিটাল তথ্যও প্রচলিত সাক্ষ্য আইন অনুসারে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা যাবে।

অপরাধ আপসযোগ্য নয়

প্রস্তাবিত আইনের অপরাধগুলো আমলযোগ্য, জামিন-অযোগ্য এবং আপস-অযোগ্য হবে। অভিযোগকারীকে শুনানির সুযোগ না দিয়ে এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য হওয়ার যৌক্তিক কারণ নেই— এ বিষয়ে আদালত সন্তুষ্ট না হলে জামিন দেওয়া যাবে না।

তবে অভিযুক্ত নারী, শিশু অথবা গুরুতর অসুস্থ হলে এবং জামিন দিলে ন্যায়বিচার ব্যাহত হবে না বলে আদালত মনে করলে জামিন দেওয়া যেতে পারে।

গুমের জাতীয় তথ্যভাণ্ডার

সরকারের তত্ত্বাবধানে গুম-সংক্রান্ত একটি তথ্যভান্ডার তৈরির প্রস্তাব রয়েছে। এতে গুম হওয়া ব্যক্তি, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তি এবং গুমের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত সন্তানের পরিচয় ও তথ্য থাকবে।

নিখোঁজ হওয়ার তারিখ, স্থান, সম্ভাব্য কারণ, পরিবারের অভিযোগ, প্রাথমিক সাক্ষ্য, অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম, বাহিনী, ইউনিট, পদবি, দায়িত্বকাল, তদন্ত ও আপিলের অবস্থা এবং ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের তথ্য সংরক্ষণ করা হবে।

সম্ভাব্য কারণ হিসেবে রাজনৈতিক মতাদর্শ, পেশাগত দ্বন্দ্ব, ফৌজদারি মামলা, পারিবারিক বিরোধ বা সামাজিক প্রেক্ষাপটের মতো তথ্যও অন্তর্ভুক্ত করা যাবে।

তথ্যভাণ্ডার বিশ্লেষণ করে গুমের ধরন নির্ধারণ, অনুসন্ধানে সমতা এবং শিশু-সংবেদনশীল পদ্ধতি প্রবর্তনের কথা বলা হয়েছে। ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও তদন্তের স্বার্থে কিছু তথ্য গোপন রাখা হলেও জনস্বার্থে সংক্ষিপ্ত তথ্য প্রকাশ করা যাবে।

ব্যাপক বা পরিকল্পিত গুমের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে

গুম যদি ব্যাপক বা পরিকল্পিতভাবে সংঘটিত হয় এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের উপাদান তৈরি করে, তাহলে এর বিচার ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩’-এর অধীনে হবে। একই ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনে কার্যক্রম চললে সাধারণ গুম আইনে সমান্তরাল বিচার চালানো যাবে না।

তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনায় ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অভিযোগটি মানবতাবিরোধী অপরাধ বলে প্রতীয়মান হলে প্রতিবেদন ও সাক্ষ্য-প্রমাণ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কাছে পাঠাতে হবে।

বিচারের আগেও দায়রা আদালত মনে করলে মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের আওতাভুক্ত, সেটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাঠাতে পারবেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রয়োজনীয় তদন্ত ও পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।

এই বিধানের মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন গুমের ঘটনা এবং রাষ্ট্রীয় নীতি বা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ব্যাপকভাবে সংঘটিত গুমের মধ্যে আইনি পার্থক্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে আইনটি কার্যকর হলে এর বাস্তব প্রয়োগ নির্ভর করবে স্বাধীন তদন্ত, প্রমাণ সংরক্ষণ, কমান্ড কাঠামোর তথ্যপ্রাপ্তি এবং সাক্ষী-ভুক্তভোগীদের কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর।