Image description

বিপদে পড়লে মানুষের প্রথম আশ্রয় থানা। জীবন, সম্পদ ও আইনি সুরক্ষার জন্য মানুষ পুলিশের শরণাপন্ন হয়। কিন্তু সেই থানায় অভিযোগ করার পরই যদি ভুক্তভোগী নতুন করে হুমকি, ভয়ভীতি কিংবা হামলার মুখে পড়েন, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে?

দেশের বিভিন্ন এলাকায় এমন অভিযোগ নতুন নয়। জিডি, মামলা বা লিখিত অভিযোগ করার পর প্রতিপক্ষের টার্গেটে পরিণত হওয়ার ঘটনা প্রায়ই সামনে আসে। সর্বশেষ রাজধানীতে দায়ের করা একটি হামলার মামলাকে কেন্দ্র করে হবিগঞ্জের মাধবপুরে এক বৃদ্ধা নারী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের প্রাণনাশ এবং বসতবাড়ি ভাঙচুরের হুমকির অভিযোগ উঠেছে। নিরাপত্তা চেয়ে থানায় জিডিও করতে হয়েছে তাদের।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভিযোগ করেও যদি মানুষ নিরাপদ না থাকে, তাহলে পুলিশের প্রতি জনআস্থা দুর্বল হবে। তবে পুলিশের দাবি, তদন্তের স্বার্থেই অভিযুক্তের সঙ্গে কথা বলতে হয়। তখন অভিযুক্ত অনেক ক্ষেত্রেই বুঝে যায়, কে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। এরপর কেউ কেউ ভুক্তভোগীকে ভয়ভীতি দেখায়। তবে এ ধরনের হুমকিও একটি ফৌজদারি অপরাধ।

 

মামলা করার পরই হুমকি

মাধবপুর উপজেলার পশ্চিম আন্দিউড়া গ্রামের বাসিন্দা সফর চাঁন (৫৭) গত ২২ জুলাই মাধবপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। জিডিতে তিনি উল্লেখ করেন, তাঁর ছেলে মুত্তাকিন মিয়া সম্প্রতি রাজধানীর মোহাম্মদপুরে হামলার শিকার হন। হামলায় তার ডান হাতের চারটি আঙুল ভেঙে যায়। এ ঘটনায় ১৭ জুলাই মোহাম্মদপুর থানায় একটি মামলা করা হয়। পরে পুলিশ একজন আসামিকে গ্রেফতারও করে।

 

এরপর থেকেই আসামিপক্ষের স্বজনরা তাদের পরিবারকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখাতে শুরু করে বলে অভিযোগ করেন সফর চাঁন। গত ২১ জুলাই সকালে ও সন্ধ্যায় কয়েক ব্যক্তি বাড়ির সামনে এসে তাকে ও তার সন্তানদের প্রাণনাশের হুমকি দেন। বসতবাড়ি ভাঙচুরেরও হুমকি দেওয়া হয়। ঘটনাটি স্থানীয় কয়েকজন প্রতিবেশীও দেখেছেন বলেও জিডিতে উল্লেখ করা হয়েছে। নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা থেকেই তিনি থানার শরণাপন্ন হয়েছেন।

মাধবপুর থানার ওসি মো. সোহেল রানা বলেন, ‘‘অভিযোগটি নথিভুক্ত করা হয়েছে। তদন্তের দায়িত্ব একজন এসআইকে দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা মিললে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’

অভিযোগ দিয়েই হামলার শিকার

গত ১৮ জুন কুমিল্লার তিতাস উপজেলায় সংঘর্ষের ঘটনায় থানায় অভিযোগ দিয়ে বাড়ি ফেরার পথে বাদী ও তার স্বজনদের ওপর আবার হামলার অভিযোগ ওঠে। হামলা থেকে বাঁচতে তারা থানায় আশ্রয় নিলেও সেখানেও প্রতিপক্ষের তোপের মুখে পড়েন বলে অভিযোগ করা হয়। পরে এ ঘটনায় পৃথক মামলাও দায়ের করা হয়।

এ ধরনের অভিযোগ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকেই মাঝেমধ্যে সামনে আসে। কোথাও হুমকি, কোথাও হামলা, আবার কোথাও মামলা তুলে নিতে চাপ দেওয়ার অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।

বাড়ছে আস্থার সংকট

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বাংলা ট্রিবিউন‌কে বলেন, ‘‘এ ধরনের অভিযোগ নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই এমন অসংখ্য ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে।’’

তিনি বলেন, ‘‘অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, থানায় অভিযোগ করার পরপরই অভিযুক্তরা বিষয়টি জেনে যায়। এরপর শুরু হয় ভয়ভীতি, হুমকি কিংবা পুনরায় হামলা। কেউ বাসা বদল করতে বাধ্য হন, কেউ দীর্ঘদিন আতঙ্কে জীবন কাটান।’’

ড. তৌহিদুল হকের মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব ভুক্তভোগীকে সুরক্ষা দেওয়া, নিরপেক্ষ তদন্ত করা এবং অপরাধীকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা। কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্তদের কেউ যদি এমনভাবে কাজ করেন, যাতে ভুক্তভোগীই আরও ঝুঁকিতে পড়েন, তাহলে মানুষ পুলিশের ওপর আস্থা হারাবে।

তিনি বলেন, ‘‘অভিযোগ করেও যদি মানুষ নিরাপদ না থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে অনেকেই থানায় যেতে নিরুৎসাহিত হবেন। এতে অপরাধ দমন ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়বে। এ ধরনের ঘটনায় জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। একইসঙ্গে এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে ভুক্তভোগীর নিরাপত্তাই হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।’’

পুলিশের ব্যাখ্যা

মোহাম্মদপুর থানার ওসি মোজবাহ্ উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘কোনও অভিযোগ তদন্ত করতে গেলে অভিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতেই হয়। তখন তিনি স্বাভাবিকভাবেই বুঝতে পারেন যে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ হয়েছে। এরপর কেউ কেউ ভুক্তভোগীকে হুমকি দেন। কিন্তু সেটিও একটি অপরাধ। এমন অভিযোগ পেলে পুলিশ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়।’’ তিনি বলেন, ‘‘অভিযোগের তথ্য থানা থেকে বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।’’

একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন গুলশান থানার ওসি মো. দাউদ হোসেনও। বাংলা ট্রিবিউন‌কে তিনি বলেন, ‘‘তদন্তের স্বার্থে অভিযুক্তের সঙ্গে কথা বলতেই হয়। তবে থানা থেকে কেউ অভিযোগকারীর তথ্য ফাঁস করলে সেটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি অত্যন্ত অনৈতিক কাজ।’’

সোর্স গোপন রাখার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়

পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউন‌ক বলেন, ‘‘থানায় অভিযোগ এলে পুলিশ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে। তদন্তের প্রয়োজনেই অভিযুক্তের সঙ্গে কথা বলতে হয়। তখন অনেক সময় তিনি অনুমান করে ফেলেন, কে অভিযোগ করেছেন।’’

তিনি বলেন, “মাদক কিংবা অন্য কোনও স্পর্শকাতর তথ্যের ক্ষেত্রে অভিযোগকারীর পরিচয় গোপন রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা নিয়মিত পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিই যে কোনও অবস্থাতেই সোর্স বা তথ্যদাতার পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না।” তবে তিনি স্বীকার করেন, ‘‘সব সময় সবাই সেই পেশাদার মান বজায় রাখতে পারেন না।’’

খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, “কখনও কখনও কিছু সদস্যের বিচ্যুতি ঘটে। কেউ কেউ অতি উৎসাহী হয়ে তথ্য প্রকাশ করে ফেলেন। এমন অভিযোগ এলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।” তিনি আরও বলেন, “একজন পেশাদার পুলিশ কর্মকর্তার দক্ষতাই হলো—কীভাবে তদন্তও করবেন, আবার ভুক্তভোগীকেও নিরাপদ রাখবেন। এই ভারসাম্য বজায় রাখাই পুলিশের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।”