Image description

দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গোর তিন দিনের সফরে বৃহস্পতিবার ঢাকায় আসছেন। তার এই সফরের মূল লক্ষ্য দ্রুত পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটের মধ্যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে ওয়াশিংটনের বোঝাপড়া আরও গভীর করা।

গোর শুক্রবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক এবং শনিবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এ ছাড়া এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান মানবিক ও নিরাপত্তা সংকট সম্পর্কে সরাসরি ধারণা লাভের জন্য তিনি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও যাবেন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের ঠিক এক মাস পর ভূ-রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল সময়ে সার্জিও গোরের এই সফর হচ্ছে। চীন সফরকালে ঢাকা এবং বেইজিং কয়েকটি কৌশলগত খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণ করেছে। নিজেদের সম্পর্ক এক নতুন যুগে প্রবেশ করছে বলেও বর্ণনা করে বাংলাদেশ ও চীন।

গোরের এই সফরের সময়কাল এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত কোনো এজেন্ডা না থাকায় কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র মন্ত্রীর সঙ্গে তার আলোচনা কোনো একক বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ব্যাপক ও কৌশলগত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

উন্মুক্ত আলোচনা

পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং সার্জিও গোর এর আগে গত ২৩ জুলাই ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় বৈঠক করেন। সেখানে তারা বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা এবং একটি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের বিকাশে প্রচেষ্টাসহ বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা করেন।

এক সপ্তাহের মধ্যেই তারা ঢাকায় আবার বৈঠকে বসবেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এখনো আলোচনার কোনো নির্দিষ্ট এজেন্ডা ঘোষণা করা হয়নি। এটি ইঙ্গিত দেয় যে বৈঠকগুলো দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক বিষয়ে খোলামেলা মতবিনিময়ের একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিশেষ দূতের প্রথম সফরের সময় এ ধরণের পদ্ধতি অবলম্বন স্বাভাবিক, বিশেষ করে যখন মূল উদ্দেশ্য থাকে কোনো অংশীদার দেশের সার্বিক কৌশলগত ভাবনা সম্পর্কে জানা।

ঢাকার কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি বোঝা

বিশ্লেষকদের মতে, পাঁচ মাস আগে দায়িত্ব গ্রহণ করা নতুন সরকারের অধীনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারগুলো স্পষ্টভাবে বোঝাই ওয়াশিংটনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হবে।

গত মাসে প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফরের সময় বাংলাদেশ ও চীন অবকাঠামো, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধি করেছে, যা দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে, প্রধান পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ কীভাবে সম্পর্ক ভারসাম্যপূর্ণ রেখে এগিয়ে যেতে চায়, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র আরও স্পষ্ট ধারণা চাইবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।

একজন সাবেক কূটনীতিক বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের পর, বেইজিংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততার গতিপথ ওয়াশিংটন মূল্যায়ন করবে-এটাই স্বাভাবিক।’

তিনি আরও বলেন, ‘পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিয়মিতভাবেই এ ধরনের সফর নিয়ে বিদেশি অংশীদারদের অবহিত করে থাকে। তবে একজন বিশেষ দূত সম্ভবত দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছ থেকেই তাদের সার্বিক কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি সরাসরি শুনতে চাইবেন।’

বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, গোরের দায়িত্বপ্রাপ্ত অঞ্চলের আওতায় রয়েছে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া, যা যুক্তরাষ্ট্র-চীন কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রেক্ষাপটে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা

আলোচনায় বাণিজ্য বিষয়টিরও গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দুদিন আগে, গত ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র ‘রেসিপ্রোকাল ট্রেড এগ্রিমেন্ট’ (এআরটি) স্বাক্ষর করেছিল।

দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ভারসাম্যহীনতা দূর করতে ঢাকা বোয়িং বিমান কেনা এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষি পণ্য ও জ্বালানি আমদানি বাড়াতে সম্মত হয়েছে।

গত ২৩ জুলাই ওয়াশিংটনের ঘোষিত সর্বশেষ শুল্ক পুনর্নির্ধারণের পর, বাংলাদেশকে সর্বনিম্ন শুল্ক অর্থাৎ ১০ শতাংশ ক্যাটাগরিতে রাখা হয়েছে। এই পদক্ষেপ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের জন্য একটি ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবেই ঢাকায় দেখা হচ্ছে।

তবে চুক্তির একটি ক্ষেত্র এখনো অনেকটাই অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে, তা হলো—প্রতিরক্ষা সহযোগিতা।

এআরটি’তে বলা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে ‘প্রতিরক্ষা বাণিজ্যকে সুসংগঠিত ও সমৃদ্ধ করতে’ কাজ করবে।

ওয়াশিংটন বারবার ঢাকাকে চীন ও রাশিয়ার কাছ থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয় কমিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার সহযোগীদের কাছ থেকে কেনাকাটার জন্য উৎসাহিত করেছে। যদিও বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে বলে আসছে যে তাদের প্রতিরক্ষা ক্রয় কার্যক্রম জাতীয় চাহিদার ভিত্তিতেই পরিচালিত হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের নজর কাড়তে পারে এমন আরেকটি বিষয় হলো ‘প্যাক্স সিলিকা’। এটি সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অবকাঠামো এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থের সাপ্লাই চেইন শক্তিশালী করার জন্য ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে চালু হওয়া একটি মার্কিন নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক নিরাপত্তা উদ্যোগ।

কৌশলগত তাৎপর্য

কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা গোরের এই সফরকে নিছক একটি রুটিন দ্বিপাক্ষিক সম্পৃক্ততার চেয়ে বেশি কিছু হিসেবে দেখছেন।

তাদের মতে, এটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে ওয়াশিংটনের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ প্রকাশ করে। কারণ, ঢাকা একদিকে নিজের নীতিকে ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি হিসেবে বর্ণনা করছে, অন্যদিকে একই সঙ্গে একাধিক বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণ করছে।

সফরের সময়কাল, উন্মুক্ত এজেন্ডা এবং বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির মেলবন্ধন গোরের প্রথম বাংলাদেশ সফরকে সাম্প্রতিক মাসগুলোর অন্যতম নজরকাড়া কূটনৈতিক ঘটনার একটিতে পরিণত করেছে।

আঞ্চলিক কৌশলগত প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্লেষকরা বিশ্বাস করেন, ঢাকার এই আলোচনা উভয় পক্ষকেই বিবর্তিত আঞ্চলিক ব্যবস্থা সম্পর্কে মতবিনিময় করার সুযোগ দেবে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন স্বার্থের মিল থাকা ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করা যাবে, তেমনি ধারাবাহিক কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে মতপার্থক্যগুলো মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।