মতিঝিল মেট্রো স্টেশনের নিচে ছাতার মধ্যে রাখা হয়েছিল শক্তিশালী ‘পাইপ বোমা’। ছাতাটিতে মিট মিট করে লাল লাইট জ্বলছিল ও শব্দ হচ্ছিল। ব্যস্ততম সড়কে কেউ ছাতাটি ধরলেই ঘটত বিস্ফোরণ। হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব উল্টো রথযাত্রাকে টার্গেট করেই সেখানে বোমাটি রাখা হয়েছিল বলে ধারণা অপরাধ বিশেষজ্ঞদের।
গত শুক্রবার সন্ধ্যায় বোমাটি দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেন পথচারীরা। পরে বোমাটি উদ্ধার ও নিষ্ক্রিয় করে ডিএমপির বোম ডিসপোজাল ইউনিট। এরপর চার দিন পার হয়ে গেলেও এই ঘটনায় কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।
সিটিটিসি বলছে, দেশে উগ্রবাদ মাথাচাড়া দেওয়ার মতো কোনো লক্ষণ নেই। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উগ্রবাদ নেই বা লক্ষণ নেই এসব বলে জঙ্গিবাদের আশঙ্কাকে উড়িয়ে না দিয়ে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে সত্যতা বের করা উচিৎ।
পুলিশ জানিয়েছে, মতিঝিলের মেট্রো স্টেশন থেকে উদ্ধার হওয়া বোমা সদৃশ বস্তুটি ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি)। ছাতাটি খুললেই বিস্ফোরণ এবং হতাহত হওয়ার শঙ্কা ছিল। কারণ উদ্ধার হওয়া আইইডি বোমাটি ব্যাটারি, ইলেকট্রিক সার্কিট ও ডেটোনেটর (ব্লাস্টিং ক্যাপ) ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছিল। এটি এমনভাবে সংযুক্ত ছিল যে ছাতার সুইচ চাপলেই বিস্ফোরণ ঘটত। বোমাটির ভেতরে প্রায় ১ থেকে ১.৫ কেজি সালফার ও অসংখ্য লোহার বল ব্যবহার করা হয়েছিল। বিস্ফোরণের ক্ষয়ক্ষতি বাড়াতে পাইপের ভেতরে স্প্লিন্টার ভরে রাখা হয়েছিল।
ডিএমপির মতিঝিল থানার ওসি কামারুজ্জামান তালুকদার আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, বোমাটি কে বা কারা রেখে গেছে তা এখনো শনাক্ত করা যায়নি। ওই সময় রথযাত্রা থাকায় অনেক মানুষের আনাগোনা ছিল। আবার যে স্থানে ছাতাটি রাখা হয়েছিল তার আশেপাশে সিসি ক্যামেরা ছিল না। তাই আসামি শনাক্তে বেগ পোহাতে হচ্ছে।
তিনি বললেন, আমরা বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছি। রথযাত্রায় দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের বডি-ওর্ন ক্যামেরা এবং ড্রোনের কয়েক শ ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সন্দেহভাজনদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, উল্টো রথযাত্রার র্যালিকে লক্ষ্য করেই বোমাটি মেট্রো স্টেশনের নিচে রাখা হয়েছিল। কারণ, বোমাটির মেট্রোরেল স্থাপনার ক্ষতি করার মতো সক্ষমতা ছিল না। তবে জনবহুল জায়গায় বিস্ফোরণ হলে ১৫-২০ হতাহত হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, রথযাত্রা যখন মেট্রো স্টেশন দিয়ে যাচ্ছিল তখন পুলিশ ওই ছাতা বোমাটি ঘিরে রেখেছিল। বোমাটি মেট্রো স্টেশনের নিচে জেনারেটর রুমের পাশে রাখা হয়েছিল। রথযাত্রায় অংশ নেওয়া মানুষ যখন ঘিরে রাখা বিষয়টি জানতে চায় তখন পুলিশ বলেছে, এখানে শর্ট সার্কিট হয়েছে। পরে লোকজনকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করে পুলিশ।
রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে বোমাটি রাখা হয়েছিল কিনা জানতে চাইলে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস্) মোহাম্মদ ওসমান গণি বলেছেন, আমরা সবকিছু মাথায় রেখেই তদন্ত করছি। এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে বোমাটি রাখা হয়েছিল। আমরা বিভিন্ন ক্যামেরার ফুটেজ দেখছি। জড়িতদের গ্রেপ্তার করা গেলে উদ্দেশ্য জানা যাবে।
ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক বলেছেন, দেশে উগ্রবাদ মাথাচাড়া দেওয়ার মতো কোনো লক্ষণ নেই। আমরা অনলাইন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, গোয়েন্দা তথ্য এবং আমাদের নিজস্ব ডাটাবেইসের মাধ্যমে উগ্রবাদী তৎপরতা নিয়মিত নজরদারি করছি। কোথাও কোনো তথ্য বা সংবাদ পেলেই তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
দেশে উগ্রবাদী সংগঠনগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা হওয়ার শঙ্কা সরকারের জন্য ভয়ের ও চ্যালেঞ্জর বলে মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক।
তিনি আগামীর সময়েকে বলেছেন, উগ্রবাদী সংগঠনগুলো আবারও মাথাচাড়া দিচ্ছে। এটাকে উড়িয়ে না দিয়ে সুষ্ঠু তদন্ত করা প্রয়োজন। রাথযাত্রাকে কেন টার্গেট করছে, মেট্রোরেলের নিচেই বা কেন বোমা রাখা হলো ইত্যাদি বিষয় নিয়ে তদন্ত প্রয়োজন।
‘ছাতার মধ্যে বোমা পাওয়া নাগরিকদের জন্য ভয় ও উদ্বেগের। অতীতেও উগ্রবাদীদের আইনের আওতায় নিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সক্রিয় ছিল, এখনও সক্রিয় রয়েছে। তবে উগ্রবাদীদের আটকের মধ্যে যাতে রাজনৈতিক কোনো ফায়দা না হয় সেটা নজরে রাখতে হবে’, যোগ করেন তিনি।