জুলাই আন্দোলনে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগে নানা প্রশ্ন উঠলেও দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো হয়নি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত। আন্দোলনের সময় ৭.৬২ মিলিমিটার গুলি, স্নাইপার রাইফেল, হেলিকপ্টার থেকে গুলি এবং সিভিল পোশাকে অস্ত্রধারীদের অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা থাকলেও এসব বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তদন্ত হয়নি। ফলে আন্দোলনে নিহত ও আহতদের পরিবার এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়ছে।
জুলাই আন্দোলনের সময় ঠিক কোন বাহিনী হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালিয়েছিল, কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার হয়েছিল কিংবা স্নাইপার রাইফেল ব্যবহারের অভিযোগে কারা জড়িত ছিল এসব প্রশ্নের এখনো স্পষ্ট উত্তর মেলেনি। এমনকি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থাও পুলিশ ছাড়া অন্য কোনো বাহিনীর ব্যবহৃত অস্ত্র বা গুলির ধরন এবং পরিমাণ সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করতে পারেনি।
উত্তরার আজমপুর এলাকায় আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন ওয়ালিদ ইসলাম নাঈম জমাদার। আন্দোলনের সময় তিনিও গুলিবিদ্ধ হন। বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, ‘আন্দোলনের সময় হেলিকপ্টার ব্যবহার হয়েছিল, অনেক মৃত্যুর পেছনে স্নাইপার থেকে গুলির সন্দেহ আছে। কিন্তু এসব নিয়ে গত দুই বছরে সুনির্দিষ্ট তদন্ত না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।’
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন বাড্ডা-রামপুরা-বনশ্রী এলাকায় আন্দোলনে অংশ নেওয়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শেখ নাজমুস সাকিব। তিনি বলেন, হেলিকপ্টারে করে সিভিল পোশাকের অস্ত্রধারীদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল এবং তার পাশেই একজন গুলিবিদ্ধ হন, যা স্নাইপার রাইফেলের গুলি হতে পারে বলে তার সন্দেহ।
নাঈম জমাদার বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত এটা রহস্য উদঘাটন করতে পারলো না যে গুলি হেলিকপ্টার থেকে হয়েছিল কিনা। কোন কোন স্পটে হয়েছিল। স্নাইপার শ্যুট কোন কোন স্পটে হয়েছিল। কয়জন স্নাইপার শ্যুটে মারা গেছে?’
তিনি আরও বলেন, ‘আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকটা পার্ট আছে, সেনাবাহিনী, র্যাব পুলিশ বিডিআর (বিজিবি) কোন পার্ট আমাদের উপর গুলি চালানো। নাকি ডিজিএফআই নাকি দেশের বাইরের অন্য কোনো বাহিনী, নাকি অন্য কোনো দেশের গোয়েন্দা সংস্থাকে ইউজ করেছে তারা এটাতো এখনো ধোয়াশার ভিতরে আছে।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রাণঘাতী গুলি, স্নাইপার, হেলিকপ্টার এবং বহিরাগতদের অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে আলাদা কোনো তদন্ত এখনো হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন দায়িত্ব নেওয়ার পর ৭.৬২ গুলির ব্যবহার এবং সিভিল পোশাকে অস্ত্রধারীদের বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তার দাবি, তার বক্তব্য পরে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘পুলিশ আহত দেখলাম। ছেলেদের বিভিন্ন জায়গায় ইনজুরি দেখলাম। একটা ছেলেকে দেখলাম হাতে বুলেট তার গুলি লেগে হাড্ডিতে গুড়োগুড়ো হয়ে গেছে। এগুলো আমি স্বচক্ষে দেখেছি। দেখার পর আমি বলেছিলাম যে এটা পুলিশকে কেন কীভাবে দেয়া হলো?’
তিনি আরও বলেন, ‘সিভিল পোশাকে এই প্রোহিবিটেড উইপন এগুলো নিয়ে পুলিশের সাথে একসঙ্গে তারা ফায়ারিং করছে। আমি বলেছিলাম সিভিলিয়ানদের হাতে এই রাইফেলগুলো কোথা থেকে গেল, কীভাবে গেল এটার একটা ইনকোয়ারি হওয়া দরকার। এটা নিয়ে আমি দু-তিনবার কথা বলেছি, কেবিনেটেই কথা বলেছি, তৎকালীন স্বরাস্ট্র উপদেষ্টাকে বলেছি। কিন্তু আমি ঠিক জানিনা এটা খুব সিরিয়াসলি কেউ নিয়েছিল কিনা।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ৭.৬২ গুলি পুলিশের কাছে আগে থেকেই ছিল। তবে জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই এ বিষয়ে তদন্ত করা হবে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘তদন্তে প্রাণঘাতী অস্ত্র ও ৭.৬২ গুলির ব্যবহার উঠে এসেছে। তবে এখন পর্যন্ত পুলিশ ছাড়া অন্য বাহিনীর ব্যবহৃত অস্ত্রের তথ্য তাদের হাতে নেই।’
তিনি বলেন, ‘র্যাব, বিজিবি আর্মি তারা যে অস্ত্রগুলো ব্যবহার করেছে সেই অস্ত্রের পরিচয় বা পরিসংখ্যান সেটা কিন্তু আমরা পাইনি। পুলিশ যেসব অস্ত্র লিথ্যাল উইপনগুলো ব্যবহার করেছে সেগুলোর মধ্যে এসএমজি, এলএমজি, চায়না রাইফেল শট গান, নাইন এমএম পিস্তল। সেভেন পয়েন্ট সিক্সটু গুলিগুলো ব্যবহার করেছে সেগুলোর একটা পরিসংখ্যান হলো সারা বাংলাদেশে পুলিশ প্রায় তিন লক্ষ পাঁচ হাজার গুলি পুলিশ ব্যবহার করেছে। আর ৯৫ হাজার গুলি শুধু ব্যবহার হয়েছে ঢাকাতে। প্রায় ৪১টা জেলায় লেথাল উইপন ব্যবহার করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের ইনভেস্টিগেশন চলমান আছে। র্যাব বিজিবি এবং আর্মি যে মরণঘাতী অস্ত্রগুলো ব্যবহার করেছে সেগুলোর উপর কাজ চলছে ইনভেস্টিগেশন পেন্ডিং আছে আমরা সেগুলো বের করার চেষ্টা করছি।’
জুলাই আন্দোলনে স্নাইপার ব্যবহারের অভিযোগও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে। উত্তরায় আন্দোলনকারী মীর মুগ্ধের মৃত্যু এবং আরও কয়েকটি ঘটনায় দূর থেকে ছোড়া গুলির বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘অনেকগুলো হত্যাকাণ্ড হয়েছে যে একটা মিছিল হচ্ছে সামনে পেছনে কিছু নাই হঠাৎ করে দেখা যাচ্ছে একটা বুলেট এসে লেগেছে সে সঙ্গে সঙ্গে পড়ে গেছে। বুলেটটা একদিক থেকে এসে অন্যদিক থেকে বের হয়ে গেছে। এটা অবশ্যই স্নাইপার শট যদি না হয় তাহলে এই জাতীয় হত্যাকাণ্ড সম্ভব না।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্নাইপারের ব্যবহার যে হয়েছে সেটা আমাদের প্রাথমিক ইনভেস্টিগেশনে বেরিয়ে এসেছে। তবে এটা সত্য এখন পর্যন্ত আমরা স্নাইপার রাইফেল জব্দ করতে পারিনি কিন্তু সেটা যে ব্যবহার হয়েছে সেটা আমরা মোটামুটি প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছি। তবে কারা করেছে সেটা এখনো শেষ হয়নি।’
সাবেক উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেনও দাবি করেন, তিনি আগস্ট মাসে অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তির কাছ থেকে স্নাইপার মোতায়েনের বিষয়ে সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন। তিনি বলেন, 'দুটো মৃতদেহ আমি নিজে দেখলাম। এক্সরে দেখলাম। একটা ছেলের মাথায় গুলি লেগেছে। পুরো ছিত্র হয়ে ভেতরে ঢুকে গেছে। স্নাইপার রাইফেল। এইমড অ্যাট। স্নাইপার কিন্তু ভাইটাল জায়গাগুলোতে ফায়ার করে।'
তিনি আরও বলেন, ‘আমাকে ওয়ার্ন (সতর্ক) করাতে আমি সরে আসছি। নাহলে হয়তো আমার উপর হামলা হতো। ক্লিয়ারলি বলেছে স্নাইপার ডেপ্লোয়েড স্যার আপনি আগাবেন না আপনি পেছনে চলে যান।'
এদিকে পুলিশ সদরদপ্তর জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে পুলিশের কাছে কোনো স্নাইপার রাইফেল ছিল না। গণমাধ্যমে প্রকাশিত স্নাইপার রাইফেল কেনার তথ্য জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের জন্য ছিল এবং সেগুলো ২০২৫ সালে পুলিশের হাতে আসে। ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থাও এখন পর্যন্ত পুলিশের মাধ্যমে স্নাইপার রাইফেল ব্যবহারের কোনো প্রমাণ পায়নি।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘আমরা যেটুকু সন্দেহ করি যে স্নাইপারের ব্যবহার হয়েছে উত্তরায়, যাত্রাবাড়ীতে এবং অনেকগুলো জায়গায়। স্নাইপারের ব্যবহার নিয়ে ইনভেস্টিগেশন আমাদের চলমান আছে নিশ্চই আমরা সেই বিষয়ে একটা কনক্রিট একটা রিপোর্ট আমরা দিতে পারবো।’
এদিকে সিভিল পোশাকে কারা স্নাইপার রাইফেল ব্যবহার করেছিল, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকায় বিভিন্ন মহলে নানা ধরনের ব্যাখ্যা ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে পড়ছে। আন্দোলনকারী শেখ নাজমুস সাকিব বলেন, ‘একটা ন্যারেশন কিন্তু আমরা শুনতে পাচ্ছি যে কোনো দল বা কোথা থেকে এইগুলো (স্নাইপার) করা হয়েছে বা নিজেদের উপর ফায়ার করা হয়েছে যাতে এটা সেই সময়কার সরকারের উপর দায় চাপিয়ে দেয়া যায়। এই সুযোগটা পাচ্ছে কারণ সুষ্ঠু তদন্তটা এখন পর্যন্ত হয় নাই।’
সাবেক উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেনের মতে, পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। তিনি বলেন, ‘এটা কারা ডিজাইন করেছে, একসেসিভ ফোর্স ইউজ করা হয়েছে, স্নাইপার কেন ইউজ করা হলো। কারা করলো, কে হুকুম দিল, কোথা থেকে আসলো। তারপরে এই উইপন গুলো, অ্যামুনেশন কোনটা ব্যবহার হয়েছে, কেন ইউজ হয়েছে এরকম যদি আপনি পুরো জিনিসটাকে স্টেপ বাই স্টেপ করেন তাহলে আপনি একটা পর্যায়ে পৌছাবেন যে কী ধরনের ঘটনা ঘটেছিল এবং বিষয়টা পরিস্কার হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা করি নাই বলে আপনি করবেন না! ঠিক আছে আমরা করি নাই- আমরা বেকুব, আমরা অথর্ব ছিলাম এখন আপনারা করবেন না তাই বলে! এটা হয়? আমি খুব দৃঢ়ভাবে বলছি হোম মিনিস্ট্রির উচিৎ হবে এই তদন্তগুলো করা। একসেসিভ ইউজ অফ ফোর্স, হু আর রেসপনসেবল। অনেক প্রশ্নের উত্তর জগাখিচুড়ি পাকিয়ে যাচ্ছে আবার।’
যদিও এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য দেয়নি। তবে মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার কার্যক্রমের অংশ হিসেবেই এসব বিষয় তদন্ত করা হবে। অন্যদিকে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর জানিয়েছেন, তদন্তের কাজে তারা স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাচ্ছেন এবং আলোচিত বিষয়গুলোর তদন্ত চলমান রয়েছে। তথ্যসূত্র: বিবিস বাংলা।