Image description

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে ‘পদত্যাগ না অপসারণ’ এই প্রশ্নে বৃহস্পতিবার দিনভর রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বক্তব্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তর্ক-বিতর্ক এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের মাঝে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ‘‘তিনি চাইলে পদত্যাগ করতে পারেন। সরকারের তরফ থেকে কোনও পদক্ষেপ এখানে নেই।’’  অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টি- এনসিপির পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতিকে ‘অপসারণ করা হচ্ছে’  দাবি করা হলে আলোচনা নতুন মোড় নেয়। এর আগে শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনালাপই তাঁর জন্য কাল হয়েছে বলা হচ্ছিলো। যদিও এই অভিযোগ সত‍্য কিনা প্রশ্নে খোদ রাষ্ট্রপতি বলেছেন, ‘এটি কল্পনার বাইরে’। প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কি রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করছেন, নাকি সরকার তাকে অপসারণ করছে?

বুধবার (২২ জুলাই) থেকেই আলোচনা চলে আসছে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ। বিভিন্ন গণমাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে লন্ডনে রাষ্ট্রপতির ফোনালাপের বিষয়টি এসেছে। অনেকে মনে করেন, পদত্যাগের কারণ হিসেবে এটিকেই ধরা হয়েছে। যদিও রাষ্ট্রপতি বাংলা ট্রিবিউনের কাছে ফোনালাপের বিষয়টি নাকচ করেছেন।

বুধবার রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়টি আলোচনার তুঙ্গে থাকলেও সরকারের পক্ষ থেকে আজ বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এ নিয়ে বলেছেন, ‘শারীরিক অসুস্থতা বা অন্য কোনও কারণে রাষ্ট্রপতি চাইলে পদত্যাগ করতে পারবেন। সংবিধানে সেই সুযোগ রয়েছে। তিনি চাইলে স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র দিতে পারবেন। এর বেশি কিছু জানা নেই।’

রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়ে সরকারের কোনও পদক্ষেপ আছে কিনা, এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘সরকারের কোনও পদক্ষেপ নাই এখানে। সরকারের পক্ষ থেকে তো আর কিছু বলা হচ্ছে না। আপনারা পত্রিকায় দেখছেন যে, গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে ইত্যাদি। আমিও শুনছি।’ পরে বিকালে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আবারও রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে প্রশ্ন করেন সাংবাদিকেরা। জবাবে তিনি বলেন, ‘শুক্রবার পর্যন্ত অপেক্ষা করেন।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের আগে অবশ্য বিএনপি’র কয়েকজন সিনিয়র নেতার সঙ্গে আলাপের চেষ্টা করা হয়। তারা সবাই প্রায় একই কথা বলেছেন, এই প্রসঙ্গে কোনও তথ্য নেই।

বৃহস্পতিবার বিকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে রাষ্ট্রপতির প্রসঙ্গ নিয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন।  সেখানে একজন সাংবাদিক জানতে চান, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বিদেশে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে তিনি ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোন কল করেছিলেন, এ রকম খবর প্রকাশ হয়েছে। তার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন। যেহেতু এটি বিদেশে ঘটেছে, এটার সঙ্গে কারা জড়িত, এটার কোনও তদন্ত বা এটার কোনও উদ্যোগ কি আপনারা নিচ্ছেন?

জবাবে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, ‘এ ব্যাপারে কোনও ডেফিনিট (সুনির্দিষ্ট) খবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পায়নি। যদি সেটা সত্যি হয়ে থাকে, তবে সেটা তদন্ত করবে সরকার ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।’

এদিকে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ‘পদত্যাগ’ নিয়ে আলোচনার মধ্যে নিজের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন অবশেষে ‘অপসারণ’ হচ্ছেন, এটা সুসংবাদ। পোস্টে তিনি লেখেন, ‘রাষ্ট্রপতির বিষয়টি অনেক আগেই রাজনৈতিকভাবে নিষ্পত্তি হওয়া উচিত ছিল। বিএনপিকে বারবার সতর্ক করা হলেও বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। সময়মতো উদ্যোগ নেওয়া হলে আজ এত আলোচনা-সমালোচনার অবকাশ থাকতো না। অবশেষে ‘অপসারণ’ হচ্ছেন, এটা সুসংবাদ।’

অন্যদিকে এনসিপির আহ্বায়ক এবং বিরোধী দলীয় চীফ হুইপ নাহিদ ইসলাম জামালপুরে এক পথসভায় বলেছেন, ‘রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু শুধু পদত্যাগ করলেই হবে না, পদত্যাগের পর তাকে গ্রেফতার করতে হবে। একজন যোগ্য অভিভাবকসুলভ ব্যক্তিকে দেশের মানুষ রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখতে চায়।’

নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির এত বছর পরে মনে হলো, তার পদত্যাগ করা প্রয়োজন। তিনি পদত্যাগ করবেন না, হয়তো সরকারই তাকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। বিএনপি সরকার বলে দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে সরকার গঠন করেছে। পাঁচ মাসে তারা আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন করতে পারে নাই। যেই সরকার আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন করার সক্ষমতা রাখে না, তারা দেশ পরিবর্তন করবে কীভাবে? ফ্যাসিবাদের দোসর চুপ্পু পদত্যাগ করলেই হবে না, পদত্যাগের পরে তাকে গ্রেফতার করতে হবে। কারণ গণহত্যায় তার সমর্থন রয়েছে, স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে তিনি দুর্নীতিবাজ। তাকে গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনতে হবে।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা কেউ কেউ মনে করছেন, সরকার রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করছে। বর্তমান পরিস্থিতি তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পদত্যাগ নাকি অপসারণ বলা তো দুরূহ। এটা সরকার চাপ দিচ্ছে নাকি তিনি নিজেই করছেন— এটার প্রমাণ আমার কাছে নাই। এখন মানুষ বলছে যে, রাষ্ট্রপতি নাকি লন্ডন গিয়ে শেখ হাসিনার সাথে কথা বলেছেন। এইজন্যও হতে পারে। সো উই ডোন্ট নো।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই রাষ্ট্রপতির অনেক আগেই যাওয়া উচিত ছিল। উনি তো এস আলম যে ইসলামী ব্যাংক দখল করেছে, সেটা ওনার মাধ্যমেই হয়েছে। এস আলম ইসলামী ব্যাংকে ঢুকেছে এই রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে। ওনার বিরুদ্ধে আরও যতসব অভিযোগ আছে, দুদকের অভিযোগ, আরও অনেক অভিযোগ আছে। ওনাকে আগেই সরানো উচিত ছিল। তাছাড়া উনি ক্লিয়ারলি একটা পক্ষের লোক ছিলেন এবং উনি রাষ্ট্রপতি হওয়ার যোগ্য কিনা সেটিও প্রশ্ন আছে। রাষ্ট্রপতি হবে যে রাষ্ট্রের প্রধান, সবার কাছে সম্মানিত সেরকম ব্যক্তি। ওনার আগেই চলে যাওয়া উচিত ছিল।’

রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ ইস্যুতে সিনিয়র সাংবাদিক মাসুদ কামাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘উনি পদত্যাগ করবেন— কোনও সন্দেহ নাই। কিন্তু পদত্যাগ জিনিসটা উনি করতে চাচ্ছেন, এটা যে খুবই আনন্দের সঙ্গে পদত্যাগ করছেন তা কিন্তু না। উনি যদি আনন্দের সঙ্গেই পদত্যাগ করতেন, তাহলে আরও আগেই করতেন। কিন্তু ওনার এই সময়ে পদত্যাগের পেছনে কী কারণ থাকতে পারে? কারণ উনি আওয়ামী লীগের রাজনীতি করছেন সারাজীবন, উনি বিএনপির রাজনীতি করেন নাই। উনি যদি পদত্যাগ আগেই করতেন, তাহলে তো বিএনপি সংসদে দাঁড়িয়ে শেখ হাসিনার সমালোচনা করতেন না। উনি বিএনপির সঙ্গে মিলে থাকার চেষ্টা করছেন, অনেক কিছু ত্যাগও করছেন। তো এখন, ত্যাগ করেও শেষ পর্যন্ত থাকতে পারলেন না।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখন হয়তো উনি ( রাষ্ট্রপতি)  চক্ষুলজ্জার খাতিরে বলবেন যে, আমি শারীরিক কারণে পদত্যাগ করলাম। ওনার শরীরের অবস্থাও ভালো না, ওনার শারীরিক কিছু সমস্যা তো আছেই। কিন্তু সেই কারণেই পদত্যাগ করবেন আলটিমেটলি আমি তা মনে করি না। এটা রাজনৈতিক কারণেই পদত্যাগ করছেন। আমি যেটা পারসোনালি মনে করি, সেটা হচ্ছে যে, শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছেন তিনি দেশে ফিরবেন? ডিসেম্বরের আগে ফিরবেন। ডিসেম্বরেই যে ফিরবেন তা তো না, নভেম্বরেও হতে পারে, অক্টোবরেও হতে পারে। অথবা তার আগেও হতে পারে। এখন এই ঘোষণাটাই আমার ধারণা সরকারকে ওনার ব্যাপারে একটু বিচলিত করে তুলছে।’

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘পদত্যাগ তো উনি নিজের থেকে করেননি। উনি পদত্যাগ করেছেন মনে হয় না। আমার তো মনে হয়, সরকার চাইছে উনি চলে যাক। সরকারের পক্ষ থেকে ওনার ওপরে যেভাবে প্রেশার তৈরি করা হয়েছে, উনি পদত্যাগ করতে পারেন। যদি সরকারের পক্ষ থেকে এটার কোনও বিস্ময় প্রকাশ করা হতো, একটা রিঅ্যাকশন দেওয়া হতো, তা তো করা হয়নি। গভর্মেন্ট তো এটাতে হ্যাপি মনে হচ্ছে। এটা হঠাৎ করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে এরকম ব্যাপার না, মনে হয় যেন তারা জানতেন। তার থেকে বেশি কিছু বলা যাচ্ছে না।’