মূলধন ঘাটতির কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের চারটি শাখা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেন্ট্রাল ব্যাংক অব দি ইউএই-সিবিইউএই নির্ধারিত মূলধন সংরক্ষণে ব্যর্থ হওয়ায় ব্যাংকটির কার্যক্রমে বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। একই সঙ্গে ঘাটতি পূরণ করা না গেলে বিদ্যমান ব্যবসা ধীরে ধীরে গুটিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইউএই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, দেশটিতে কার্যক্রম পরিচালনাকারী বিদেশি ব্যাংকের শাখাগুলোর জন্য ন্যূনতম ৪০০ মিলিয়ন দিরহাম পরিশোধিত মূলধন থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু জনতা ব্যাংকের ইউএই কার্যক্রমে বর্তমানে মূলধন রয়েছে মাত্র ১০০ মিলিয়ন দিরহাম। ফলে ঘাটতি রয়েছে ৩০০ মিলিয়ন দিরহাম, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। সিবিইউএই জানিয়েছে, নির্ধারিত মূলধন বজায় রাখতে ব্যর্থ হলে গ্রাহকের আমানত ঝুঁকিতে পড়তে এবং ব্যাংকের কার্যক্রম পরিচালনায় বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। ইতোমধ্যে ইউএই কেন্দ্রীয় ব্যাংক জনতা ব্যাংকের হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলনে সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে। পাশাপাশি নতুন গ্রাহকের হিসাব খোলা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিদ্যমান গ্রাহক ও দায়দেনা নিষ্পত্তি করে ধীরে ধীরে কার্যক্রম গোটানোর প্রস্তুতি নিতেও বলা হয়েছে। ব্যাংকটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইউএই ব্যাংকিং বিধিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় মূলধন সংরক্ষণে ব্যর্থতা এবং বাংলাদেশের জনতা ব্যাংকের সামগ্রিক আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ থেকেই নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি এ পদক্ষেপ নিয়েছে।
জরুরি বৈঠকের উদ্যোগ : ৮ জুলাই ইউএই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহকারী গভর্নর আহমদ সাইদ আল কামজি জনতা ব্যাংকের ইউএই প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ কামরুজ্জামানকে চিঠি দিয়ে বিষয়টি পরিচালনা পর্ষদকে অবহিত করতে এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত জানাতে নির্দেশ দেন। ৯ জুলাই সিবিইউএই জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. মজিবর রহমান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের অফসাইট সুপারভিশন বিভাগকেও তাদের সিদ্ধান্ত জানায়। এরপর ১৪ জুলাই অনুষ্ঠিত জনতা ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের ৮৮৪তম সভায় পরিস্থিতি মোকাবিলায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সমন্বয়ে জরুরি বৈঠকের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। পরবর্তীতে একই দিন জনতা ব্যাংকের এমডি মো. মজিবর রহমান আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেন।
তিন বছরে মূলধন বাড়ানোর প্রস্তাব : জনতা ব্যাংক ইউএই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে তিন বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয় মূলধন বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। জনতা ব্যাংকের এমডি মজিবর রহমান বলেন, ‘ইউএই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ৪০০ মিলিয়ন দিরহাম মূলধন পূরণের জন্য তিন বছর সময় চাওয়া হয়েছে। প্রস্তাব গ্রহণ না করলে সরকারের সহায়তায় প্রয়োজনীয় মূলধন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।’ তিনি বলেন, ‘ইউএই শাখাগুলোর অর্জিত মুনাফা ২০১৬ সাল থেকে সেখানেই রাখা হয়েছে এবং তা মূলধনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।’
খেলাপি ঋণ ৭৩ শতাংশের বেশি : জনতা ব্যাংকের আর্থিক দুর্বলতার অন্যতম কারণ হিসেবে বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণকে চিহ্নিত করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে জনতা ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ছিল ৫২ হাজার ৮৯১ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার ১৩১ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৪ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৭৩ দশমিক ৯৪ শতাংশ। জনতা ব্যাংকের এমডি মজিবর রহমান বলেন, ‘দেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মোট ঋণের ২০ শতাংশের বেশি খেলাপি হয়ে গেছে।’ তিনি বলেন, ‘জনতা ব্যাংকের প্রায় ৭০ শতাংশ ঋণ খেলাপি হলেও ব্যাংকটি এখনো স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ব্যাংকটি তারল্য অনুপাত (এসএলআর) বজায় রাখছে, কৃষি ও ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণ করছে, সরকারি এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি করছে এবং নতুন কার্ড ইস্যু করছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ব্যাংক প্রতি মাসে প্রায় ১২৫ কোটি টাকা বেতন পরিশোধ করছে এবং এজন্য কোনো ধরনের ঋণ নিতে হচ্ছে না। বড় ঋণ বিতরণ বন্ধ রয়েছে এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ছোট গ্রাহকদের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’
জনতা ব্যাংক ১৯৭৬ সালের অক্টোবরে সংযুক্ত আরব আমিরাতে কার্যক্রম শুরু করে। শুরুতে এর পরিশোধিত মূলধন ছিল ১২ দশমিক ৭ মিলিয়ন দিরহাম। বর্তমানে ব্যাংকটির ইউএইতে চারটি শাখা রয়েছে। এগুলো হলো আবুধাবি, দুবাই, শারজাহ ও আল আইন। এসব শাখার মাধ্যমে মূলত প্রবাসী বাংলাদেশিদের রেমিট্যান্স সেবা, অনাবাসী বাংলাদেশিদের ব্যাংকিং সুবিধা, আমদানি-রপ্তানি এলসি, ট্রেড ফাইন্যান্স, গ্যারান্টি, আমানত এবং বাণিজ্যিক ঋণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
ব্যাংকের নথি অনুযায়ী, ২০২০ সাল পর্যন্ত ইউএই কার্যক্রম থেকে জনতা ব্যাংক ৩২ মিলিয়ন দিরহাম মুনাফা করেছে। এর মধ্যে ২৫ মিলিয়ন দিরহাম মূলধনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া ২০১৭ সালে ইউএই কার্যক্রম থেকে ৮ দশমিক ৩৬ মিলিয়ন দিরহাম আয় দেশে ফেরত আনা হয়েছিল।
আর্থিক চাপে জনতা ব্যাংক : জনতা ব্যাংকের ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনেও ব্যাংকটির আর্থিক চাপের চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ব্যাংকটি ৩ হাজার ৯৩১ কোটি টাকা নিট লোকসান করেছে। আগের বছরের তুলনায় এ লোকসান প্রায় ২৮ শতাংশ বেশি। ব্যাংকের নিট সুদ আয় দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ৫ হাজার ৯০৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ ঋণ থেকে পাওয়া সুদ আয় আমানতের বিপরীতে দেওয়া সুদ পরিশোধের জন্য পর্যাপ্ত ছিল না। এ ছাড়া ব্যাংকের শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য (এনএভি) কমে ঋণাত্মক ১০৮ টাকা ৫১ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। এর অর্থ হলো, ব্যাংকের মোট দায় তার সম্পদের চেয়ে বেশি।
সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় : বাংলাদেশ ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, নিজস্ব অর্থায়নে জনতা ব্যাংকের পক্ষে ইউএই শাখাগুলোর প্রয়োজনীয় মূলধন পূরণ করা সম্ভব নয়। জনতা ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা দুর্বল। যেহেতু দেশি ও বিদেশি উভয় কার্যক্রমের মালিক সরকার, তাই ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত সরকারকেই নিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক শুধু নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে পারে। তিনি আরও বলেন, সরকার প্রয়োজনীয় মূলধন সরবরাহ না করলে ইউএই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিধিমালা অনুযায়ী শাখা বন্ধের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে শাখাগুলোর মূলধন, আমানত, গ্রাহকের দায় এবং অন্যান্য আর্থিক বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। তবে শাখা বন্ধের প্রক্রিয়া হলে জনতা ব্যাংকের জন্য তা বড় ধরনের আর্থিক ব্যয় ও সুনামগত ক্ষতির কারণ হতে পারে।