-- ড. মুহাম্মাদ সাইদুল ইসলাম
সমাজবিজ্ঞানে অনেক সিনড্রোম আছে—স্টকহোম সিনড্রোম, ইমপোস্টার সিনড্রোম, বাইস্ট্যান্ডার এফেক্ট। আমাদের সমাজে আরো একটি সিনড্রোম আছে, তবে এখনো পাঠ্যবইয়ে ওঠেনি।
আপাতত এর নাম দিই—"ভীমরতি সিনড্রোম"।
এই সিনড্রোমের লক্ষণ খুব সহজে চেনা যায়।
স্ত্রী আছেন, সন্তান আছে, সামাজিক মর্যাদা আছে—সবই আছে। কিন্তু হঠাৎ "বুড়োকালে ভীমরতি" র মতো জীবনের "দ্বিতীয় যৌবন" এসে হাজির! নতুন সম্পর্ক গড়ে ওঠে। রাতের পর রাত ফোন, গোপন সাক্ষাৎ, গোপন পরিকল্পনা—সাহসের কোনো ঘাটতি নেই। প্রয়োজনে শত বাধা পেরিয়ে নতুন সম্পর্ক বা নতুন বিয়ের ব্যবস্থাও হয়ে যায়।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, যিনি এত বড় দুঃসাহস দেখাতে পারেন, তিনি নিজের স্ত্রীকে সত্য কথাটি বলতে পারেন না। পরিবারকে জানাতে পারেন না। সমাজের সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পারেন না, "হ্যাঁ, এটি আমার সিদ্ধান্ত।"
এ যেন বাঘ শিকার করতে গিয়ে সফল হওয়া, কিন্তু বাড়ি ফিরে স্ত্রীকে সত্য বলার সময় ইঁদুরে পরিণত হওয়া!
সমাজতাত্ত্বিক এরভিং গফম্যান বলেছিলেন, মানুষ দুইটি মঞ্চে অভিনয় করে—Front Stage এবং Back Stage। সামনে তিনি আদর্শ, নীতিবান, দায়িত্বশীল; কিন্তু আড়ালে একেবারেই অন্য মানুষ। সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন দুই মঞ্চের দূরত্ব এত বেড়ে যায় যে একদিন পর্দা আর টেকে না।
লিওন ফেস্টিঙ্গারের Cognitive Dissonance Theory বলে, মানুষ নিজের কাজের সঙ্গে নিজের নৈতিক অবস্থানের সংঘাত তৈরি হলে সাধারণত দুটি পথ নেয়। হয় নিজের আচরণ পরিবর্তন করে, নয়তো আচরণের পক্ষে নতুন নতুন যুক্তি তৈরি করে। আশ্চর্যের বিষয়, দ্বিতীয় কাজটি সাধারণত অনেক সহজ!
তখন শোনা যায়—
"বিষয়টা এত সহজ নয়..."
"আপনারা পুরো ঘটনা জানেন না..."
"শরিয়তের দৃষ্টিতে..."
"এটা আসলে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে..."
যুক্তি যত বাড়ে, বিশ্বাস তত কমে।
রবার্ট মার্টনের Role Theory আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একজন মানুষ একই সঙ্গে স্বামী, পিতা, সন্তান, শিক্ষক, নেতা কিংবা ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব। একটি ভূমিকায় নেওয়া সিদ্ধান্ত অন্য সব ভূমিকাকে প্রভাবিত করে। তাই "এটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়"—এই যুক্তি সব সময় সমাজতাত্ত্বিকভাবে টেকে না। কারণ কিছু মানুষের ব্যক্তিগত জীবনও জনআস্থার অংশ হয়ে যায়।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্বটি দিয়েছেন পিয়ের বুর্দিয়ো। তিনি একে বলতেন Symbolic Capital—নৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা, সম্মান এবং মানুষের আস্থা। অর্থ বা ক্ষমতা হারালে আবার অর্জন করা যায়। কিন্তু নৈতিক মূলধন একবার ভেঙে গেলে সেটি পুনর্গঠন করতে অনেক সময় একটি জীবনও যথেষ্ট হয় না।
এমিল দুর্খেইম বলেছিলেন, সমাজ কেবল আইন দিয়ে টিকে থাকে না; টিকে থাকে পারস্পরিক বিশ্বাস দিয়ে। কোনো কাজ আইনগতভাবে বৈধ হলেও, যদি সেটি গোপনীয়তা, প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ কিংবা পারিবারিক সংকট সৃষ্টি করে, তবে তার সামাজিক মূল্য অনেক বড় হয়ে যায়।
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, এই সিনড্রোম কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, মতাদর্শ বা পেশার একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। এটি রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, করপোরেট কর্মকর্তা, শিক্ষক, সেলিব্রিটি, সমাজকর্মী কিংবা ধর্মীয় বক্তা—সবার মধ্যেই দেখা যেতে পারে। তবে যারা নৈতিকতা, পরিবার, সততা কিংবা ধর্মীয় মূল্যবোধ নিয়ে নিয়মিত কথা বলেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এর অভিঘাত বহুগুণ বেশি। কারণ মানুষ তাঁদের শুধু বক্তব্য নয়, চরিত্রও অনুসরণ করে।
এখানে একটি মৌলিক সমাজতাত্ত্বিক প্রশ্ন রয়েছে—
সাহস আসলে কোথায়: গোপনে নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলার মধ্যে, নাকি নিজের সিদ্ধান্তের দায় নিয়ে পরিবার ও সমাজের সামনে দাঁড়ানোর মধ্যে?
আমার মতে, প্রথমটি দুঃসাহস হতে পারে; দ্বিতীয়টিই প্রকৃত সাহস।
আমরা ভুল করতেই পারি। মানুষ নিখুঁত নয়। কিন্তু ভুলের চেয়েও বড় সমস্যা হলো গোপনীয়তা, প্রতারণা এবং দায় এড়িয়ে চলা। কারণ এগুলো কেবল একটি পরিবারকে নয়; বহু মানুষের বিশ্বাসকে ভেঙে দেয়। তখন "সীসা ঢালা প্রাচীরের" মতো অটল অনড় একটা সংগঠনকেও বালির বাঁধের মতো ভেঙে চুরমার করে দেয়!
ভীমরতি সিনড্রোমের সবচেয়ে বড় লক্ষণ প্রেম নয়—ভয়।
সম্পর্ক করার সাহস আছে, কিন্তু সত্য বলার সাহস নেই।
আর যে সমাজে সত্য বলার সাহস কমে যায়, সেখানে আস্থার সংকটই সবচেয়ে বড় সামাজিক সংকটে পরিণত হয়।
তাই সতর্ক থাকুন।
কারণ নৈতিক নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা মঞ্চে বক্তৃতা দেওয়া নয়; নিজের চরিত্রকে নিষ্কলুষ রাখা এবং ঘরে সত্য বলার সাহস দেখানো।