দেশের আদালতগুলোতে বর্তমানে প্রায় ৪৫ লাখ মামলা বিচারাধীন রয়েছে, যা বিচার ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেছেন, আদালতে মামলা দায়েরের আগেই বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি করা গেলে বিচারপ্রার্থীদের সময়, অর্থ ও ভোগান্তি কমবে এবং আদালতের ওপর চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) আইন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষ থেকে ভার্চুয়ালি ১০টি জেলায় মামলাপূর্ব বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন আইনমন্ত্রী।
আইনমন্ত্রী বলেন, প্রি-কেস (মামলাপূর্ব) বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা কার্যক্রম বিচারপ্রার্থীদের দ্রুত ও সহজে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি করছে। এর ফলে আদালতে নতুন মামলা দায়েরের সংখ্যা কমছে এবং ইতোমধ্যে এ উদ্যোগ আশাব্যঞ্জক ফল দিয়েছে। কার্যক্রমটি আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দীর্ঘদিনের মামলাজট নিরসনে বড় অগ্রগতি সম্ভব হবে।
তিনি জানান, পাইলট প্রকল্পের আওতায় ২০টি জেলায় প্রি-কেস মেডিয়েশন চালুর পর ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের তুলনায় ২০২৬ সালের একই সময়ে বিভিন্ন আইনে মামলা দায়েরের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
আইনমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পারিবারিক আদালত আইনে মামলা ৩ হাজার ৫৫৯টি থেকে কমে ১ হাজার ৭৪৪টিতে নেমেছে, যা প্রায় ৫১ শতাংশ হ্রাস। সিভিল জজ আদালতের এখতিয়ারভুক্ত বণ্টন সংক্রান্ত মামলা ২ হাজার ১টি থেকে কমে ৬৬১টিতে নেমেছে, অর্থাৎ কমেছে প্রায় ৬৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ।
এ ছাড়া স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি আইনের প্রিম্পশন মামলা ১৭টি থেকে কমে ২টি, নন-এগ্রিকালচারাল টেন্যান্সি আইনের মামলা ৩১টি থেকে কমে ১৪টি, যৌতুক নিরোধ আইনের মামলা ৫ হাজার ৬০৫টি থেকে কমে ১ হাজার ৮১০টি এবং পিতামাতার ভরণ-পোষণ আইনের মামলা ৪৩টি থেকে কমে ৩৫টিতে দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে গড়ে ৬২ দশমিক ০২ শতাংশ মামলা দায়ের কমেছে বলে জানান তিনি।
আইনমন্ত্রী বলেন, মামলা দায়েরের প্রবাহ কমানো গেলে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দ্রুত কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। তিনি বিচারকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, যেসব মামলা আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা সম্ভব, সেগুলো জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে মধ্যস্থতার জন্য পাঠানো হলে বিচারপ্রক্রিয়া আরও গতিশীল হবে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, আদালত, জেলা লিগ্যাল এইড অফিস, আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট সবাই সমন্বিতভাবে কাজ করলে আগামী এক বছরের মধ্যে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
আইনমন্ত্রী আরও বলেন, লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে পরিচালিত মধ্যস্থতা কার্যক্রম সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত এ কার্যক্রমের মাধ্যমে অসহায় ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বিনামূল্যে আইনগত সহায়তা ও দ্রুত ন্যায়বিচারের সুযোগ পাচ্ছে।
কক্সবাজার জেলায় বর্তমানে এক লাখের বেশি মামলা বিচারাধীন রয়েছে উল্লেখ করে তিনি জেলা জজ, বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের আগামী তিন মাসে মামলাজট দৃশ্যমানভাবে কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে বলেও জানান তিনি।
মামলাপূর্ব মধ্যস্থতা কার্যক্রম বাস্তবায়নে সহযোগিতার জন্য জাইকা, জিআইজেড ও ইউএনডিপিসহ উন্নয়ন সহযোগীদের ধন্যবাদ জানান আইনমন্ত্রী।
মধ্যস্থতাকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, এই দায়িত্বকে শুধু চাকরি হিসেবে নয়, বরং জনসেবামূলক দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে মধ্যস্থতা কার্যক্রমে কোনো ধরনের দুর্নীতি বরদাশত করা হবে না বলে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মনজুর হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আইন ও বিচার বিভাগের সচিব লিয়াকত আলী মোল্লা বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন যশোর জেলা ও দায়রা জজ মাহমুদা খাতুন, কক্সবাজারের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবু সালেহ মোহাম্মদ নোমান, জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার অভিজিৎ চৌধুরী ও জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আবদুল মান্নান।
অনুষ্ঠানের শেষে আইনমন্ত্রী ১০টি জেলায় একযোগে মামলাপূর্ব বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। জেলাগুলো হলো— বগুড়া, ঠাকুরগাঁও, পটুয়াখালী, ভোলা, নাটোর, যশোর, শরীয়তপুর, কক্সবাজার, পঞ্চগড় ও টাঙ্গাইল।
আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর ধারা ২১খ অনুযায়ী এসব জেলায় এখন থেকে সাতটি আইনের আওতাভুক্ত বিষয়ে আদালতে মামলা দায়েরের আগে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে হবে।
ঢাকাটাইমস