Image description

দেশে আবার বদলে যাচ্ছে ডেঙ্গুর ধরন। চলতি বছর আক্রান্তদের মধ্যে ডেন-৩ সেরোটাইপ শনাক্ত হয়েছে।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) জানিয়েছে, পরীক্ষিত নমুনার ৯১ শতাংশে ডেন-৩ শনাক্ত হয়েছে। বাকি ৯ শতাংশে ডেন-২ পাওয়া গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেন-৩-এর বিস্তারের ফলে ডেঙ্গু শক সিনড্রোম ও অন্যান্য জটিলতার ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে আগে ডেন-২-এ আক্রান্ত ব্যক্তিরা এবার আবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে গুরুতর অসুস্থ হওয়ার আশঙ্কা বেশি।

আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী কালের কণ্ঠকে বলেন, গত তিন বছর ডেন-২ এর প্রবণতা ছিল। এবার ডেন-৩ সংক্রমিত রোগী বেশি পাওয়া যাচ্ছে। ভাইরাসের ধরন বদলের কারণে দ্রুত ডেঙ্গু শক সিনড্রোমসহ জটিলতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে রোগীর অবস্থা অল্প সময়েই সংকটাপন্ন হয়ে যেতে পারে।

শিশু, বয়স্ক এবং দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

তিনি বলেন, পাহাড়ি বনাঞ্চলে যেখানে ম্যালেরিয়া বেশি, ‘এসব অঞ্চলে ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটেছে। সেখানে এডিস মশা রয়েছে। ওই এলাকায় দুজনের মৃত্যুর কারণ খুঁজতে গিয়ে ডেঙ্গুর ধরন ডেন-৩ পাওয়া যায়। এ জন্য আমরা বারবার বলছি, জ্বর হলে অবহেলা করা যাবে না।

দ্রুত ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে হবে। বিপৎসংকেত দেখা দিলে বিলম্ব না করে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোকে গুরুতর রোগী ব্যবস্থাপনায় প্রস্তুত থাকতে হবে।’

ডবল ইনফেকশনের ঝুঁকি বাড়ছে : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপ ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ ও ডেন-৪। একজন ব্যক্তি একবার একটি সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে অন্য সেরোটাইপে আবার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। দ্বিতীয়বার ভিন্ন সেরোটাইপে সংক্রমিত হলে ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার বা ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের আশঙ্কা অনেক বেড়ে যায়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, এত দিন দেশে ডেন-২-এর আধিপত্য থাকায় অনেক মানুষের শরীরে ওই সেরোটাইপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এখন ডেন-৩ বেশি ছড়ালে সেই প্রতিরোধ আর কার্যকর থাকবে না। ফলে আগে ডেন-২-এ আক্রান্ত ব্যক্তিরা আবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে পারেন এবং তাঁদের ক্ষেত্রে জটিলতার ঝুঁকি বেশি থাকবে।

ডেঙ্গুর বদলে যাওয়া চরিত্র : আইইডিসিআরের দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি বলছে, দেশে সময়ের সঙ্গে ডেঙ্গুর সেরোটাইপের আধিপত্য বদলেছে। ২০১৩-১৬ সালে দেশে ডেন-১ ও ডেন-২ বেশি ছিল। ২০১৯ সালে দেশের ইতিহাসের বড় প্রাদুর্ভাবে প্রায় ৯০ শতাংশ রোগীর শরীরে ডেন-৩ পাওয়া যায়। এরপর ২০২৩-২৫ সালে আবার ডেন-২ সবচেয়ে বেশি ছড়ায়। চলতি বছর  পরীক্ষিত নমুনার ৯১ শতাংশেই ডেন-৩ শনাক্ত হয়েছে।

গবেষকদের মতে, অতীতেও সেরোটাইপ পরিবর্তনের পর বড় আকারের ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। তাই এবারও ডেন-৩-এর দ্রুত বিস্তারকে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সর্বশেষ পরিস্থিতি : গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে ডেঙ্গুতে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ৩৭২ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে ৩৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে জুলাইয়ের প্রথম ১৯ দিনেই মারা গেছে ১৯ জন। ১ জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ১০ হাজার ৮৫৭ জন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৯ হাজার ৭৮৬ জন।

চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, ডেঙ্গুর প্রচলিত লক্ষণ এখন অনেক ক্ষেত্রেই বদলে গেছে। অনেক রোগীর উচ্চ জ্বর নাও থাকতে পারে। জ্বর কমার পরই শুরু হচ্ছে সবচেয়ে বিপজ্জনক সময়। দ্রুত রক্তচাপ কমে যাচ্ছে এবং প্লাটিলেট নেমে যাচ্ছে। লিভার, কিডনি ও মস্তিষ্ক আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা বাড়ছে। তীব্র পেটব্যথা, বমি, অতিরিক্ত দুর্বলতা ও পাতলা পায়খানা এখন বেশি দেখা যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, জ্বর কমে গেলেই রোগী সুস্থ হয়ে গেছেনএমনটি ধরে নেওয়া যাবে না। জ্বর কমার পরের ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টাই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়। এ সময় নিবিড় পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।

কয়েক বছরে বদলে গেছে চিত্র : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি বছরে এ পর্যন্ত আক্রান্তদের ৭৬ শতাংশই ঢাকার বাইরের। এ ধারা চার বছর ধরে অব্যাহত রয়েছে। এর আগে ২০২১ সালে মোট ডেঙ্গু রোগীর মাত্র ১৬ শতাংশ ছিল ঢাকার বাইরের। ২০২২ সালে তা বেড়ে ৩৭ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৬৫ শতাংশ, ২০২৪ সালে ৬০ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে ৬৯ শতাংশে পৌঁছায়।

সর্বশেষ তথ্য মতে, ঢাকা মহানগরে আক্রান্ত দুই হাজার ৩৪১ জন। ঢাকা বিভাগে ( মহানগরের বাইরে) এক হাজার ১৭২ জন। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত বরিশাল বিভাগে দুই হাজার ৪৪৩ জন, যা মোট রোগীর ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি চারজন রোগীর একজন বরিশাল বিভাগের। এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম (১,৭২১), খুলনা (১,২৭৬), ময়মনসিংহ (৩৩৯), রাজশাহী (৩২৪), সিলেট (৮০) ও রংপুর বিভাগ (৭৪)।

কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, এ বছর বরিশাল, বরগুনা, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, বাগেরহাট, খুলনা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, চাঁদপুর, কুমিল্লা, ঢাকা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, নরসিংদী, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ জেলা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

জনস্বাস্থ্যবিদ ও রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার (সিডিসি) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ বলেন, গত ২৫ বছরেও ঢাকায় কার্যকরভাবে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। ঢাকার বাইরের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা আরো সীমিত হওয়ায় ভবিষ্যতে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া আরো কঠিন হবে।

তাঁর মতে, মশা নিয়ন্ত্রণে সুস্পষ্ট লক্ষ্য, নিয়মিত ওয়ার্ডভিত্তিক জরিপ, আধুনিক গবেষণাগার এবং প্রশিক্ষিত কীটতত্ত্ববিদের অভাব রয়েছে। এসব ঘাটতি দূর না করলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থায়ী সাফল্য আসবে না।