জীবনের সব সঞ্চয় ও পেনশনের টাকা দিয়ে মিরপুরে ১ হাজার ২০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা শফিউল আলম (৬৫)। চাবি পেয়ে সপরিবারে বসবাস করলেও দুই বছরেও ফ্ল্যাটটি নিজের নামে নিবন্ধন করতে পারেননি। কারণ, ৮০ লাখ টাকার ফ্ল্যাটটি নিজের নামে লিখে নিতে সরকারের কর, ফি ও আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে প্রয়োজন আরও ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা। এখন আতঙ্কে আছেন তার ফ্ল্যাট না হাতছাড়া হয়ে যায়।
সৌদি প্রবাসী আনোয়ার ১০ বছরের খাটুনির টাকায় উত্তরায় ফ্ল্যাট কিনে ১৫ লাখ টাকা বাড়তি নিবন্ধন ব্যয়ের কারণে তা রেজিস্ট্রি না করেই ক্ষোভ নিয়ে বিদেশে ফিরে গেছেন। আনোয়ার বলেছেন, ‘বিদেশে থেকে টাকা পাঠালে সরকার রেমিট্যান্স বোনাস দেয়; কিন্তু সেই টাকা দিয়ে দেশে সম্পদ কিনতে গেলে গলাকাটা কর নেয়। এখন টাকা জোগাড় করতে না পেরে ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রি না করেই আবার বিদেশে চলে যাচ্ছি। এটা যে কত বড় ঝুঁকি, তা শুধু আমিই জানি।’
শফিউল আলম বা আনোয়ারের এই উদ্বেগ শুধু একক কোনো ব্যক্তির নয়; বরং দেশের আবাসন খাতের এক ভয়াবহ ও নীরব সংকটের প্রতিচ্ছবি। একদিকে আকাশচুম্বী নিবন্ধন ব্যয়, অন্যদিকে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি— এই দুইয়ের জাঁতাকলে পড়ে ফ্ল্যাট কিনেও মালিক হতে পারছেন না অসংখ্য গ্রাহক।
আন্তর্জাতিক আবাসন খাতের বিশ্লেষণে দেখা যায়, যেখানে ফ্ল্যাট নিবন্ধনের গড় ব্যয় ভারতে ৫-৭ শতাংশ, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৪ শতাংশ, সিঙ্গাপুরে ৩-৪ শতাংশ এবং যুক্তরাজ্যে ২-৫ শতাংশ (স্ল্যাবভিত্তিক), সেখানে বাংলাদেশে তা ১০-১৫ শতাংশ এবং প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল ও সনাতনী।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, উচ্চ করের পাশাপাশি নীতিনির্ধারণী কিছু দুর্বলতা মানুষকে অনানুষ্ঠানিক লেনদেনে উৎসাহিত করছে। সরকারি মৌজা রেটের সঙ্গে প্রকৃত বাজারদরের মিল না থাকায় দলিলে মূল্য গোপন করার প্রবণতা বাড়ছে। অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে ‘টেবিল মানি’ ছাড়া ফাইল নড়ে না। এ ছাড়া সনাতনী ও দীর্ঘসূত্রতাপূর্ণ অ্যানালগ প্রক্রিয়ার কারণে সাধারণ মানুষ দলিল না করে আমমোক্তারনামা (পাওয়ার অব অ্যাটর্নি) বা অভ্যন্তরীণ চুক্তিতেই সীমাবদ্ধ থাকছেন।
নিবন্ধিত দলিল না থাকায় গ্রাহকরা ফ্ল্যাট বন্ধক রেখে ব্যাংক ঋণ নিতে পারছেন না। ডেভেলপার কোম্পানি ঋণখেলাপি বা আইনি জটিলতায় পড়লে গ্রাহকদের মালিকানা আদালত পর্যন্ত গড়াচ্ছে। এমনকি ফ্ল্যাট মালিকের মৃত্যুর পর উত্তরসূরিদের নামে নামজারি করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
রিহ্যাবের প্রেসিডেন্ট ড. আলী আফজাল আগামীর সময়কে বলেছেন, আবাসন খাতে উচ্চ নিবন্ধন ব্যয় বর্তমানে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্রেতা ফ্ল্যাট ক্রয় করলেও অতিরিক্ত নিবন্ধন ব্যয়ের কারণে তাৎক্ষণিকভাবে নিবন্ধন সম্পন্ন করতে পারছেন না। এর ফলে একদিকে সরকার প্রত্যাশিত রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে ক্রেতারাও আইনি মালিকানা নিশ্চিত করতে পারছেন না।
রিহ্যাব দীর্ঘদিন ধরে নিবন্ধন ব্যয়কে একটি সহনীয় ও যৌক্তিক পর্যায়ে আনার দাবি জানিয়ে আসছে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, ‘দুঃখের সঙ্গে আমরা লক্ষ করলাম, এবার বাজেটে এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলো না।’
রিহ্যাবের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আব্দুর রাজ্জাক আগামীর সময়কে বলেছেন, বর্তমানে ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন খরচ প্রায় ১৩ শতাংশ বা তার বেশি। এই উচ্চ ব্যয়ের কারণে আমার পরিচিত অনেকেই ১০-১২ বছর ফ্ল্যাটে থাকছেন, কিন্তু রেজিস্ট্রেশন করছেন না। সরকার এখানে হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।
ফ্ল্যাট কেনার সময় নিবন্ধন না করে পরে করতে গেলে অনেকেই জটিলতায় পড়ছেন। আব্দুর রাজ্জাক তার নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেছেন, আমার এক আত্মীয় ফ্ল্যাট কিনলেও রেজিস্ট্রেশন করেননি। পরে ক্যানসারে প্রথমে স্ত্রী এবং পরে স্বামী মারা যান। তাদের দুটি সন্তান থাকলেও ফ্ল্যাটটি নিবন্ধন করতে পারছি না।
আবাসন খাতের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ এই ব্যবসায়ী নেতা বলেছেন, আমরা প্রস্তাব করছি, রেজিস্ট্রেশন ফি কমিয়ে ৫-৭ শতাংশে আনা হোক। এ ছাড়া সেকেন্ডারি ফ্ল্যাট (পুরনো ফ্ল্যাট) বিক্রিেত ফি ২-৩ শতাংশ করা হোক।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আব্দুল্লাহ আল মাসউদ জানিয়েছেন, তার এক ক্লায়েন্ট একটি আবাসন কোম্পানির কাছ থেকে মোহাম্মদপুরে একটি ফ্ল্যাট কেনেন। কিন্তু নিবন্ধন না করেই কোম্পানির পরিচালকরা দেশ ছেড়েছেন। পরে উচ্চ আদালতের রায় নিয়ে তিনি নিজের নামে নিবন্ধন করেন। নিবন্ধন না করলে কোম্পানির মালিকানা বা ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন হলে ফ্ল্যাট মালিককে ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
