বিগত ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেওয়া শরিক দলগুলোর মধ্যে নীতিগত মতভিন্নতা থাকতে পারে, তবে কোনো বিভেদ নেই বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিগত আন্দোলন-সংগ্রামের ভিত্তি হিসেবে পরিগণিত ৩১ দফা এবং জুলাই সনদের আলোকে ঐক্যবদ্ধ থেকে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে তিনি বলেছেন, ‘ক্ষমতায় গেলেও বিএনপি শরিকদের ভুলে যায়নি। আগের মতো আমরা এক আছি, এক থাকব।’ শরিক দলগুলোর নেতাদের যথাযথ মূল্যায়নের আশ্বাসও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
আজ সোমবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সম্মানে আয়োজিত নৈশভোজের আগে দেওয়া এক সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বললেন।
বক্তব্যের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘদিন পর শরিক নেতাদের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পেয়ে তাদের সঙ্গে রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রাম ও ত্যাগের স্মৃতিচারণ করেন। তিনি বললেন, বিগত দিনে একসঙ্গে রাজপথে আন্দোলন করতে গিয়ে সবাই সমানভাবে অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের পর দেশের মানুষের ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন সফল হয়েছে এবং সাধারণ জনগণ ব্যালটের মাধ্যমে তাদের রায় দিয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেছে।
আন্দোলনের পটভূমি ও শরিকদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘আমাদের মধ্যে মতভিন্নতা থাকতে পারে। একটি নির্দিষ্ট দফা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে— তা নিয়ে একেক দলের একেক রকম মতামত থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অভিন্ন। ফলে শরিকদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির কোনো অবকাশ নেই। ৩১ দফার মাধ্যমে আমরা একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে একত্রিত হয়েছিলাম এবং দেশের মানুষও নির্বাচনে এই ৩১ দফার পক্ষেই রায় দিয়েছে।’
বিগত ১৭ বছরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং রাজপথের লড়াইয়ের চিত্র তুলে ধরে তারেক রহমান বললেন, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের দিনগুলোতে যাদেরকে সাধারণ মানুষ ‘গুপ্ত’ হিসেবে চেনে, তাদেরকে রাজপথে কখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। তারা আন্দোলনের সময়ে আত্মগোপনে ছিল অথবা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়াদের সঙ্গে নানাভাবে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। তবে বিগত চব্বিশের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার বিতাড়িত হওয়ার পর সেই বলয়টি ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে আসে।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের একজন উপদেষ্টার সঙ্গে সম্প্রতি হওয়া এক সাক্ষাতের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টা তার সঙ্গে আলোচনাকালে স্বীকার করেছেন যে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনামলে প্রায় ৬০ শতাংশের বেশি প্রভাব ছিল একটি নির্দিষ্ট অদৃশ্যের নিয়ন্ত্রণে। সে সময় সরকার পরিচালনা করতে গিয়ে তারা নিজেদের অসহায় বোধ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী জানান, চব্বিশের ৫ আগস্টের পর এবং পরবর্তী নির্বাচনে জনগণ স্বাধীনভাবে রায় দেওয়ার পর থেকে ওই চক্রটি দিশাহারা হয়ে সামাজিক মাধ্যমসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। তবে বাংলাদেশের জনগণ যে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে কখনো ভুল করে না, নির্বাচনে তা আবারও প্রমাণিত হয়েছে।
শেখ হাসিনা সরকারের বিগত ১৬-১৭ বছরের শাসনামলে দেশের বিধ্বস্ত অর্থনীতি, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে তা পুনর্গঠনে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি শরিক নেতাদের উদ্দেশ্যে বললেন, সাধারণ মানুষ বিশাল প্রত্যাশা নিয়ে নতুন সরকারকে দায়িত্ব দিয়েছে। জনগণের এই আস্থা ধরে রাখতে যে কোনো মূল্যে আন্দোলনকারী শক্তিগুলোকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। এই মুহূর্তে নিজেদের কথা না ভেবে জনগণের প্রত্যাশা পূরণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে সরকার গঠনের পর আন্দোলনের শরিক দলের নেতাদের সঙ্গে এটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ অনুষ্ঠান।
অনুষ্ঠানটিকে অনেকে ‘ফেয়ারওয়েল ডিনার’ হিসেবে দেখছেন কি না— এমন এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী হাসিমুখে বললেন, ফেয়ারওয়েল বা বিদায়ী নৈশভোজ যদি দিতেই হয়, তা দেওয়া হবে ফ্যাসিবাদের দোসর ও গোপনে ষড়যন্ত্রকারীদের। আন্দোলনকারী মিত্র দলগুলো অতীতে যেভাবে একসঙ্গে ছিল, ভবিষ্যতেও দেশ গঠনে সেভাবেই একসঙ্গে কাজ করে যাবে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পূর্বে ও পরে শরিক দলের নেতাদের পক্ষে বক্তব্য দেন জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর)-র চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মুফতি মহিউদ্দিন ইকরাম।
নৈশভোজে নাগরিকে ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, বিজেপির আন্দালিব রহমান পার্থ, গণফোরামের সুব্রত চৌধুরীসহ শরিক জোটের শীর্ষনেতা এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
নৈশভোজে প্রধানমন্ত্রী- সংগৃহীত
প্রধানমন্ত্রী সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার কিছু আগে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে প্রবেশ করেন। এরপর যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর নেতাদের জন্য উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে প্রস্তুত করে রাখা নির্দিষ্ট স্থানে যান। সেখানে প্রতিটি টেবিল ঘুরে ঘুরে নেতাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
পরে সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠান শুরু হয়। অনুষ্ঠান শেষে শরিকদের সঙ্গে ডিনার করেন সরকারপ্রধান।
বৈঠক প্রসঙ্গে জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের মুখপাত্র ও বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক পার্টির চেয়ারম্যান এস এম শাহাদাত আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটসহ আরো কয়েকটা জোটের শীর্ষ নেতারা তাদের মূল্যায়নের দাবি তুলেছেন। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে সবাইকে আশ্বস্ত করেছেন। সরকারপ্রধান বলেছেন, ভঙ্গুর অর্থনীতি, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ ও গুপ্ত প্রশাসনের জন্য তাদের অনেক বেগ পেতে হচ্ছে। তবে দ্রুত সব সমস্যার সমাধান করে জোট নেতাদের মূল্যায়নের বিষয়টিরও সমাধান করা হবে।
‘প্রধানমন্ত্রী আর বলেছেন, শরিক জোট নেতাদের সঙ্গে নিয়ে ৩১ দফা বাস্তবায়ন করা হবে,’ যোগ করেন তিনি।