ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে আসন অনুপাতে সংরক্ষিত আসনে ক্ষমতাসীন বিএনপির ৩৬, জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐকের ১৩ এবং স্বতন্ত্র নারী এমপি রয়েছেন একজন।
তবে গত ৬ জুন বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে বিরোধীদলীয় এমপিদের ৭৯টি আসন তদারকি ও রাজনৈতিক সমন্বয়ের জন্য বিএনপির নারী এমপিদের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
এতে কোনও নারী এমপিকে বিরোধীদলীয় একটি আসনে, কাউকে দুটি এবং কয়েকজনকে সর্বোচ্চ ৪টি করে আসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া কয়েকজনকে পুরো জেলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে—যেখানে জামায়াত ও এনসিপি নেতারা নির্বাচিত হয়েছেন।
শুধু তাই নয়, স্বতন্ত্র এমপি ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার আসনেও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সরকারদলীয় নারী এমপিকে। একই অবস্থা চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলনের একমাত্র এমপির আসনেও। যদিও ব্যতিক্রম বিএনপির সঙ্গে থাকা স্বতন্ত্র ৬ এমপির আসনে। সেখানে নারী এমপিদের কোনও খবরদারি নেই বলে জানা গেছে।
বিরোধী দলের এমপিদের আসনের উন্নয়নে বিএনপির নারী এমপিরা ডিও লেটার বা আধা সরকারি পত্র দিতে পারবেন বলে সভায় জানানো হয়। এ ছাড়া অন্যান্য কার্যক্রমেও নারী সংসদ সদস্যদের সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা করছে সরকার। এ নিয়ে সংসদের ভেতরে ও বাইরে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বিরোধীদলীয় এমপিরা। এমনকি তারা অতীতের দৃষ্টান্তও টেনে এনেছেন। তাদের অভিযোগ, ‘বিগত ফ্যাসিবাদী আমলেও বিরোধীদলীয় আসনের ক্ষেত্রে এমন আচরণ দেখা গেছে। বর্তমানে বিরোধী দলকে সরকার সব জায়গায় দমন করছে। বিরোধীদের আসনের দায়িত্ব সরকারদলীয় নারী এমপিদের দেওয়া তারই ধারাবাহিকতা।’ তাদের আশঙ্কা, বিরোধীদলীয় এমপিরা কোনও উন্নয়নকাজ করলেও তা প্রচার হবে বিএনপির নারী এমপিদের নামে।
বিরোধী দলের এমপিদের আসনে ক্ষমতাসীন দলের নারী এমপিদের প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতাকে একেকজন একেকভাবে মূল্যায়ন করছেন। অনেকে মনে করেন, এতে বিরোধীদলীয় এমপিরা কিছুটা গুরুত্বহীন হয়ে যেতে পারেন কিনা সে আলোচনাও হচ্ছে। এর মাধ্যমে বিএনপি আসলে কী অর্জন করতে চায়? সেটি বিশ্লেষণও করছেন কেউ কেউ।
বিষয়টি নিয়ে বিএনপির অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ১০ জুন জাতীয় সংসদে তিনি বলেন, সরকারের যে ‘নিয়ম’ আছে, সে ‘নিয়ম’ অনুযায়ীই এগোচ্ছেন তারা।
এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘নির্বাচিত এমপিরা নিজ নিজ আসনের উন্নয়ন বরাদ্দ এবং ডিও লেটারের দায়িত্ব তারাই পালন করবেন। সেখানে সরকারদলীয় নারী এমপিদের হস্তক্ষেপ করার সুযোগ নেই। এটি আইনের পরিপন্থি। এর মাধ্যমে বিএনপি আসলে কী অর্জন করতে চায়, সেটি তারাই ভালো বলতে পারবে।’’
কোন আসনের দায়িত্বে কে?
জামায়াতসহ বিরোধীদলীয় এমপিদের আসনে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের এমপিদের দায়িত্ব দিয়েছে দলটি। গত ৪ জুন জাতীয় সংসদে সরকারদলীয় এমপিদের সংসদীয় বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নির্দিষ্ট করে দেওয়া আসনের মধ্য ঢাকা-১২, ১৫ ও ১৬ আসনে বিএনপির নারী এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। মূলত তিনটি আসনই জামায়াতের। এর মধ্য ঢাকা-১৫ আসনের সংসদ সদস্য জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। ঢাকা-১২ আসনের এমপি জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন এবং ঢাকা-১৬ আসনের এমপি কর্নেল (অব.) আবদুল বাতেন।
ঢাকা-১১ আসনের এমপি এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তার আসনে দায়িত্ব পেয়েছেন বিএনপির শাম্মী আক্তার। পাশাপাশি সিলেট-৫ আসনের দেখভালও করবেন তিনি। এই আসনের এমপি খেলাফত মজলিসের আবুল হাসান।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার আসনে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে নাদিয়া পাঠান পাপনকে। রুমিন বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র নির্বাচন করে জয়ী হন।
পাবনা-১, ৩ ও ৪ আসনের দায়িত্বে দেওয়া হয়েছে আরিফা সুলতানা রুমাকে। সাতক্ষীরা-১, ২, ৩ ও ৪ আসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বীথিকা বিনতে হোসাইনকে। তার বাড়ি লক্ষ্মীপুরে।
পিরোজপুর-১ আসনে জামায়াতের মাসুদ সাঈদীর আসনে সেলিনা সুলতানা জুঁইকে, আর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংরক্ষিত আসনের এমপি সেলিমা রহমানকে বরগুনা-১ ও পটুয়াখালী-৩ আসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বরগুনা-১ আসনে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের সংসদ সদস্য মুফতি মাহমুদুল হাসান ওয়ালিউল্লাহ এবং পটুয়াখালী-৩ আসনে জামায়াতের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ।
জামায়াতের এমপি থাকা চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১, ২ ও ৩ আসনে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মায়ের ডাকের সানজিদা ইয়াসমিন তুলিকে।
সেলিনা সুলতানা নিশিতাকে দেওয়া হয়েছে গাজীপুর-৪ ও সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের দায়িত্ব। ময়মনসিংহ ২ ও ৪ আসনে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে নিলোফার চৌধুরী মনিকে। শওকত আরা ঊর্মিকে মেহেরপুর-১ ও ২ আসনে, মাহমুদা হাবিবাকে রাজশাহী-১ ও ৪ আসনে, রাশেদা বেগম হীরাকে কুমিল্লা-৪ ও ১১ আসনে, জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদকে যশোর-১, ২, ৪ ও ৫ আসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিএনপির স্বনির্ভর বিষয়ক সম্পাদক শিরীন সুলতানাকে ঢাকা-৪ ও ঢাকা-৫ আসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।নির্বাহী কমিটির সদস্য নিপুণ রায় চৌধুরীকে নড়াইল ও মাগুরা জেলায়, জেবা আমিন ও ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানাকে রংপুর জেলার ছয়টি আসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। নেওয়াজ হালিমা আরলিকে চুয়াডাঙ্গা, ফরিদা ইয়াসমীনকে কুষ্টিয়া-৩ আসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আর রেহেনা আক্তার রানুকে নীলফামারী ও ফাহমিদা হককে খুলনায় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
অতীতের ধারাবাহিকতায় এগোচ্ছে সরকার?
বিরোধীদলীয় এমপিদের আসনে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যদের কর্তৃত্ব নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বিরোধীদলীয় এমপিরা। বিরোধী দলের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণের অভিযোগ তুলেছেন তারা। অনেকে বলেছেন, সরকার অতীতের ধারাবাহিকতায় এগোচ্ছে।
এ নিয়ে সংসদে প্রশ্ন তোলেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। সংসদে তিনি বলেন, ‘‘এ সিদ্ধান্তে নির্বাচনি এলাকায় অনর্থক সংঘাত তৈরি হবে। শুধু বিরোধীদলীয় এমপির সঙ্গে নয়, বিএনপির যারা স্থানীয় নেতৃত্ব রয়েছেন, তাদের সঙ্গেও নারী এমপিদের বিরোধ তৈরি হবে। আর সরকারের উদ্দেশ্য যদি মহৎ থাকতো, তাহলে বিরোধী দলের নারী এমপিদেরও আসন বণ্টন করে দেওয়া হতো। কিন্তু তারেক রহমানের বিএনপি শেখ হাসিনার দেখানো পথেই চলছে।’’ তিনি বলেন, ‘‘আমরা মনে করি, অতীতের অনৈতিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে গেলে সরকার প্রশ্নবিদ্ধ হবে।’’
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের এমপি সাইফুল আলম খান মিলন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘নির্বাচিত এমপিদের আসনে সরকার দলীয় নারী এমপিদের কর্তৃত্ব এক ধরনের অগণতান্ত্রিক ও বৈষম্যমূলক আচরণ। এর মাধ্যমে আমাদের নানাভাবে বঞ্চিত করার পাঁয়তারা বলেই মনে করছি।’’ তিনি বলেন, ‘‘বিএনপির নারী এমপিরা অযাচিত হস্তক্ষেপ করলে সংশ্লিষ্ট আসনে এক ধরনের সমন্বয়হীনতা কাজ করবে।’’ তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপি আমাদের গুরুত্বহীন করার অপচেষ্টা করছে কিনা সময়ই সেটা বলে দেবে।
প্রধানমন্ত্রীর ব্যাখ্যা
বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের নির্বাচনি এলাকায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের দায়িত্ব কেন সংরক্ষিত আসনের সরকার দলীয় নারী এমপিদের দেওয়া হয়েছে—জাতীয় সংসদ তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ১০ জুন জাতীয় সংসদে এ নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।
তিনি বলেন,, উন্নয়ন বরাদ্দ এবং ডিও লেটারসহ সব ক্ষেত্রে সরকারের যে ‘নিয়ম’ আছে, সে অনুযায়ীই এগোচ্ছেন তারা। সেদিন ঢাকা-১৪ আসনে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেমের (আরমান) এক সস্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘আমাদের দল থেকে এবং আপনাদের দল থেকে যেসব নারীকে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে, সংবিধানে বা আইনে নির্দিষ্টভাবে তাদের কোনও আসন নেই।’’
আপনার বা আমার যেকোনও নির্দিষ্ট আসন আছে, সেরকম নির্দিষ্ট কোনও আসন তাদের নেই। খুব স্বাভাবিকভাবেই আমরা আমাদের রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক যে কাঠামো, তার ভিত্তিতে দলীয় অবস্থান থেকে কিছু জায়গা তাদের জন্য নির্দিষ্ট করেছি, তারা কোথায় কাজ করবেন।’’
“নির্বাচনি এলাকায় একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে আপনার সম্পূর্ণ হক আছে, আপনি এলাকার উন্নয়নের ব্যাপারে কীভাবে ভূমিকা রাখতে চান? যেহেতু এই সংসদ এই নারী নেত্রীদের বা নারী সংসদ সদস্যদের নির্বাচিত করেছেন। খুব স্বাভাবিকভাবেই তাদেরও একই রকমভাবে হক আছে। আপনার এলাকার যদি কোনও উন্নয়নের বিষয়ে আমার সহযোগিতা করার কিছু থাকে, জানাবেন।’’
বিরোধী দলকে গুরুত্বহীন করার অভিযোগ
বিরোধী দলকে গুরুত্বহীন করার অপচেষ্টা হচ্ছে, এমন অভিযোগ অস্বীকার করছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। তাদের মতে, বিরোধী দলীয় এমপিরা তাদের ন্যায্য অধিকার হিসেবে সরকারের বরাদ্দ পাবেন। এটা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। বিরোধীদলীয় এমপিরা তো তাদের জন্য প্রাপ্য বরাদ্দ ঠিকই পাচ্ছেন।
এ বিষয়ে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি সুলতানা আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘সংরক্ষিত নারী আসনে সংবিধান অনুযায়ীই আসন বরাদ্দ দিয়েছে বিএনপি। এটি নিয়ে বিতর্ক তোলা অবান্তর। সরকার যদি বিরোধী দলের এমপিদের আসনে প্রাপ্য বরাদ্দ না দেয়, তাহলে সেটা ভিন্ন কথা। কিন্তু সরকার তাদের আসনে ঠিকই উন্নয়ন বরাদ্দ দিচ্ছে।’’
জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বিরোধী দলের মনে রাখা উচিত—সরকারি দলকে মানুষ ম্যান্ডেট দিয়ে ক্ষমতায় বসিয়েছে। সেখানে তারা অবশ্যই কিছু বাড়তি সুযোগ পেতে পারে। আবার জামায়াত যখন ক্ষমতায় যাবে, তাদের ক্ষেত্রেও এমনটি হতে পারে।’’
‘‘তারপরও বলবো, বর্তমান সরকার বিরোধী দলের প্রতি কোনও ধরনের বৈষম্য করছে না। তাদের সঠিক মূল্যায়ন করছেন প্রধানমন্ত্রী।’’ আর বিএনপির নারী এমপিদের ক্ষেত্রে নিয়মের কোনও ব্যত্যয় হচ্ছে না বলে জানান দুদু।