Image description

আওয়ামী লীগ সরকারকে টিকিয়ে রাখতে ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে ‘বিশেষ ভূমিকা’ রেখেছিলেন জনপ্রশাসনের কিছু প্রভাবশালী আমলা। যারা ’২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানবিরোধী কর্মকাণ্ডেও জড়িত ছিলেন। এর মধ্যে ৬৪ জেলার জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও রিটার্নিং কর্মকর্তা অন্যতম। এমন ‘বিতর্কিত’ সাবেক ৩০ ডিসিসহ ৩৬ জনের তালিকা চূড়ান্ত করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। তাদের চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ায় বিধান অনুযায়ী শিগগির বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হচ্ছে। বিসিএস ২০তম ব্যাচের এসব কর্মকর্তা বর্তমানে ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা)। সরকারের নীতিনির্ধারণী সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।

সূত্র আরও জানিয়েছে, শেখ হাসিনার ২০১৮ ও ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন— এমন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মকর্তাদের একটি প্রাথমিক তািলকাও করা হয়েছে। সেখানে স্থান পেয়েছে বিসিএস ২১, ২২, ২৪, ২৫ ও ২৭তম ব্যাচের ডিসি, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের পিএস (একান্ত সচিব) এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে যারা ছিলেন। তবে তাদের চাকরির বয়স এখনো ২৫ বছর পূর্ণ হয়নি।

সরকারের এমন সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত দিয়েছেন স্বয়ং জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আবদুল বারী। ৭ জুলাই জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি বলেছেন, ‘বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারকে দীর্ঘস্থায়ী করতে প্রশাসনের যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রকাশ্যে কাজ করেছেন, তাদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এরই মধ্যে সরকারের বিভিন্ন তদন্ত সংস্থা তাদের খুঁজে বের করতে কাজ শুরু করেছে।’

এর আগে গত ৫ জুলাই ২০১৮ সালের নির্বাচনে পুলিশ সুপারের (এসপি)দায়িত্বে থাকা ৩৩ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। বিসিএস ২০তম ব্যাচের এসব কর্মকর্তার চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছিল। এ ছাড়া ২০১৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করা ২২ ডিসিকে বাধ্যতামূলক অবসর দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। এর এক দিন পরই নিজের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে তৎকালীন স্থানীয় সরকার এবং যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া লিখেছিলেন— ‘২০১৮ সালের রাতের ভোটের নির্বাচনে ৬৪ জেলার দায়িত্বে থাকা ডিসি-এসপিদেরও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হবে।’

অবসরে যাদের পাঠানো হতে পারে: যাদের শিগগির বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হতে পারে তারা হলেন— সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একান্ত সচিব (পিএস-১) মনিরা বেগম ও পিএস-২ আল মামুন মোর্শেদ। এ ছাড়া ওই সময় যারা ডিসি ছিলেন— চাঁদপুরের মো. মাজেদুর রহমান খান, পটুয়াখালীর মো. মতিউল ইসলাম চৌধুরী, কুড়িগ্রামের মোছা. সুলতানা পারভীন, কিশোরগঞ্জের মো. সারওয়ার মোর্শেদ চৌধুরী, খাগড়াছড়ির মো. শহীদুল ইসলাম, খুলনার মো. হেলাল হোসেন, বান্দরবানের মোহাম্মদ দাউদুল ইসলাম, বরিশালের এস এম অজিয়র রহমান, চুয়াডাঙ্গার গোপাল চন্দ্র দাশ, শরীয়তপুরের কাজী আবু তাহের, রাজশাহীর এস এম আব্দুল কাদের, কুমিল্লার আবুল ফজল মীর, শেরপুরের আনারকলি মাহবুব, নরসিংদীর সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন, ময়মনসিংহের মো. মিজানুর রহমান, নেত্রকোনার মঈন উল ইসলাম, সুনামগঞ্জের মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ, হবিগঞ্জের মাহমুদুল কবির মুরাদ, রাঙামাটির এ কে এম মামুনুর রশিদ, ফেনীর ওয়াহেদুজ্জামান, কক্সবাজারের মো. কামাল হোসেন, ঝিনাইদহের সরোজ কুমার নাথ, ভোলার মোহাম্মদ মাসুদ আলম ছিদ্দিক, নীলফামারীর নাজিয়া শিরিন, কুষ্টিয়ার মো. আসলাম হোসেন, নাটোরের শাহ রিয়াজ, পাবনার মো. জসিম উদ্দিন, মানিকগঞ্জের এস এম ফেরদৌস, লক্ষ্মীপুরের অঞ্জন চন্দ্র পাল এবং চট্টগ্রামের মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন।

তালিকায় আরও রয়েছেন সাবেক স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের পিএস ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ হোসেন, তৎকালীন বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্ম সচিব নিরোধ চন্দ্র মণ্ডল, রাজউকের পরিচালক মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম ও এস এম শাহ হাবিবুর রহমান হাকিম।

এদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র অবসর-সংক্রান্ত বিধানের বিষয়ে বলছে, ২০তম ব্যাচের কর্মকর্তারা ২০০১ সালের ৩১ মে চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। সেই হিসাবে গত ৩০ মে তাদের প্রত্যেকের চাকরির মেয়াদ ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। সরকার চাইলে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই সরকারি চাকরি আইনের ৪৫ ধারার ক্ষমতাবলে তাদের অবসরে পাঠাতে পারে। ওই ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো সরকারি কর্মচারীর চাকরির মেয়াদ ২৫ (পঁচিশ) বৎসর পূর্ণ হইবার পর যেকোনো সময় সরকার, জনস্বার্থে, প্রয়োজনীয় মনে করিলে কোনোরূপ কারণ না দর্শাইয়া তাহাকে চাকরি হইতে অবসর প্রদান করিতে পারিবে: তবে শর্ত থাকে যে, যেক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ, সেই ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন গ্রহণ করিতে হইবে।’