Image description

Md. Belayet Hossain (মো. বেলায়েত হোসেন)


 
১৮ জুলাই ২০২৪। প্রথমবারের মতো মৃত্যুকূপে ঢুকে পড়ি আমি। এখন টিভির অফিস থেকে যাত্রাবাড়ী এলাকা খুব বেশি দূরে নয়। সকাল ৮টায় বেরিয়ে সাড়ে ৮টার মধ্যে কাজলা টোল প্লাজা, শনির আখড়া, রায়েরবাগ পেরিয়ে পৌঁছে যাই মাতুয়াইল। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এতো গভীরে প্রবেশ করা মোটেও উচিত হয়নি, এটা ঘণ্টা দুইয়েক পর বুজতে পারি। সাধারণত যাত্রাবাড়ীর আন্দোলন কাভার করতে গিয়ে সাংবাদিকরা কাজলা টোল প্লাজা অতিক্রম করতে পারেনি। সেখানে মাতুয়াইল!! ও আল্লাহ! মনে পড়লে এখনো পুরো শরীর ছমছম করে উঠে।
সকাল তখন প্রায় ৯টা। দেশজুড়ে কমপ্লিট শাটডাউন। আগের রাতে যাত্রাবাড়ী শনির আখড়া এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। আগুন দেয়া হয় কাজলা টোল প্লাজায়। সকাল সাড়ে ৯টার মধ্যে আমি একটা অ্যাজলাইভ রেকর্ড করে ফেলি। তখনো আন্দোলনকারীরা জড়ো হয়নি। তবে ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কে যান চলাচল পুরপুরি স্থবির। অর্থনীতির লাইফ লাইন আটকে গেলো। পায়ে হেঁটে দূর দুরান্ত থেকে মানুষ অফিস যাচ্ছে। কিন্তু কারো মুখে কোনো ক্লান্তি নেই। যার সামনেই মাইক্রোফোন ধরি, বেশিরভাগ মানুষই সেদিন বলেছিলেন- "আমাদের কষ্ট হয় হোক, তবু শিক্ষার্থীদের দাবি আদায় হোক"।
যাত্রাবাড়ীর আন্দোলনে একটা জিনিস আমি সেদিন আমি লক্ষ্য করি। এই আন্দোলনটা শিক্ষার্থীদের। কিন্তু ছিন্নমূল শিশুরাও মাঠে নেমে গেছে। ট্রাকের ড্রাইভার আড়াআড়ি করে ট্রাক ফেলে চলে গেছে। এদের ভূমিকা কখনো আলোচনায় আসেনি।
মাতুয়াইলে একটা অ্যাজলাইভ কাজ শেষ করে আমি যখন যাত্রাবাড়ীর দিকে আবার ফিরছি, তখনই শুরু বিপত্তি। বলে রাখি, লাইভ এবং এজালাইভের মধ্যে একটা সূক্ষ্ণ পার্থক্য আছে। লাইভ হলো- সরাসরি সম্প্রচার। আর এজলাইভ হলো- লাইভের মতোই, কিন্তু কিছুক্ষণ আগের রেকর্ড করা ক্লিপ প্রচার হয় পরে।
আমাদের অ্যাজলাইভ দিতে হয়েছে এজন্য যে, মোবাইলের ডাটা অফ করে দিয়েছে সরকার। সেদিন পর্যন্ত শুধু ব্রডব্যান্ড চালু ছিল। যেহেতু লাইভ দিতে মোবাইল ডাটার প্রয়োজন হয়, তাই আমরা অ্যাজলাইভ রেকর্ড করে ড্রাইভারকে দিয়ে অফিসে মেমোরি কার্ডটা পাঠিয়ে দিতাম। মূলত যাত্রাবাড়ীর আন্দোলনটা শেষ পর্যন্ত এভাবেই কাভার করতে হয়েছে।
সকাল ১০টা বাজতে বাজতে বা তার কিছুক্ষণ পরে রাস্তায় জড়ো হতে শুরু করে স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা। আমরা মোটে কাজলা টোল প্লাজা পর্যন্ত আসতে পেরেছি। এরমধ্যেই আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্য করে গুলি ছোঁড়া শুরু করে পুলিশ। সবচেয়ে অনিরাপদ দূরত্বে আমি আর আমার চিত্র সাংবাদিক মুন। প্রথমবারের মতো মৃত্যুকে এতোটা কাছে থেকে দেখা। মনে হচ্ছিল- যেকোনো সময় একটা বুলেট এসে বুকে বিঁধে যাবে। পুরো দুইপক্ষের মাঝ বরাবর আমরা। এরমধ্যে আন্দোলকারী এবং পুলিশ, দু'পক্ষই অনেকটা মুখোমুখি চলে এসেছে। এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে আমি আরেকটা অ্যাজলাইভ রেকর্ড করে ফেলি। সেই অ্যাজলাইভ ছিল জীবন মৃত্যুর মাঝের একটি সুতা মাত্র। অ্যাজলাইভ শেষ করে এবার জীবন বাঁচানোর তাগিদ। একটা ভবনের গেইট খোলা পেয়ে ঢুকে পড়লাম আমি আর মুন। ভবনটি ছিল আবাসিক।
যতগুলো ফ্ল্যাটে নক করেছি, কেউ আমাদেরকে দড়জা খুলে দেয়নি। অনেক অনুনয় বিনয় করেছি। তাদের কথা ছিল- ভাই, আপনাদেরকে ঢুকতে দিয়ে আমরা নিজেদের মৃত্যু ডেকে আনতে পারি না। ছাদের দড়জাও বন্ধ। নিচের গেইটও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এখান থেকে বের হবার আর কোনো উপায় নেই। এদিকে অফিসে ফুটেজও পাঠাতে পারছি না। যেহেতু মোবাইল ডাটা বন্ধ। ড্রাইভারের কাছাকাছি যাওয়ারও আর সুযোগ নেই। অনেক রিকুয়েষ্ট করে দড়জার বাইর থেকে এক বাসার ওয়াফাই পাসওয়ার্ড নিয়ে ক্যামেরার সাথে কানেক্টে করে ফুটেজ পাঠাতে শুরু করলাম অফিসে। সিঁড়ির করিডোরের জানালার ছোটো ছোটো খোপগুলোতে যতটা সম্ভব পেরেছে ফুটেজ নিয়েছে আমার চিত্র সাংবাদিক মুন। এভাবে প্রায় ঘণ্টা তিনেক কেটে যায়।
গুলি করতে করতে পুলিশ আন্দোলকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। পুরো এলাকা যুদ্ধবিধ্বস্ত ধ্বংস্তুপের মতো পরিনত হয়। যেনো এক টুকরো গাজা, সিরিয়া। এই মৃত্যুকূপে দাঁড়িয়ে যতটা সম্ভব হয়েছে, মানুষকে সত্য জানানোর চেষ্টা করেছি। যদিও যতটুকু রেকর্ড করে পাঠাতাম, অনএয়ার হওয়ার পর দেখতাম- মূল কথাগুলোই কাটছাট করে প্রচার করা হয়েছে।
যাইহোক, পরিস্থিতি যখন কিছুটা শান্ত হয় গেট খুলে দিলে আমি আর মুন বের হয়ে যাই। রাস্তায় আমাদের অন্য স্টেশনের সহকর্মীদের সাথে দেখা হওয়ার পর কিছুটা দম আসে বুকে। রক্তাক্ত রাজপথে দাঁড়িয়ে মুনকে বললাম, চলেন দুই ভাই একটা ছবি তুলি। স্মৃতি থেকে যাক।
অফিস ফেরার পর পুরো পরিস্থিতি নিউজরুমে বর্ননা করি। আওয়ামী পন্থী এক নিউজ এডিটর বিড়বিড় করে বলতে লাগলো, এগুলো জঙ্গী। আমি তার থেকে মুখটা ফিরিয়ে নিলাম। সেই নিউজ এডিটর, যিনি পরবর্তীতে আমাদের চাকরি যাওয়ার মহান দায়িত্বের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছিলেন। জুলাইয়ের পর তার পদোন্নতি হয়। আর আমরা অফিস থেকে বিতাড়িত।
আজ
১৮ জুলাই ২০২৬