Image description

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহতদের বিচার নিশ্চিত করতে শুধু রায় ঘোষণা নয়, বরং সেই রায়ের দ্রুত কার্যকর বাস্তবায়ন দেখতে চায় দেশের মানুষ বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, জুলাইয়ের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায় হলেও তা এখনো কার্যকর হয়নি। তাই আপিল প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করে বিচার বাস্তবায়ন করতে হবে।

আজ বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) দুপুর দুইটার দিকে জুলাই শহীদ দিবস উপলক্ষে আবু সাঈদের কবর জিয়ারত শেষে রংপুরের পীরগঞ্জের বাবনপুর গ্রামে আবু সাঈদের বাড়িতে এসব কথা বলেন তিনি।

এ সময় নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরে আমাদের দাবি ছিল তিনটি—বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন। নির্বাচন হয়েছে, কিন্তু বিচার ও সংস্কারের সুফল দেশের মানুষ এখনো পায়নি। বিচারে আমরা আবু সাঈদের মামলার রায় পেয়েছি, কিন্তু সেই রায় এখনো কার্যকর হয়নি। উপরন্তু সেই মামলার রায় নিয়ে আপিল করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী সেই আপিল সুপ্রিম কোর্টে ৬০ দিনের মধ্যে শুনানি হওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও আমরা এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি দেখতে পাইনি।’

শেখ হাসিনাকে দেশে এনে ফাঁসি কার্যকর করতে হবে জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমরা শুধু রায় দেখতে চাই না। রায় অনেক হয়েছে, জনগণ রায়ের কার্যকর বাস্তবায়ন দেখতে চায়। আবু সাঈদের মামলার আসামি কিন্তু শেখ হাসিনা নিজেও এবং সেই রায়ে শেখ হাসিনাকে ফাঁসির দণ্ড দেওয়া হয়েছে। আমরা আশা করব, সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে শেখ হাসিনাকে দেশে এনে ফাঁসির রায় কার্যকর করবে। এ ছাড়া অন্যান্য যেসব মামলার রায় রয়েছে, সেগুলোও দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেওয়ার ব্যবস্থা করে তা কার্যকর করা হোক। তাহলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে যারা ভুক্তভোগী ও শহীদ পরিবার রয়েছে, তারা ন্যায়বিচার পাবে।’

গণভোটের রায়ের সঙ্গে সরকার বিশ্বাসঘাতকতা করেছে উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের এই বিপ্লবের সুফল সবার কাছে পৌঁছে দিতে হলে রাষ্ট্র সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। এই কারণে দেশে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আবু সাঈদদের আত্মত্যাগ যেন বৃথা না যায় এবং সেই বিপ্লবের সুফল যেন বাংলাদেশের সব মানুষ পায়, সে জন্যই এই গণভোটের আয়োজন করা হয়েছিল। আমরা দেখেছি, গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষ "হ্যাঁ" ভোটের পক্ষে রায় দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার সেই রায়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা ও প্রতারণা করেছে এবং সেই রায় তারা কার্যকর করছে না।’

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের নামে সরকার কেবল মৌখিক প্রতারণা করছে জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘জুলাই সনদ তারা মুখে মুখে বাস্তবায়ন করবে বলছে, এটি কেবলই তাদের মৌখিক প্রতারণা। তারা ৩১ দফার সঙ্গেও প্রতারণা করেছে। তারা বলেছিল, সংবিধান সংস্কার কমিশন করবে, কিন্তু সেটি তারা করেনি। ফলে আমরা আশা করব, এই ১৬ জুলাই শুধু জুলাই শহীদ দিবস পালন করলেই হবে না, আবু সাঈদকে শুধু মুখে মুখে স্মরণ করলেই চলবে না। গণভোটের যে গণরায়, সেই গণরায়ের আলোকে রাষ্ট্র সংস্কার করতে হবে। এ দেশের দুর্নীতি ও বৈষম্য দূর করে আমাদের নতুন বাংলাদেশ গঠন করতে হবে। জুলাই শহীদ দিবসে আমাদের এটাই প্রত্যাশা।’

সরকারি দল ও বিরোধী দল মিলে জুলাই সনদকে অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবে—মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খানের এমন মন্তব্যের বিষয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘সংস্কার, বিচার, ফ্যাসিবাদের বিলুপ্তি এবং বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি—ইত্যাদি প্রশ্নে আমরা সরকারকে বিরোধী হিসেবে দেখি না। কিন্তু আমরা সেরকম কোনো আলামত সরকারের কোনো আচরণে দেখতে পাচ্ছি না। ফলে জুলাই সনদ গণভোটের রায়ের আলোকে বাস্তবায়ন করতে হবে। কোনো নোট অফ ডিসেন্টের আলোকে বাস্তবায়ন করলে সেখানে আমাদের কোনো সহযোগিতা থাকবে না।’

এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন এনসিপির সদস্যসচিব ও রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন, মুখ্য সমন্বয়ক (দক্ষিণাঞ্চল) নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, সার্জিস আলম (উত্তরাঞ্চলীয় মুখ্য সমন্বয়ক), রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আতিকুর রহমান মোজাহিদ এমপিসহ স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতাকর্মীরা।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের দ্বিতীয় শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে আজ বৃহস্পতিবার ভোর থেকেই রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার বাবনপুর গ্রামে তার কবর জিয়ারত ও শ্রদ্ধা নিবেদনে ভিড় করেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান এবং তার আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া-মোনাজাতে অংশ নেন।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হন।