Image description

দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রেখেছিল দুই বছর আগে নিষিদ্ধ হওয়া বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। আবাসিক হলের নিয়ন্ত্রণ, ছাত্ররাজনীতি, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড এবং প্রশাসনিক প্রভাব—সব মিলিয়ে সংগঠনটি ক্যাম্পাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী ছাত্রসংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। তবে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় সেই আধিপত্য মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে ভেঙে পড়ে।

৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের প্রায় ২০ দিন আগেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কার্যত ছাত্রলীগশূন্য হয়ে যায়। আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী, সমন্বয়ক ও তৎকালীন ছাত্রনেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি কোনো পূর্বপরিকল্পিত অভিযান ছিল না; বরং দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, কর্তৃত্ববাদী রাজনীতি, হলভিত্তিক দমন-পীড়ন এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিক্রিয়ায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছাত্রলীগের পতন ঘটে।

সংঘর্ষ থেকে মোড় ঘোরার শুরু

২০২৪ সালের ১৫ জুলাই দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কোটা সংস্কার আন্দোলনের অংশ হিসেবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা রাজু ভাস্কর্যে সমাবেশ করেন। সমাবেশ শেষে একদল শিক্ষার্থী আবাসিক হল এলাকায় অবস্থানরত আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগ দিতে হলপাড়ার দিকে গেলে তৎকালীন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা তাদের বাধা দেন। সেখান থেকেই শুরু হয় সংঘর্ষ।

সেদিন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন ডাকসুর সাবেক এজিএস প্রার্থী ও ছাত্রদল নেতা তানভীর আল হাদি মায়েদ। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমাদের মূল কর্মসূচি ছিল রাজু ভাস্কর্যে। কিন্তু হলে থাকা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের আনতে আমরা হলপাড়ায় গেলে ছাত্রলীগ বাধা দেয়। এরপরই সংঘর্ষ শুরু হয়।’

একই দিন আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আন্দোলন মোকাবিলায় ছাত্রলীগই যথেষ্ট।’

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এই বক্তব্যের পরপরই ছাত্রলীগ বহিরাগতদের নিয়ে হেলমেট, লাঠি, রড, হকিস্টিক ও দেশীয় অস্ত্রসহ আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর তিনদিক থেকে হামলা চালায়।

শতাধিক গণমাধ্যমকর্মীর সামনেই নারী শিক্ষার্থীসহ অসংখ্য আন্দোলনকারী আহত হন। হামলার ভিডিও ও ছবি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সারাদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।

শতাধিক শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে সেখানেও হামলা করে অভ্যুত্থানের পর নিষিদ্ধ হওয়া এই সংগঠন।

আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডে বিস্ফোরিত হয় ক্ষোভ

১৬ জুলাই আন্দোলন নতুন মোড় নেয়। সেদিন বিকেলে রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পুলিশের গুলিতে নিহত হন আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আবু সাঈদ।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লেও আবু সাঈদ দুই হাত প্রসারিত করে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকেন। সে সময় খুব কাছ থেকে পুলিশ তাঁর ওপর গুলি চালায়। আবু সাঈদের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ভিডিও মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

এই হত্যাকাণ্ড আন্দোলনকে শুধু কোটা সংস্কারের দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি; তা সরকারবিরোধী গণআন্দোলনের রূপ নিতে শুরু করে।

একই দিন ঢাকা কলেজ ও সায়েন্সল্যাব এলাকায় আন্দোলনকারী ও ছাত্রলীগের সংঘর্ষে দুজন নিহত হওয়ার ঘটনাও পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।

হলগুলোতে শুরু হয় ছাত্রলীগবিরোধী প্রতিরোধ

১৬ জুলাই রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভ বিস্ফোরিত হতে শুরু করে।

প্রথমে রোকেয়া হল থেকে তিনজন ছাত্রলীগ নেত্রীকে বের করে দেন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। এরপর একে একে বিভিন্ন হলে বিক্ষোভ শুরু হয়। সেসময় সবচেয়ে শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল সার্জেন্ট জহুরুল হক হল, যেটিকে অনেকেই ছাত্রলীগের ‘ক্যান্টনমেন্ট’ বলতেন।

ছাত্রলীগ বহিরাগতদের নিয়ে হেলমেট, লাঠি, রড, হকিস্টিক ও দেশীয় অস্ত্রসহ আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর তিনদিক থেকে হামলা চালায়। ছবি: মিডিয়াম থেকে নেওয়াছাত্রলীগ বহিরাগতদের নিয়ে হেলমেট, লাঠি, রড, হকিস্টিক ও দেশীয় অস্ত্রসহ আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর তিনদিক থেকে হামলা চালায়। ছবি: মিডিয়াম থেকে নেওয়া

রাত প্রায় ১টার দিকে হল ফটকে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ছাত্রলীগের নেতারাই এটি ঘটিয়েছিল। এরপর উত্তেজিত শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগের রাজনৈতিক কক্ষগুলোতে হামলা চালিয়ে বিভিন্ন সামগ্রী বের করে দেন। সেসময়ে অধিকাংশ ছাত্রলীগ নেতা ঘটনা আঁচ করতে পেরে রাতে হলে ফেরেননি।

সেদিন হলে আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন শিক্ষার্থী মহিউদ্দিন রনি। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমরা হলের ফটকে অবস্থান নিয়ে প্রভোস্টকে অবরুদ্ধ করি। ককটেল বিস্ফোরণসহ আমাদের বোনদের ওপর নির্মম হামলার বিচার এবং হলে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি জানাই। রাতভর শিক্ষার্থীদের চাপের মুখে প্রভোস্ট সেই দাবি মেনে নেন।’

এক রাতেই ভেঙে পড়ে সাংগঠনিক কাঠামো

জহুরুল হক হল, রোকেয়া হল ও বিজয় একাত্তর হলের ঘটনাগুলো দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। রাতের মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ বিভিন্ন হলের প্রায় সব শীর্ষ নেতার কক্ষ ভাঙচুর করা হয়।

সেই রাতেই বিজয় একাত্তর হল, এফ রহমান হল, জগন্নাথ হল, সূর্যসেন হল, শহীদুল্লাহ হল, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, জিয়া হলসহ একের পর এক হলে শিক্ষার্থীরা জড়ো হয়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হল ছাড়ার দাবি জানান। রাতভর উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে অনেক নেতা-কর্মী হল ত্যাগ করেন। ১৭ জুলাই সকাল নাগাদ অধিকাংশ আবাসিক হলেই ছাত্রলীগের দৃশ্যমান সাংগঠনিক উপস্থিতি কার্যত ভেঙে পড়ে।

একই দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি মাজহারুল কবির শয়ন এবং পরদিন সকালে সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকতও ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন। তাদের কক্ষেও ভাঙচুর চালানো হয়। সূর্যসেন হলের একটি কক্ষ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের ঘটনাও দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়।

‘কোনো মাস্টারপ্ল্যান ছিল না’

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল কাদেরের মতে, ছাত্রলীগকে বিতাড়নের বিষয়টি কোনো সংগঠিত পরিকল্পনার অংশ ছিল না। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তখন ভীত অবস্থায় ছিল। অনেকেই হলের বাইরে অবস্থান করছিল। রাত ১১টার দিকে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের একটি ফেসবুক পোস্ট ঘিরে আলোচনা আরও ছড়িয়ে পড়ে। জহুরুল হক হল, রোকেয়া হল ও একাত্তর হলে ছাত্রলীগবিরোধী ক্ষোভ দাবানলের মতো ছড়িয়ে যায়। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণেই ছাত্রলীগ ক্যাম্পাস ছাড়তে বাধ্য হয়।’

তিনি আরও জানান, পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ায় বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও মূল শক্তি ছিল সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ।

শুধু আন্দোলনের ফল নয়, দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বিস্ফোরণ

ডাকসুর সাবেক জিএস প্রার্থী ও ছাত্রদল নেতা তানভীর বারী হামিম স্ট্রিমকে বলেন, ‘ছাত্রলীগ নারী শিক্ষার্থীদের ওপর বহিরাগতদের দিয়ে হামলা চালিয়ে জনরোষ তৈরি করে। অনেক জায়গায় তারা পরিস্থিতি বুঝে নিজেরাই পালিয়ে যায়, আবার কোথাও শিক্ষার্থীরা বের করে দেয়। এখানে কোনো মাস্টারপ্ল্যান ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ।’

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী এবং এনসিপি নেতা মহিউদ্দিন রনির ভাষায়, ‘গণরুম, গেস্টরুম, শিক্ষার্থীদের হেনস্তা, খুন, ধর্ষণসহ নানা অভিযোগে ছাত্রলীগ দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। আবু সাঈদের হত্যাকাণ্ড সেই ক্ষোভকে বিস্ফোরিত করে। তখন শিক্ষার্থীরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল—এই ফ্যাসিস্ট দানবকে আর ক্যাম্পাসে রাখা যাবে না।’

কোটা আন্দোলন থেকে গণঅভ্যুত্থান

কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনের গণ্ডি প্রথমে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে সরকার প্রধানসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের কটূক্তি, উসকানি ক্রমাগ্রত শিক্ষার্থীদের বিক্ষুব্ধ করে তোলে। এমনকি ছাত্রলীগের পদে থাকা অসংখ্য নেতা-কর্মী পদত্যাগ করে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কাতারে দাঁড়িয়ে যায়। পরবর্তীকালে আন্দোলনকারীদের ওপর নজিরবিহীন হামলা, পুলিশি নির্যাতন এবং আওয়ামী সরকারের নিজের পদক্ষেপই তার কবর রচনার প্রেক্ষাপট রচনা করে।

তৎকালীন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল কাদের স্ট্রিমকে জানান, ১৪ জুলাই পর্যন্ত আন্দোলন মূলত কোটা সংস্কারের দাবিতেই সীমাবদ্ধ ছিল। তিনি বলেন, ‘হাসিনার কটূক্তি আন্দোলনের গতিপথ পাল্টে দেয়। এরপর নারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা পুরো দেশের মানুষকে ক্ষুব্ধ করে। শিক্ষার্থীরা গুলি খেয়েও রাজপথ ছাড়েনি। সেই দৃঢ়তার কারণেই জনগণ আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছিল।’

ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে এক টার্নিং পয়েন্ট

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ঘটনাপ্রবাহের পুরোটা সময় প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করেছিলেন বর্তমান উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ও তরুণ রাজনৈতিক বিশ্লেষক আনিসুর রহমান। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের আধিপত্যের পতনকে শুধু একটি ছাত্রসংগঠনের সাংগঠনিক পরাজয় হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা যাবে না। এটি ছিল দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অসন্তোষ, ক্যাম্পাসে ক্ষমতার একচেটিয়া ব্যবহার এবং আন্দোলন দমনের কৌশলের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত প্রতিক্রিয়া। ১৫ ও ১৬ জুলাইয়ের ঘটনাগুলো সেই ক্ষোভের বিস্ফোরণের অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সব সময় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূতিকাগার। তাই এই ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়া জাতীয় রাজনীতিতেও প্রতীকী ও বাস্তব—দুই ধরনের প্রভাব ফেলেছে। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষমতাকেন্দ্রিক ছাত্ররাজনীতির একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে এবং পরবর্তী গণঅভ্যুত্থানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি হয়।’