বড় অঙ্কের ব্যয় কমছে বগুড়া-সিরাজগঞ্জ নতুন রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পে। পরিকল্পনা কমিশনের ব্যাপক আপত্তির মুখে পরামর্শকসহ কয়েকটি খাতে কমতে যাচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এটি করতে গিয়ে এক দিনে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা শেষ করতে লেগেছে দুদিন। অবশেষে একমত হতে বাধ্য হয়েছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা।
শিগগিরই ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) সংশোধন করতে ফেরত দেওয়া হচ্ছে রেলপথ মন্ত্রণালয়ে। পিইসি সভার আগে ৮ জুলাই আগামীর সময়ের অনলাইন ভার্সনে এবং পরদিন ৯ জুলাই প্রিন্ট ভার্সনে ‘পরামর্শ নিতেই গুনতে হবে ২৩১ কোটি!’ শিরোনামে এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়।
পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের প্রধান (অতিরিক্ত সচিব) কবির আহামদ আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি প্রকৃত ব্যয় ধরার। এক্ষেত্রে যেসব খাতে অতিরিক্ত প্রস্তাব ছিল, তা কমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছি।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ৯ জুলাই ছিল রেলপথ মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ রেলওয়ের বাস্তবায়নাধীন ‘বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ’ প্রকল্পের পিইসি সভা। সেখানে ব্যয় নিয়ে সুরাহা না হওয়ায় স্থগিত করা হয় সভাটি। পরে ১২ জুলাই আবারও অনুষ্ঠিত সভায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সভায় যেসব খাতের ব্যয় বেশি ধরা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো পরামর্শক খাত। এতে ২৩১ কোটি টাকা ধরা হয়েছিল। ৭৬ পরামর্শকের মধ্যে বিদেশি পরামর্শক ধরা হয়েছিল ১৩ জন আর বাকি ৬৩ জন ছিলেন দেশীয় পরামর্শক। এসব পরামর্শকের শুধু বেতনই ধরা হয় ১০৬ কোটি টাকা।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী তাদের যাতায়াত, থাকা ও অন্যান্য ব্যয় হিসেবে ১২৫ কোটি টাকা। অনেক চেষ্টার পর এ খাতে দেশীয় পরামর্শকের সংখ্যা কমিয়ে প্রায় ২৫ কোটি টাকার মতো কমানো হচ্ছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক দরপত্রের ক্ষেত্রে প্রাইস অ্যাডজাস্টমেন্ট খাতে বরাদ্দ রাখতে হয়। যেমন প্রতি বছর মূল্যস্ফীতির সঙ্গে ব্যয় সমন্বয় করতে এ খাতের ব্যয় দরকার। এখানে কমছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া ভূমি অধিগ্রহণে রিসেটেলেমেন্ট খাতে প্রস্তাব ছিল প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। সেখান থেকে প্রায় ৪১৮ কোটি টাকা কমিয়ে ৮২ কোটি টাকা ধরার সুপারিশ দেওয়া হচ্ছে। ফিজিক্যাল কন্টিনজেন্সি খাতে ৫৫১ কোটি টাকার মধ্যে প্রায় ২২০ কোটি টাকা কমানো হচ্ছে। পাশাপাশি প্রাইস কন্টিনজেন্সি খাতে বড় অঙ্কের প্রস্তাব থাকলেও মোট প্রকল্প ব্যয়ের ১ শতাংশ রাখার সুপারিশ দেওয়া হচ্ছে।
সূত্র জানায়, নতুন একটি রেলপথ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয় বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত ৮৫ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার। এসংক্রান্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ৫৭৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিলের ২ হাজার ৪৩৩ কোটি ১০ লাখ এবং ইন্ডিয়া লাইন অব ক্রেডিট (এলওসি) ঋণ থেকে ৩ হাজার ১৪৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা পাওয়া গেছে। এরপর বিশেষ সংশোধনীর মাধ্যমে সরকারি অংশে ব্যয় বাড়িয়ে করা হয় ৫ হাজার ৯০২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।
এখন প্রথম সংশোধনীতে ভারতীয় ঋণ বাদ দিয়ে এআইআইবির ঋণে প্রকল্প ব্যয় ৬ হাজার ৬২১ কোটি ৫০ লাখ টাকা বাড়িয়ে করা হয়েছে ১২ হাজার ৫২৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিলের ৩ হাজার ৮১৩ কোটি ৭০ লাখ এবং এআইআইবির ঋণ ৮ হাজার ৭১০ কোটি ৬৭ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। এক্ষেত্রে ব্যয় বাড়বে ৫২ দশমিক ৮৭ শতাংশ। এই প্রস্তাবিত সংশোধিত ব্যয় থেকে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা কমিয়ে মোট ব্যয় প্রায় ১০ হাজার ৯০০ কোটি করার সুপারিশ দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে প্রকল্পের মূল মেয়াদ ছিল ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত। পরে দফায় দফায় তিন বছর বাড়িয়ে করা হয় ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত। এখন প্রথম সংশোধনীতে সাড়ে ৪ বছর বাড়িয়ে ২০৩০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হচ্ছে। এ বিষয়ে পিইসি সভায় তেমন আপত্তি দেওয়া হয়নি।