দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারের দাবি উঠেছে সংসদে। মানবতা বিরোধী অপরাধে আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালে অবিলম্বে দলটির বিচার কার্যকর করার সমস্ত ধরনের পদক্ষেপ সরকারের প্রতি দাবি তুলেছে বিরোধী দল। দাবি উঠেছে গণহত্যার দায়ে মৃত্যুদন্ডাদেশপ্রাপ্ত ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার কার্যকর করার। একই সাথে ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া ভারতের বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থার পরিষ্কার করার দাবি তুলেছে বিরোধী দল। এদিকে আলোচনায় সরকারি দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের সুযোগ পাবেন না। সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হবে।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে ৬৮ বিধির আলোচনায় এসব বিষয়ে উঠে আসে। ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও গণহত্যার বিচার’ প্রসঙ্গে জরুরি গণ-গুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে আলোচনার জন্য নোটিশটি দেন এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন।
আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, মার বন্ধু নাহিদ সাহেব যে বলেছেন আওয়ামী লীগের দল হিসেবে বিচার করতে হবে। কিন্তু আপনারা তো উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে সেই আইন পাশ করেননি। পরে আন্দোলন ও যমুনা ঘেরাও করে সেটা আদায় করতে হলো। আমি নিজে আজকে পার্লামেন্টে স্বীকার করছি। উদ্যোগী হয়ে দলের পক্ষ থেকে সেই আইন প্রণয়নের জন্য সহযোগিতা করে পাশ করেছি। সর্বপ্রথম আওয়ামী লীগের বিচার দাবি করছি আমরা। আমি সর্বপ্রথম দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার করার জন্য দাবি তুলেছিলাম।
বিরোধী দলের প্রতি উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, আপনারা বলেছেন গণভোটের গণরায়কে শ্রদ্ধা করা দরকার। গণভোটের গণরায়কে শ্রদ্ধা জানাতে হলে সংবিধান সংশোধন কমিটিতে আপনাদেরকে আসতে হবে। সেখানে আলোচনা করতে হবে। কিন্তু আপনারা ওয়াকআউট করলেন। সংবিধান সংশোধনী কমিটিতে থাকতে চাইলেন না। সেটা ইতিহাস হয়ে থাকলো। আমরা এ সংবিধান সংশোধন করতে চাই। সংবিধানের গণতান্ত্রিক সংস্কার করতে চাই। আমরা রাষ্ট্র কাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কার করতে চাই। ভবিষ্যতে যাতে এই দেশে কোনদিন ফ্যাসিবাদের উৎপত্তি না হয় সেজন্য সংবিধান সংশোধন করতে চাই।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই জাদুঘর স্মৃতি জাদুঘর ৫ আগস্ট জুলাই জুলাই শ্রুতি জাদুঘর খুলে দেয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী সেটা উদ্বোধন করবেন। কোন আহত জুলাই যুদ্ধার যদি বিদেশে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়ে থাকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাদের সে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তিনি বলেন, বর্ডার ইস্যু নিয়ে বিরোধী নেতা কথা বলেছেন বর্ডার ইস্যুতে। আমরা একজনও অবৈধভাবে পুশইন হতে দেই নি। আমরা সার্বভৌমত্বকে সর্বতোভাবে রক্ষা করার চেষ্টা করেছি। আমরা বলেছি যে কোন দেশের এমন কোন আচরণ আমরা বরদাস্ত করবো না যাতে আমাদের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হয়। স্বাধীনতা রক্ষায় আমরা সবাই এক। এখানে সরকারি দল বিরোধী দল বন্ধ কোন কথা নেই। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকবো। আমরা ফ্যাসিবাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যেভাবে ইস্পাত কঠিন জাতীয় ঐক্য আমরা গড়ে তুলেছি, সেই জাতীয় ঐক্য ন্যাশনাল ইস্যুতে সবসময় এক থাকবে বলে আমার বিশ্বাস করি। যা কিছু তর্ক-বিতর্ক করব সরকারি দল বিরোধী দল এই হাউজের মধ্যে করব কিন্তু আমরা কোন জাতীয় ইস্যুতে স্বাধীনতার সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন কখনোই ছাড় দেব না। আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকবো।
ভারতের সাথে সম্পর্ক ইস্যুতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশের সাথে সম্পর্ক কি হবে সেটা সরকারের একক কোন দায়িত্ব না। আমরা সংসদে সংবিধান সংশোধন করে পররাষ্ট্রনীতি সংশোধন করে এখানে ঠিক করতে পারি। প্রতিবেশীকে কখনো পাল্টানো যায় না। কথায় আছে যে আপনি আপনার স্ত্রী পাল্টাতে পারবেন। কিন্তু প্রতিবেশী তো আপনি পাল্টাতে পারবেন না। সুতরাং প্রতিবেশীর সাথে কি সম্পর্ক হবে? দ্বিপাক্ষিক কি সম্পর্ক হবে? বাণিজ্যের কি সম্পর্ক হবে? আমরা আগেই বলেছি সবার আগে বাংলাদেশ নীতিতেই আমরা আছি।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে নিয়ে এসে রায় কার্যকর করতে আমরা তাগাদাপত্র দিচ্ছি। আমরা হাদির হত্যাকারী তিনজনকে আমরা ফেরত চেয়েছি। আশা করি ফিরিয়ে নিয়ে আসতে পারব। আমাদের আন্তরিকতার কোন ঘাটতি নাই।
বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই ছিল ফলাফলের সময়। কিন্তু তার ক্ষেত্র তো সাড়ে ১৬ বছর। এই সময়ের ভিতরে যারা গুম, খুন, পঙ্গু হয়েছেন তাদের ভুলে যাওয়া উচিত হবে না। এটা নিজের আত্মার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল হবে।
জুলাই যোদ্ধাদের সুযোগ–সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জুলাই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচারের দাবি জানান বিরোধী দলীয় নেতা। তিনি বলেন, বিচারের ব্যাপারে কোন গড়িমসি জাতি সহ্য করবে না। এই ক্ষমা বহন করার শক্তি জাতির নাই। বিচার হতেই হবে, তবে বিচারটা যেন ন্যায় বিচার হয়।
তিনি বলেন, গণভোটে জনগণ হ্যা এর পক্ষে সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছিল। কি এখানে হয়ে গেল আমরা ঠিক বুঝতে পারি নাই। বারবার বলা হচ্ছে এখানে প্রতারণা করা হয়েছে। কে করলো
বিরোধী দলীয় নেতা অভিযোগ করেন, সবাই নয়, তবে বেশিরভাগ মিডিয়া স্বৈরাচারকে ভয়ঙ্কর স্বৈরাচার হতে সাহায্য করেছে। তাদের ব্যাপারে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে সেটা তিনি বুঝতে পারছেন না। তারা এখন আবার পানি ঘোলা করার জন্য ময়দানে নেমে পড়েছে। সরকার এসব বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে না। তিনি বলেন, কোন শক্তির বলে তারা এটা করে আমরা জানতে চাই সরকারের কাছে। তাদের ব্যাপারে দুর্বলতাটা কোথায়?’
শফিকুর রহমান বলেন, সীমান্তে সুড়সুড়ি দেওয়া হয়েছে। সরকার এখন পর্যন্ত এ ব্যাপারে কিছুই বলেনি। বিরোধী দল তাদের অবস্থান থেকে যতটুকু সম্ভব বলেছে। তিনি বলেন, ‘আমরা পরিষ্কার বলতে চাই এটা একটি স্বাধীন দেশ। এই দেশের প্রত্যেকটি বালুকনার আমরা পাহারাদারি করব।’
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৬টি তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। তার মধ্যে ১২টি তদন্ত রিপোর্ট জমা হয়েছে। ইতিমধ্যে চারটি চার্জ ফ্রেম হয়েছে। ইতিমধ্যে তিনটি মামলার রায় হয়েছে। ইতিমধ্যেই শাপলা চত্বরের সেই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের তদন্ত শুরু করা হয়েছে। সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের তদন্ত শুরু হয়েছে। জুলাই হত্যাকাণ্ডে জেলায় জেলায় তদন্ত কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, জুলাই চেতনায় বিশ্বাসীদের মধ্যে বিভেদের সুর দেখে দিল্লীতে বসে হুঙ্কার দেওয়া হচ্ছে। বিভেদের সুর দেখে দিল্লিতে বসে বলছে, আত্মসমর্পণ করবেন। যারা আত্মসমর্পণ করার হুংকার দিচ্ছেন, বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে তাদের আত্মসমর্পণের কোন সুযোগ থাকবে না। দণ্ডপ্রাপ্ত আসামী বাংলাদেশের সীমানায় ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তার হবেন। এটা সরকারের অঙ্গীকার।
আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার দাবি করে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, যেই দল ইতিহাসে দুই দুইবার সুযোগ পেয়ে এদেশে গণহত্যা করেছে, গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে এবং সকল প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেছে লুটপাট করেছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত তার বিচার করতে হবে।
এনসিপির আহবায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ এবং ভারতীয় মিডিয়ায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ডিফেমিং করে গিয়েছিল। আজ দুঃখ লাগে যখন জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আমাদের শরিক প্রধান স্টেকহোল্ডার সরকার দলীয় কিছু কিছু সদস্য গণঅভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে কথা বলছেন।
সরকার দলীয় এক এমপির টকশোতে দেওয়া বক্তব্যের প্রতি উদ্দেশ্য করে এনসিপির আহবায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা মারা গিয়েছেন এবং তাদের সাথে পুলিশি হত্যাকাণ্ডের তুলনা করা হয়। এই বয়ানটা আওয়ামী লীগের বয়ান।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউরকে সরিয়ে দেওয়ার কথা তুলে ধরে নাহিদ বলেন, নতুন করে কোন মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া বর্তমান প্রসিউশন এগুতে পারেননি। প্রসিকিউশন টিমে দক্ষ আইনজীবী নিয়োগ এবং ট্রাইব্যুনাল বাড়ানো নিয়ে সরকারের কি পরিকল্পনা তা তিনি জানতে চান।
জুলাই অভ্যুত্থানে হত্যা নির্যাতনের কথা তুলে ধরে আখতার হোসেন বলেন, জাতি সংঘের প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে আওয়ামী লীগ ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে মানবতা বিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেছে। আওয়ামী লীগ যতই অস্বীকার করার চেষ্টা করুক না কেন তারা এটা মিথ্যা প্রমাণিত করতে পারবে না। তিনি বলেন, এই সংসদেও এমন দুই একজন সরকারী সংসদ সদস্য আছেন যারা আওয়ামী লীগের বয়ানে বক্তব্য দেয়।
জুলাইতে যারা হত্যা করেছিল, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছিল তাদের শাস্তি এখনো কার্যকর হয়নি। এখনো পর্যন্ত শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে এসে বিচারের রায় কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। তিনি অবিলম্বে শেখ হাসিনাসহ মানবতা-বিরোধী অপরাধের সাথে যারা যুক্তদের দেশে ফিরিয়ে এনে শাস্তি কার্যকর করার দাবি জানান।
আখতার বলেন, দল হিসেবে আওয়ামী লীগের ব্যাপারে তদন্তের কোন কার্যকারিতা এখনো পর্যন্ত নেই। অবিলম্বে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার কার্যকর করার সমস্ত ধরনের পদক্ষেপ সরকারকে গ্রহণ করতে হবে।
গণ-অধিকার পরিষদের সংসদ সদস্য প্রবাসী-কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী বলেন, ওয়ান ইলেভেনের
বিতর্কিত সরকারের নীল নকশায়, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের একটি ষড়যন্ত্রে দেখা গিয়েছিল। বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে একটি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য কিভাবে বিতর্কিত একটি নির্বাচন করেছিল।
প্রধানমন্ত্রীসহ সকলের কাছে বিনীত অনুরোধ করে নূরুল হক বলেন, একটি রাজনৈতিক সমঝোতার মধ্যে দিয়ে ফ্যাসিবাদের বিচার নিষ্পত্তির প্রশ্নে ঐক্যমত্য হতে হবে। ভবিষ্যতে যেন কোন ফ্যাসিবাদী শক্তি ক্ষমতায় না আসতে পারে, গণ-বিরোধী অবস্থান নিয়ে গুন– খুন হত্যাযজ্ঞ না চালাতে পারে, তার জন্য রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার করতে হবে। তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগের প্রশ্নে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে, বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক কী হবে— এই বিষয়ে সরকারি দল এবং বিরোধী দলের একটি নীতিগত সমঝোতা রাষ্ট্রের স্বার্থে প্রয়োজন।
অন্যদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেম ও রোকেয়া বেগম আলোচনায় অংশ নেন।