উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন সাব্বির হোসেন (২৪)। কিন্তু জন্মনিবন্ধন নিয়ে পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে। জন্মের দিন কেন জন্মনিবন্ধন করা হয়নি? জন্মনিবন্ধন সার্টিফিকেট ইস্যুর তারিখ ভিন্ন হওয়ায় ঝামেলায় পড়েছেন। এখন সমস্যা সমাধানে রাজধানীর রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ে ঘুরছেন তিনি। সাব্বির বলেন, ‘আমার জন্মের দিন জন্মনিবন্ধন করা হয়নি। কেন দেরিতে করা হয়েছে এটা জানতে চেয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়। স্কলারশিপের জন্য জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র সবই লাগবে। দুই জায়গায় বাবার নামের বানান ভিন্ন। এজন্যও জটিলতা তৈরি হয়েছে। তাই সমস্যা সমাধানে এখানে এসেছি।’
সরেজমিন রাজধানীর সচিবালয়-সংলগ্ন রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় ঘুরে দেখা যায়, নামের বানান সংশোধনের পাশাপাশি অনেকেই এসেছেন বয়সের তারিখ সংশোধন করতে। কেউ কেউ সাল পরিবর্তন করে বয়স কমানোর জন্য ঘুরছেন বিভিন্ন দপ্তরে। জন্মের পর নিবন্ধন করতে দেরি করায় তৈরি হচ্ছে নানামুখী জটিলতা। হাসপাতালে জন্ম হলেও সেখানে নিবন্ধনের ব্যবস্থা নেই। জন্মনিবন্ধনের যাবতীয় কার্যক্রম চলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আওতায়। দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় না থাকায় জন্মনিবন্ধনে পিছিয়ে পড়ছে দেশ। শুধু তাই নয়, মৃত্যু নিবন্ধনেও গতি নেই। সমন্বয়হীনতার মারপ্যাঁচে সেবা নিতে গিয়ে বাড়ছে ভোগান্তি।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন আইন অনুযায়ী জন্ম বা মৃত্যুর ৪৫ দিনের মধ্যে নিবন্ধন করার আইন রয়েছে। এ ছাড়া জন্মসনদ ১৯টি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বেসরকারি সেবা নেওয়ার জন্য জরুরি। উত্তরাধিকার নিশ্চিত করতে মৃত্যু নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এ আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ফলে বাংলাদেশ জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনে এখনো কাক্সিক্ষত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। সরকারি লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বজনীন নিবন্ধন নিশ্চিত করা হলেও বাস্তবে দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ এখনো নিবন্ধন-ব্যবস্থার বাইরে রয়ে গেছে।
বিশেষ করে মৃত্যুনিবন্ধনের হার উদ্বেগজনকভাবে কম। ফলে সঠিক জনসংখ্যা, মৃত্যুর কারণ, স্বাস্থ্য পরিকল্পনা এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নে নানা জটিলতা তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে দেশে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের হার যথাক্রমে ৫০ ও ৪৭ শতাংশ, যা বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক গড়ের তুলনায় অনেক কম। মালদ্বীপ, ভুটান ও শ্রীলঙ্কায় জন্মনিবন্ধনের হার প্রায় শতভাগ। ভারতে ৮৯ দশমিক ১ শতাংশ, নেপালে ৭৭ শতাংশ এবং মিয়ানমারে ৮১ দশমিক ৩ শতাংশ। ভাইটাল স্ট্র্যাটেজিসের কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর মো. নজরুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘হাসপাতাল থেকেই জন্মনিবন্ধনের ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই নিবন্ধন নিশ্চিত করতে হবে।
স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে জন্মনিবন্ধন কার্যকরভাবে সমন্বয় করা গেলে শুধু নিবন্ধনের হারই বাড়বে না, শিশুস্বাস্থ্য পরিকল্পনা ও জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘জনসচেতনতার অভাব, নিবন্ধন কর্মকর্তাদের সীমিত সক্ষমতা, জনবল ও প্রযুক্তিগত সরঞ্জামের ঘাটতি, প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেবার সীমিত প্রাপ্যতা এবং স্বাস্থ্য খাতের সঙ্গে দুর্বল সমন্বয় পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। অনেক সময় সার্ভার সমস্যার কারণেও সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়েন। এ সমস্যা সমাধানে ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলায় একটি পাইলট প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
সেখানে স্বাস্থ্যকর্মী, গ্রামপুলিশ ও ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করে গ্রামীণ পর্যায়ে নিবন্ধন সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের প্রায় ৬৭ শতাংশ শিশুর জন্ম হাসপাতাল বা স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে হলেও জন্মনিবন্ধনের কোনো ব্যবস্থা স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে নেই। এ দায়িত্ব শুধুই পরিবারের ওপর বর্তায়! এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে নিবন্ধন বিলম্বিত হয় অথবা একেবারেই করা হয় না। হাসপাতাল থেকেই যদি জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়, তাহলে নিবন্ধনের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘শিশুর জন্মের এক সপ্তাহের মধ্যে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। যাতে জন্মনিবন্ধনের জটিলতায় কেউ সেবা থেকে বঞ্চিত না হয়।’