অতিভারী বর্ষণ, বন্যা ও পাহাড় ধসে গতকাল পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৪-এ দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া দেশের সাত জেলায় এখনো পানিবন্দি দেড় লাখের বেশি পরিবার। বন্যাকবলিত জেলাগুলোতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৯ হাজার ৪১১ জনে। গতকাল বিকালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বন্যাসংক্রান্ত হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ কথা জানানো হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলা বর্তমানে তীব্রভাবে বন্যা উপদ্রুত। সরকারি হিসাবে এসব জেলার মোট ৫৯টি উপজেলার ৩৩৪টি ইউনিয়ন ও ১২টি পৌরসভা বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। বন্যা ও ভূমিধসে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি এবং ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কক্সবাজারে। এ জেলায় এ পর্যন্ত ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ১৮ জন স্থানীয় বাসিন্দা এবং ১৩ জন রোহিঙ্গা। আহত হয়েছে ২৪ জন এবং একজন এখনো নিখোঁজ। অন্যান্য জেলার মধ্যে চট্টগ্রামে ১৩ জন, পার্বত্য জেলা বান্দরবানে ৬ জন, রাঙামাটিতে ৩ জন এবং মৌলভীবাজারে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
নীলফামারী : টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি ও উজানের ঢলে আবারও ফুঁসে উঠেছে তিস্তা নদীর পানি। এতে নীলফামারীর তিস্তা তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় নীলফামারীর ডিমলায় ডালিয়া পয়েন্টে পানির সমতল রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ১৮ সেন্টিমিটার (বিপৎসীমা ৫২ দশমিক ১৫ সেন্টিমিটার) যা বিপৎসীমার ৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। লালমনিরহাট : উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং টানা বৃষ্টির প্রভাবে তিস্তার পানি আবারও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিস্তার পানি বর্তমানে বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় লালমনিরহাটের নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে চরাঞ্চল ও তীরবর্তী এলাকার মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। যদিও নদীর মধ্যবর্তীতে বসবাস করা চরের প্রায় ৩ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ড।
বগুড়া : উজানের পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টির কারণে বগুড়ায় যমুনা নদীর পানি বাড়ছে। এ অবস্থায় সারিয়াকান্দি, ধুনট ও সোনাতলা উপজেলায় তীব্র নদীভাঙন শুরু হয়েছে। এতে শত শত একর ফসলি জমি, গাছপালা ও বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। নদীপারের মানুষ চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। বান্দরবান : দুই দিন বৃষ্টিপাত না হওয়ায় বান্দরবান জেলার নিম্নাঞ্চল ও সড়ক থেকে বন্যার পানি নেমে গেছে। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, পৌর এলাকার আর্মিপাড়া, ভরাখালী, ইসলামপুর, মেম্বারপাড়া, ক্যাচিংপাড়া, হাফেজঘোনা, বালাঘাটা ও কালাঘাটাসহ কয়েকটি নিম্নাঞ্চল থেকে পানি নেমে গেছে।
কক্সবাজার : কক্সবাজারের রামুর কাউয়ারখোপ ইউনিয়নে বাঁশের সাঁকো পার হতে গিয়ে নদীর পানির তীব্র স্রোতে ভেসে নিখোঁজ হওয়া মো. ইব্রাহীমের (১৮) মৃতদেহ ২৪ ঘণ্টা পর গতকাল দুপুরে উদ্ধার করা হয়েছে। সে কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের (৪ নম্বর) ওয়ার্ডের মৈষকুম এলাকার সৈয়দ হোসেনের ছেলে। গত রবিবার মৈষকুম এলাকায় একটি বাঁশের সাঁকো পার হচ্ছিল ইব্রাহীম। এ সময় পা পিছলে সে নিচে নদীর পানিতে পড়ে যায়। টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে নদীতে তীব্র স্রোতে ইব্রাহীম মুহূর্তের মধ্যেই তলিয়ে স্রোতের টানে ভেসে গিয়ে নিখোঁজ হয়।
ফেনী : টানা বর্ষণ ও উজানের ঢলে মুহুরী নদীর পানি হু হু করে বাড়ছে। উজানে ভারী বৃষ্টিপাত হলে দ্রুতই নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তারা। গতকাল বিকাল ৫টার দিকে মুহুরী নদীতে পানির স্তর রেকর্ড করা হয় ১১ দশমিক ৪৫ মিটার। এ সময় নদী বিপৎসীমার ১ দশমিক ১০ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
নেত্রকোনা : গেল কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে নেত্রকোনায় বাড়ছে নদনদীর পানি। জেলার প্রধান নদীগুলোর মধ্যে একটির পানি গত দুই দিন ধরে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সোমেশ^রীর শাখা নদী উপদাখালির কলমাকান্দা ডাকবাংলা পয়েন্টে ২৪ ঘণ্টায় বেড়ে বিপৎসীমার ৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া : টানা বর্ষণ ও ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। স্থলবন্দর এলাকার পাশ দিয়ে বয়ে চলা কালন্দি খাল ও জাজি নদী দিয়ে ভারতীয় পাহাড়ি ঢলের পানি হু হু করে বাংলাদেশে ঢুকছে। এতে উপজেলার সীমান্তঘেঁষা বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার শঙ্কায় আছেন বাসিন্দারা।
সাত বিভাগে বৃষ্টি হবে আরও পাঁচ দিন : দেশের ওপর মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় রাজধানী ঢাকাসহ সাত বিভাগে অতি ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। আরও পাঁচ দিন বৃষ্টি হতে পারে। এরপর বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। আগামী ২৪ ঘণ্টায় খুলনা ছাড়া বাকি সব বিভাগের বেশির ভাগ জায়গায় দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি এবং কোথাও অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে। দিনের তাপমাত্রা কিছুটা কমবে।
চট্টগ্রামে সাপের কামড়ে ৮৫ জন আহত : চট্টগ্রামে টানা বৃষ্টি ও বন্যা শুরুর পর থেকে বিভিন্ন উপজেলার হাসপাতালে সাপে কাটা ৮৫ রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এ ছাড়া বন্যাকবলিত এলাকায় বিভিন্নভাবে আহত হয়ে আরও ১৫ জন চিকিৎসা নিয়েছেন বলে জানিয়েছে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়।
চট্টগ্রামের জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম জানান, চারদিক পানিতে ডুবে থাকায় সাপগুলো তাদের বাসস্থান ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। তারাও পানিতে ভাসছে। একটু আশ্রয় খুঁজছে। এ কারণে সাপের উপদ্রব বেড়ে গেছে। এখন পর্যন্ত ৮৫ জন সাপে কাটা রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। ক্রমান্বয়ে এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। তবে কারও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।
তিনি আরও জানান, সব ধরনের আহতদের চিকিৎসায় বিশেষ টিম কাজ করছে। স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। কাউকে সাপের কামড় দিলে কোনো ধরনের ঝাড়ফুঁক না করে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।