আওয়ামী লীগ আমলের বিতর্কিত তিনটি নির্বাচনে জাতীয় পার্টির (জাপা) ভূমিকার সমালোচনা করে দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধের দাবি তুলেছিল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এ দাবিতে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দলটি। পাশাপাশি মিছিল-সমাবেশের মাধ্যমে দাবির পক্ষে মাঠেও সক্রিয় ছিল এনসিপি।
কিন্তু এক বছরের মাথায় দেখা গেল। বন্যায় ত্রাণ দিতে চট্টগ্রামে এসে সেই জাতীয় পার্টির এক প্রেসিডিয়াম সদস্যের বাড়িতেই উঠলেন এনসিপির শীর্ষ নেতা নাহিদ ইসলাম ও হাসনাত আবদুল্লাহ। একদল নেতাকর্মী নিয়ে খেলেন। রাতযাপনও করলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া এনসিপি নেতাদের ছবি নিয়ে এখন ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে।
জাতীয় পার্টির ওই প্রেসিডিয়াম সদস্য হলেন প্রবীণ রাজনীতিক মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বৈলছড়ি গ্রামের ‘মিয়া বাড়ির’ সন্তান। মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী জাতীয় পার্টির আমলে দুই দফা বাঁশখালীর সংসদ সদস্য ছিলেন। এ ছাড়া তিনি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রথম মেয়র। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের নেতা হিসেবে তিনি বেশ আলোচিত ছিলেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে আর দৃশ্যপটে নেই তিনি।
জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী বললেন, ‘মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী সাহেব আমাদের প্রেসিডিয়াম সদস্য। সিনিয়র মোস্ট লিডার। প্রাজ্ঞ রাজনীতিক। আমরা উনাকে খুবই সম্মান করি। কিন্তু অনেক দিন ধরে কোনো মিটিংয়ে আসছেন না। আশা করি আবার সক্রিয় হবেন।’
‘মিয়া বাড়িতে’ এনসিপি নেতাদের আদর-আপ্যায়ন নিয়ে মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী সমলোচনার তীরে বিদ্ধ হচ্ছেন। ব্যারিস্টার পাটোয়ারী বিষয়টি জানার পর বললেন, ‘আমরা দলের পক্ষ থেকে খোঁজখবর নেব।’
এনসিপি নেতাদের যাওয়ার বিষয়টি আগে থেকে জানতেন না বলে দাবি করলেন মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী। আগামীর সময়কে বললেন, ‘এটা তো আমার একার বাড়ি না। আমরা ছয় ভাইয়ের যৌথ বাড়ি। আমরা কেউ গ্রামের বাড়িতে থাকি না। যা-ই হোক, সেখানে যে এনসিপি নেতারা যাবেন আমাকে কেউ আগে থেকে বলেননি। যাওয়ার পর জেনেছি। আমার ছোট এক ভাই আমেরিকা থাকে। শুনেছি তার সঙ্গে এনসিপি নেতারা যোগাযোগ করে আমাদের বাড়িতে থাকার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। সে তাদের থাকার অনুমতি দেয়।’
‘আমার ভাই এনসিপি করে না। তার সঙ্গে এনসিপি নেতাদের কীভাবে যোগাযোগ হলো সেটা আমি জানি না। আমাদের ফ্যামিলিতেও কেউ এনসিপি করে না’ — যোগ করলেন মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী।
মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরীরা ছয় ভাই। এদের মধ্যে একজন রায়হানুল ইসলাম চৌধুরী আমেরিকায় থাকেন। এনসিপি নেতাদের ‘মিয়া বাড়িতে’ থাকা-খাওয়ার বিষয়টি দেখভাল করেন তাদের বড় ভাই অলিউল ইসলাম চৌধুরী শুক্কু মিয়ার ছেলে রহিমুল এহসান চৌধুরী মিঠু।
মিঠুর ভাষ্য, ‘উনারা (এনসিপি নেতা) এসেছিলেন। আমরা মেহমানদারি করেছি। উনাদের কে আসতে বলেছে এতকিছু আমি জানি না।’
বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে গতকাল রবিবার সকালে চট্টগ্রামে আসেন এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এবং দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। দিনভর আনোয়ারা ও বাঁশখালী উপজেলার বন্যাকবলিত বিভিন্ন গ্রামে ত্রাণ বিতরণ করে সন্ধ্যার পর তারা ‘মিয়া বাড়িতে’ যান।
নাহিদ-হাসনাতের সঙ্গে আরও অন্তত ১০ জন নেতা ছিলেন বলে জানালেন ‘মিয়া বাড়ি’র কেয়ারটেকার আমিন। বললেন, ‘উনারা সবাই রাতে ছিলেন। রাতে উনাদের জন্য সাদা ভাত, ডিম, সবজি, গরু ও মুরগির গোশত করা হয়েছিল। সকালে উঠে নাশতা করে চলে গেছেন।’
এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ মোহাম্মদ সুজাউদ্দিনও রাতে ‘মিয়া বাড়িতে’ ছিলেন। তিনি বললেন, ‘সেটা যে মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরীর বাড়ি আমরা জানতাম না। আমাদের লোকাল কয়েকজন সংগঠক তাদের রিলেটিভের বাড়ি বলে আমাদের নিয়ে গেছে। ওই বাড়ির একজন সদস্য প্রবাসে আছেন। উনার সঙ্গে যোগাযোগ করে তারা নিয়ে গেছে। আমরা জাস্ট রাতটা ছিলাম।’
চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির দপ্তর সম্পাদক রিদুয়ান হৃদয় কেন্দ্রীয় নেতাদের ‘মিয়া বাড়িতে’ পৌঁছে দিয়ে রাতে শহরে ফেরেন। তিনি বললেন, ‘জাতীয় পার্টি মানেই তাদের সব নেতাকর্মী খারাপ না। আওয়ামী লীগের সব নেতাকর্মীও খারাপ না। তেমনি এনসিপির সব নেতাও কি ভালো? বিএনপির সব নেতাকর্মী কি ভালো? এ ধরনের বিভাজনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসা উচিত।’