Image description

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে যান ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর থেকে তিনি দিল্লিতেই অবস্থান করছেন। তবে সম্প্রতি ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে চলতি বছরের ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন তিনি। এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশে ফিরলে তার ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া কী হবে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

গত ১০ জুলাই রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, দেশে ফিরলে তাকে গ্রেফতার করা হতে পারে, এমনকি হত্যারও শিকার হতে পারেন—এমন আশঙ্কা জেনেও তিনি দলের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এদিকে, ২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের সময় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। ওই মামলায় ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। বিচার চলাকালে তিনি অনুপস্থিত থাকায় তার পক্ষে রাষ্ট্রীয় খরচে আইনজীবী নিয়োগ দিয়েছিল ট্রাইব্যুনাল। প্রচলিত আইন অনুযায়ী, ওই রায় বহাল রাখা বা পরিবর্তনের ক্ষমতা রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের। তবে রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের তামাদি মেয়াদও অতিক্রান্ত হয়েছে। ফলে দেশে ফিরে তিনি আদালতে আত্মসমর্পণের সুযোগ পাবেন কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পর আইনগত দিক নিয়ে কথা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি বলতে চাই, এখানে কিছু বিষয় রয়েছে। তিনি মূলত ৫ আগস্ট ভারত চলে গিয়েছেন এবং সেখানেই আছেন বলে আমরা জানি। তিনি আগামী ডিসেম্বরে নেতাদের নিয়ে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করবেন বলে একটি বিদেশি সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। বিষয় হচ্ছে, তিনি যেহেতু ভারতে আছেন, সেখানে আশ্রয় পেয়েছেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশের একটি ট্রাইব্যুনালে দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন এবং এরপর আমরা তাকে ফেরত চেয়ে ভারত সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছি। সুতরাং ভারত সরকার চাইলে সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে বাংলাদেশে বন্দিবিনিময় চুক্তির অধীনে ফেরত পাঠাতে পারে, পুশব্যাক করতে পারে অথবা রাজনৈতিক আশ্রয় দিতে পারে।’

সন্দেহ প্রকাশ করে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘শেখ হাসিনা নিজে নিজে দেশে আসবেন—এটি বলার সুযোগ কোথায়? কোনও সুযোগ নেই। আইনগতভাবেও কোনও সুযোগ নেই। রয়টার্সকে যে বক্তব্য তিনি দিয়েছেন, তা নিয়েও সন্দেহ আছে। বিষয়টি যাচাই-বাছাই প্রয়োজন। আর যদি তিনি বলেও থাকেন, তাহলে মনে হয় এটি মানুষকে বোকা বানানোর জন্য বা চাতুর্যপূর্ণ বক্তব্য।’

আমিনুল ইসলাম বলেন, তিনি যদি স্বেচ্ছায়ও দেশে আসেন, তাহলে তাকে আইনের আওতায় আসতে হবে এবং অবশ্যই কারাগারে যেতে হবে। ‘তিনি আদালতে আত্মসমর্পণের কথা বলেছেন। কিন্তু তার আগেই তিনি পুলিশের হেফাজতে চলে যাবেন। এরপর কারাগারে গিয়ে তিনি কী করবেন, সেটি তাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তিনি দেশে ফিরে আসতে চান, এটা খুবই ভালো কথা। আমি তাকে স্বাগত জানাই। তিনি দেশে ফিরে বিচারের মুখোমুখি হতে চেয়েছেন, এটিও ভালো দিক। তবে একটি বিষয় থেকে যায়। তিনি কোন প্রক্রিয়ায় দেশে আসবেন, সেটির ওপরই নির্ভর করবে কীভাবে তিনি বিচারের মুখোমুখি হবেন।’

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মামুন মাহবুব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ দেশের নাগরিক। তিনি এ দেশে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, তাই এখানে ফিরতেই পারেন। তিনি আইনের প্রয়োগ খুব ভালো করেই জানেন। দেশে ফিরে তিনি নিশ্চয়ই আত্মসমর্পণ করবেন, তারপর মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল করবেন বা রিটও করতে পারেন। যেহেতু আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইনটি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য ছিল, কিন্তু ৫ আগস্টের পর ড. আসিফ নজরুলরা এটি সংশোধন করে শেখ হাসিনার বিচার করার জন্য করেছেন, সেহেতু আইনের বৈধতা ও বিচারের প্রশ্নে রিট হতে পারে। তিনি সব কিছু আইনিভাবেই মোকাবিলা করতে চেয়েছেন, এটি ভালো। পূর্বসূরিরা জামায়াতকে রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ করেছিল, কিন্তু তা স্থায়ী হয়নি। তেমনি আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেও দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। কেননা দেশের ৩০ শতাংশ মানুষ আওয়ামী লীগকে সমর্থন করেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি মনে করি, দলটিকে নিষিদ্ধ না করে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করা উচিত। বিগত নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতের নেতারা আওয়ামী লীগের সমর্থকদের কাছেও ভোট চেয়েছেন। আর যেহেতু তিনি বঙ্গবন্ধুকন্যা ও অভিজ্ঞ সাবেক প্রধানমন্ত্রী, সুতরাং আইনগতভাবে বিষয়টি কীভাবে মোকাবিলা করবেন; সে পরিকল্পনা হয়তো তারও রয়েছে।’

মামুন মাহবুবের মতে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করলে বিচার বিভাগের জন্যও এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে। ‘বিচার বিভাগ সঠিকভাবে বিচার করে পূর্বের ধারণা পাল্টে দেবে, নাকি অতীতের মতোই বিচার করবে—সেটিই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।’