Image description

পুলিশ বাহিনীর প্রায় ৬৩ শতাংশ কনস্টেবল। বর্তমানে এই পদে কর্মরত এক লাখ ৩৪ হাজার সদস্য। এ ছাড়া উপপরিদর্শক (এসআই) প্রায় ২৮ হাজার এবং সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) ২৭ হাজার। পুলিশের দুই লাখ ১৩ হাজার সদস্যের মধ্যে নন-ক্যাডার পদে কনস্টেবল, এসআই ও এএসআই পদের সদস্য এক লাখ ৮৯ হাজার। এই তিন পদের কর্মীদের পদায়নের নতুন নীতিমালার আলোকে গত এক মাসে ৪৩৩ পুলিশ সদস্যকে মহানগরের তাদের নিজ জেলা থেকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে। পাঁচটি পদের বদলিকৃত সদস্যদের মধ্যে কনস্টেবল ৩৮১ জন। 

সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, এএসপি থেকে তদূর্ধ্ব পদের অর্ধশতাধিক কর্মকর্তাকে নিজ জেলার মহানগর পুলিশ ইউনিট থেকে অন্যত্র বদলি করা হবে। তাদের নাম বাছাই করা হয়েছে। বদলির নতুন নীতিমালা কার্যকর হওয়ায় এখন থেকে নিজ জেলার মহানগরে কোনো পুলিশ সদস্যকে পদায়ন করা হবে না।  

কোন পদের কতজন 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত এক মাসে পাঁচটি পদের যে ৪৩৩ জনকে নিজ জেলার মহানগর পুলিশ ইউনিট থেকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে তাদের মধ্যে এসআই (নিরস্ত্র) ৪৩ জন। এই তালিকায় সার্জেন্ট আছেন চারজন, এসআই (সশস্ত্র) তিনজন, টিএসআই দুজন ও কনস্টেবল ৩৮১ জন। বদলির আগে অনেকের কাছে তাদের পরিবার ও স্বজনের কথা চিন্তা করে বদলির সম্ভাব্য ইউনিটের নাম জানতে চাওয়া হয়েছে। 

যে কারণে ব্যতিক্রম ডিএমপি  

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, বদলির নীতিমালায় একমাত্র ব্যতিক্রম ইউনিট হিসেবে ঢাকা মহানগর পুলিশকে (ডিএমপি) রাখা হয়েছে। কারণ, পুলিশের সবচেয়ে বড় ইউনিট ডিএমপি। প্রায় ৩৫ হাজার সদস্য এখানে আছেন। পুলিশ বাহিনীর প্রায় ছয় ভাগের এক ভাগ ডিএমপিতে কর্মরত। তাই নিজ জেলার হলেও একমাত্র ডিএমপিতে কোনো সদস্যকে পদায়ন করা যাবে– এমন শর্ত রাখা হয়। এটি না থাকলে ডিএমপিতে স্বাভাবিক পদায়ন প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। 

যে কারণে নিজ এলাকায় চাকরি নয় 

অনেক পুলিশ সদস্য ছিলেন, যারা বছরের পর বছর নিজ জেলায় মহানগর পুলিশে চাকরি করে যাচ্ছিলেন। গত এক মাসে যাদের সরানো হয়েছে, তাদের মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) ও খুলনা মহানগর পুলিশে (কেএমপি) ছিলেন এমন সদস্য বেশি। পুলিশের অনেকের ভাষ্য, নিজ এলাকায় চাকরি করলে আত্মীয়তা ও সামাজিক সম্পর্কের কারণে নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে এক ধরনের ঝুঁকি থাকে। আবার পারিবারিক ও গোষ্ঠীগত বলয়ের আশপাশের পুলিশিং করলে একসময় কারও কারও মধ্যে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে শৈথিল্য দেখা যেতে পারে। আগে থেকে পরিচিত ব্যক্তিদের উপযুক্ত আইন প্রয়োগে দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করে। এসব বিবেচনায় নিজ জেলার মহানগরে চাকরি করার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করা হয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র বলছে, নিজ এলাকায় চাকরি করলে অনেকে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। কেউ আবার মাদক ব্যবসায়ী, পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রক, চাঁদাবাজি ও মামলাবাজ চক্রে জড়ান। কয়েক বছর ধরেই নিজ জেলার মহানগর পুলিশে পদায়নের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। এরপরও অনেকে নিজ জেলার মহানগর ইউনিটে চাকরি করে গেছেন। যারা ওই তালিকায় ছিলেন তাদের এখন অন্যত্র বদলি করা হয়েছে। নিজ জেলার মহানগরে থাকাকালীন ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন এমন কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। 

পদায়নের নীতিমালায় যা আছে

এসআই, এএসআই ও কনস্টেবল পদায়নের নীতিমালায় বলা হয়েছে, কোনো ইউনিটে দুই বছরের বেশি চাকরি করার পর অন্যত্র বদলি করা যাবে। রেঞ্জ ব্যতীত অন্য কোনো ইউনিটে পাঁচ বছরের বেশি ধারাবাহিকভাবে চাকরি করতে পারবেন না। রেঞ্জের ক্ষেত্রে একই জেলায় তিন বছরের বেশি চাকরি করা যাবে না। শুধু এই নিয়মের ব্যত্যয় করা যাবে– যখন কোনো পুলিশের ইউনিট কারও ক্ষেত্রে স্বীকৃত কারিগরি দক্ষতার বিষয়টি নিশ্চিত করবে। 

নীতিমালায় আরও বলা আছে, প্রশাসনিক কারণে কোনো পুলিশ সদস্যের বদলি হলে সেই আদেশ বাতিল হবে না। প্রশাসনিক কারণে বদলিকৃত কর্মস্থলে কর্মকাল দুই বছর পূর্ণ না হলে অন্যত্র বদলি করা যাবে না। এ ছাড়া স্বামী-স্ত্রী সরকারি চাকরিজীবী হলে তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে একই বা কাছাকাছি এলাকায় পদায়নের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।  

পার্বত্য জেলায় পদায়ন একবার 

নীতিমালায় বলা হয়েছে, চাকরিজীবনে একবারের বেশি পার্বত্য জেলায় পদায়ন করা যাবে না। তবে কোনো পুলিশ সদস্য ইচ্ছুক হলে দ্বিতীয়বার পদায়ন করা যাবে। চট্টগ্রাম রেঞ্জের আওতাধীন বদলিকৃত পুলিশ সদস্যদের পদায়নের পর কর্মকাল দুই বছর পূর্ণ না হলে পার্বত্য জেলা ব্যতীত অন্য জেলা বা ইউনিটে বদলি করা যাবে না। এ ছাড়া বিভাগীয় এসআইদের (নিরস্ত্র) মহানগর পুলিশ ও এসবিতে পদায়নের ক্ষেত্রে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচএসসি বা সমমান হতে হবে। এ ছাড়া পুলিশ সদরদপ্তরের কোনো ইউনিটে বদলির প্রয়োজন হলে ওই সদস্যকে বর্তমান কর্মস্থলে চাকরির মেয়াদ দুই বছর পূর্ণ হতে হবে।  

ছুটির আবেদনের ক্লিয়ারেন্স ৭ দিনে 

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, এখন সর্বোচ্চ ৭ দিনের মধ্যে পুলিশ ক্যাডার কর্মকর্তাদের ছুটির বহির্গমন ও শিক্ষা ছুটির আবেদন যাচাই করার প্রক্রিয়া শেষ করা হয়। আগে এই ধরনের প্রক্রিয়া শেষ করতে ২১ দিনের মতো লাগত। এখন প্রযুক্তির সহায়তায় একটি জায়গায় থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই এবং বদলি-সংক্রান্ত আবেদন তিন দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করা হয়।