চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার মুরাদপুর ইউনিয়নের রহমত নগর গ্রামে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ, পরবর্তী পুলিশি অভিযান এবং এক নারীর মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকাজুড়ে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। গত কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, গভীর রাতে পুলিশের একাধিক অভিযান এবং অভিযানের পর এক নারীর মৃত্যুকে ঘিরে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। নিহতের স্বজনদের দাবি, পুলিশের অভিযানের সময় সৃষ্ট আতঙ্ক ও মানসিক চাপেই ওই নারীর মৃত্যু হয়েছে। তবে পুলিশ জানিয়েছে, তিনি আগে থেকেই শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন। পুরো ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করে অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার।
স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ১ জুলাই রাত সাড়ে ৮টার দিকে এসকেএম জুট মিলের প্রধান ফটকের সামনে রিয়াজ উদ্দিন রাজু ও সাব্বির হোসেন দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের কয়েকজন আহত হন। পরে দুই পক্ষই সীতাকুণ্ড থানায় পৃথক অভিযোগ দায়ের করে। তদন্ত শেষে একটি অভিযোগ মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হলে মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করে পুলিশ।
রহমত নগর গ্রামের প্রবাসী রিয়াজ উদ্দিন রাজু আমার দেশকে বলেন, বিদেশ থেকে দেশে ফেরার পর প্রতিবেশী সাব্বির হোসেন তার কাছ থেকে এক লাখ টাকা ধার নেন। দীর্ঘদিনেও সেই টাকা ফেরত না দেওয়ায় তিনি পাওনা টাকা চাইলে বিরোধের সূত্রপাত হয়। একপর্যায়ে বিষয়টি সংঘর্ষে রূপ নেয়। এতে তিনি ও তার বন্ধু তুষার আহত হন।
অন্যদিকে রিয়াজ উদ্দিন রাজুর অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন অপর পক্ষের সাব্বির হোসেনের ভাই মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন। তিনি আমার দেশকে বলেন, তাদের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে এসকেএম জুট মিলের অভ্যন্তরে একটি কনটেইনার ডিপোতে সাব-কন্ট্রাক্টর হিসেবে কাজ করছে। এক লাখ টাকা ধার নেওয়ার অভিযোগ ভিত্তিহীন। বরং রিয়াজ উদ্দিন রাজু জুট মিলে প্রবেশকারী মালবাহী ট্রাক থেকে দীর্ঘদিন ধরে প্রতি গাড়ি প্রতি দুই হাজার টাকা করে চাঁদা নিয়ে আসছে। সম্প্রতি ২ হাজার টাকার পরিবর্তে গাড়ি প্রতি ৫ হাজার টাকা করে চাঁদা দাবি করছে। তাকে পাঁচ হাজার টাকা করে চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় গত ১ জুলাই রাতে এসকেএম জুট মিলের গেটে একটি পাথরবোঝাই ট্রাক আটকে দেওয়া হয়। খবর পেয়ে তার বাবা মুক্তিযোদ্ধা কাশেম ও তার ভাই সরোয়ার হোসেন সুমন এবং সাব্বির হোসেন ঘটনাস্থলে গেলে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। এতে সরোয়ার হোসেন সুমনের মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে এবং তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এদিকে স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ৪ জুলাই দুপুরে সীতাকুণ্ড থানার এসআই বেলালের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল তুষার নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালায়। এ সময় এলাকাবাসী তার বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের আইনগত ভিত্তি সম্পর্কে জানতে চাইলে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। স্থানীয়দের দাবি, একপর্যায়ে জনতার প্রতিরোধের মুখে পুলিশ তুষারকে নিয়ে যেতে পারেনি।
এরপর ৪ জুলাই ও ১০ জুলাই গভীর রাতে রহমত নগর গ্রামে দফায় দফায় অভিযান চালায় পুলিশ। এলাকাবাসীর অভিযোগ, অভিযানের খবর ছড়িয়ে পড়লে অনেক পুরুষ সদস্য নিরাপত্তার আশঙ্কায় বাড়িঘর ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান। সর্বশেষ গত ১০ জুলাই গভীর রাতে পুলিশের অভিযানে মো. রফিকুল ইসলাম ও তার ছোট ভাই নাজিম উদ্দিনকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। পরে রফিকুল ইসলামকে ছেড়ে দেওয়া হলেও নাজিম উদ্দিনকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
মো. রফিকুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, ৪ জুলাই এসআই বেলাল আমার ছেলে তুষারকে বাড়ির আঙিনা থেকে আটক করতে গেলে আমরা মামলার কাগজপত্র ও গ্রেপ্তারের আইনগত ভিত্তি দেখতে চাই। এলাকাবাসীও একই দাবি জানায়। পরে পুলিশ তাকে নিয়ে যেতে পারেনি। কিন্তু এর জের ধরে ৪ ও ১০ জুলাই গভীর রাতে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য আমাদের বাড়িতে দফায় দফায় অভিযান চালায়।
তিনি আরও বলেন, ১০ জুলাই রাতে পুলিশ আমাদের বাড়ি এবং আমার চাচাতো ভাই আবুল কালাম আবুর বাড়িতে তল্লাশি চালায়। অভিযানের সময় আমার চাচাতো ভাইয়ের স্ত্রী আতঙ্কিত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তাকে সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। আমাদের ধারণা, গভীর রাতের ওই অভিযানে সৃষ্ট আতঙ্ক ও মানসিক চাপই তার মৃত্যুর কারণ।
সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আলতাফ হোসেন আমার দেশকে বলেন, রাত ১টার পর ওই নারীকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়। হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ৪ ও ১০ জুলাইয়ের অভিযানে বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালানোর সময় নারী ও শিশুদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া তুষারকে আটক করার সময় তাকে মারধরের অভিযোগও তোলা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহিনুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি মোবাইলের লাইন কেটে দিয়েছেন যার কারণে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে এসআই বেলালের মুঠোফোনেও যোগাযোগ করা হলেও তিনি মোবাইল রিসিভ করেননি।
সীতাকুণ্ড উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব মোহাম্মদ মোরসালিন আমার দেশকে বলেন, এটি বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোনো বিরোধ নয়। রহমত নগর গ্রামের দুই প্রতিবেশীর মধ্যে মারামারির ঘটনায় দুই পক্ষ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে। বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ ছিল। কিন্তু গভীর রাতে পরিচালিত পুলিশি অভিযান নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম, বিপিএম আমার দেশকে বলেন, মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যেই পুলিশ অভিযান পরিচালনা করেছে। আসামির অবস্থান নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে আশপাশের বাড়িতেও তল্লাশি চালানো হয়, যা আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ। যে নারী মারা গেছেন, তিনি আগে থেকেই অসুস্থ ছিলেন, এ তথ্য পুলিশ জানত না। তারপরও ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। পুরো ঘটনা তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হবে। তদন্তে কোনো পুলিশ সদস্যের দায়িত্বে অবহেলা বা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘটনার পর থেকে রহমত নগর গ্রামে এখনও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ, দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের সত্যতা, গভীর রাতে পরিচালিত পুলিশি অভিযানে আইনগত প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না এবং ওই অভিযানের সঙ্গে নারীর মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর এখন খুঁজছেন এলাকাবাসী। পুলিশের ঘোষিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেই এসব প্রশ্নের জবাব মিলবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।