Image description

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালুর আগে যৌথ কারিগরি কমিটির বৈঠক হবে। তিন মাস আগে বাংলাদেশ এজন্য চিঠি দিলেও, দিন জানায়নি কুয়ালালামপুর। এরই মধ্যে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিককর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী দেশটির শ্রমবাজার চালুর ঘোষণা দিয়েছেন।

জনশক্তি রপ্তানি খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেকোনো শ্রমবাজার খোলার আগে প্রক্রিয়া, খরচ এবং কর্মীরা কীভাবে যাবে, তা স্পষ্ট করতে হয়। মালয়েশিয়ার সঙ্গে এসব প্রক্রিয়ার কিছুই এগোয়নি। এর মধ্যে হঠাৎ মন্ত্রীর ঘোষণার কারণে রিক্রুটিং এজেন্সি বা দালালরা মানুষের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার সুযোগ পাবেন। অতীতেও এমন সমন্বয়হীনতায় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হয়েছে। বর্তমান সরকারও সেই পথেই হাঁটছে বলে মনে করছেন তাঁরা।

২০২৪ সালের ৩১ মে সর্বশেষ বাংলাদেশিদের জন্য বন্ধ হয় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের ওই সময়ে কর্মী পাঠাতে ক্ষমতাসীন দলের ‘সিন্ডিকেট’– এর বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

শেখ হাসিনার পতনের পরে অন্তর্বর্তী সরকার একাধিকবার চেষ্টা করেও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালু করতে পারেনি। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর বাজারটি খুলতে তৎপরতা চালাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৮ এপ্রিল মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, পরে ২১ জুন মালয়েশিয়া সফর করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দুই নেতার সফরে শ্রমবাজার খোলার বিষয়ে আলোচনা হলেও, দেশটির অভ্যন্তরীণ ঝামেলায় কোনো ঘোষণা আসেনি।

এরপর হঠাৎ গত ৭ জুলাই সিলেটের সার্কিট হাউসে মন্ত্রী আরিফুল হক মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার ঘোষণা দেন। তবে খোদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও বলছেন, মালয়েশিয়া সরকার সম্প্রতি বিদেশি কর্মী নিয়োগের বিভাগ ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টারকে’ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় স্থানান্তর করেছে। এর বাইরে কোনো সিদ্ধান্ত তারা জানায়নি।

সূত্র জানায়, শ্রমবাজার চালুর আগে দুই দেশের মধ্যে যৌথ কারিগরি কমিটির বৈঠক ও চিঠি চালাচালি হয়। মালয়েশিয়া কোন প্রক্রিয়ায় কর্মী নেবে, তা লিখিতভাবে বাংলাদেশকে জানাবে। এরপর বাংলাদেশ লিখিতভাবে সম্মতি দেবে। অথবা দুপক্ষ বসে সিদ্ধান্ত নেবে।

মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, প্রধানমন্ত্রীর সফরের পর দুই দেশের জয়েন্ট স্টেটমেন্ট অনুযায়ী, যৌথ কারিগরি কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা। নিয়ম অনুযায়ী, এই বৈঠক মালয়েশিয়ায় হবে। গত এপ্রিলে তাদের বৈঠকের আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি দেয় বাংলাদেশ। মে মাসে জবাবে মালয়েশিয়া জানায়, মন্ত্রিপরিষদের অনুমোদনে শিগগির বৈঠকের তারিখ জানানো হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো তারিখ জানায়নি কুয়ালালামপুর।

কর্মকর্তাদের ভাষ্য, কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া কেমন হবে এবং কবে নাগাদ বাজার খুলবে, তা পুরোটাই মালয়েশিয়ার ওপর নির্ভর করছে। তবে তারা যেসব দেশ থেকে এবার কর্মী নেবে, তার মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে।

 

শ্রমবাজার চালুর আগে দুই দেশের মধ্যে যৌথ কারিগরি কমিটির বৈঠক ও চিঠি চালাচালি হয়। মালয়েশিয়া কোন প্রক্রিয়ায় কর্মী নেবে, তা লিখিতভাবে বাংলাদেশকে জানাবে। এরপর বাংলাদেশ লিখিতভাবে সম্মতি দেবে। অথবা দুপক্ষ বসে সিদ্ধান্ত নেবে।

 

জানতে চাইলে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিককর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হেদায়েতুল ইসলাম মণ্ডল স্ট্রিমকে বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে মালয়েশিয়ার যৌথ কারিগরি কমিটির বৈঠকের পর ফ্লো-চার্ট ফাইনাল হবে। তারপর বাজার চালু হবে। বৈঠক কবে হবে, তা মালয়েশিয়া থেকে এখনো জানানো হয়নি। ফলে দেশটির শ্রমবাজার নিয়ে কোনো কিছুই জানানো সম্ভব নয়।’

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের লেবার মিনিস্টার সিদ্দিকুর রহমান স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমরা আনুষ্ঠানিক কোনো কিছু হাতে পাইনি। যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছি। এর বাইরে কিছু বলতে পারছি না। আমরা চেষ্টা করছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমাদের হাতে কোনো তথ্য নেই।’

আবার সিন্ডিকেটের শঙ্কা

২০২৪ সালে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধে বড় ভূমিকা রাখে অনিয়ম-দুর্নীতি। ওই সময় বাংলাদেশের শতাধিক রিক্রুট এজেন্সি সিন্ডিকেট করে শ্রমিকদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছিল। অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা জানান, মালয়েশিয়া ২০২১ সালে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়া শুরু করে। এর মূল দায়িত্বে ছিলেন মালয়েশিয়ায় বেস্টিনেট কোম্পানির পরিচালক আমিনুল ইসলাম। কোম্পানির অধীন ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের (এফডব্লিউসিএমএস) মাধ্যমে কর্মী নিতে আমিনুলের নেতৃত্বে বাংলাদেশের ২৫ রিক্রুটিং এজেন্সির সিন্ডিকেট হয়। পরে এতে আরও ৭৬টি এজেন্সি যোগ দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ ও সিঙ্গাপুরের স্ট্রেইট টাইমস পৃথক প্রতিবেদনে জানায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরের সময় তাঁর সঙ্গে দেখা করেছেন আমিনুল ইসলাম। আর গত ৬ জুলাই মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী আর রামানান জানান, বিদেশি কর্মী নিয়োগ আগের মতোই এফডব্লিউসিএমএসের অধীনে হবে। প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমেই ই-কোটা মডিউলে আবেদন প্রক্রিয়া পরিচালিত হবে।

এই দুটি ঘটনার জেরে শ্রমবাজারটি নিয়ে আবার সিন্ডিকেট হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা। মালয়েশিয়াপ্রবাসী বাংলাদেশি সাংবাদিক আহমেদুল কবির স্ট্রিমকে বলেছেন, বিদেশি কর্মীর জন্য মালয়েশিয়া ‘কেস বাই কেস’ আবেদন জমার পদ্ধতি বাতিল করছে। এফডব্লিউসিএমএসের মাধ্যমে কর্মী নিলে সিন্ডিকেটের সম্ভাবনা থেকেই যাবে।

বাংলাদেশের সঙ্গে মালয়েশিয়ার যৌথ কারিগরি কমিটির বৈঠকের পর ফ্লো-চার্ট ফাইনাল হবে। তারপর বাজার চালু হবে। বৈঠক কবে হবে, তা মালয়েশিয়া থেকে এখনো জানানো হয়নি। ফলে দেশটির শ্রমবাজার নিয়ে কোনো কিছুই জানানো সম্ভব নয়।হেদায়েতুল ইসলাম মণ্ডল, উপসচিব, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিককর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়

অভিবাসন নিয়ে কাজ করা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান স্ট্রিমকে বলেন, ‘যাঁর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ, তিনি তো রয়েই যাচ্ছেন। মালয়েশিয়ার গণমাধ্যমে এসেছে– আমিনুল ইসলাম আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছেন। তাঁর মতো ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পেলে দেশটির শ্রমবাজার নিয়ে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি যে ঘটবে না, তার নিশ্চয়তা কে দেবে?’

তিনি বলেন, ‘মালয়েশিয়ায় ১৯৭৮ সালে কর্মী পাঠানোর মধ্য দিয়ে বাজারটা শুরু হয়। কিন্তু বিগত ৪৮ বছর একই প্রতারণা, সংকট ও ভুল সরকারগুলো করছে। একটি বাজার খুলছে বলার আগে কোন প্রক্রিয়ায় খুলছে, খরচ কত, কীভাবে কর্মী যাবে, তা বলতে হবে। এসব স্পষ্ট না করে সরকার যখন বলে শ্রমবাজার খুলছে, তখন রিক্রুটিং এজেন্সি বা দালালরা প্রচুর মানুষের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার সুযোগ পাবে। এই সমন্বয়হীনতা ইঙ্গিত দেয় অতীতের অন্যায়গুলো ফিরে আসতে পারে।’

কর্মকর্তারাও ধন্ধে

মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার উন্মুক্তের ঘোষণার দুদিন পর ৯ এপ্রিল একটি সতর্কতামূলক বার্তা দেয় প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিককর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। এতে শ্রমবাজার খোলার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগে লেনদেন না করতে আগ্রহীদের সতর্ক করা হয়।

এরপর থেকে মন্ত্রণালয়েও চলছে লুকোচুরি। মন্ত্রণালয়ের অন্তত চার কর্মকর্তা স্ট্রিমকে জানিয়েছেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে কী হচ্ছে, তাঁরা কিছুই জানেন না। প্রধানমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর সফরের পরেও বিষয়টি নিয়ে কোনো ব্রিফিং হয়নি।

নাম প্রকাশ না করে মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তির বাইরে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। আরেক কর্মকর্তা বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে মন্ত্রী আমাদের কিছুই বলেননি। এরপরও আমরা ইতিবাচক। শ্রমবাজারটি চালু হয়ে যাবে। যৌথ কারিগরি কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। আমরা চিঠি দিয়েছি, মালয়েশিয়া আমন্ত্রণপত্র গ্রহণ করেছে কিনা, তা জানি না।

কর্মকর্তাদের ভাষ্য, মালয়েশিয়া সরকার যে পদক্ষেপ নিয়েছে, সে বিষয়ে হয়ত মন্ত্রী ভুল বুঝেছেন। সেজন্য তিনি শ্রমবাজার চালুর ঘোষণা দিয়েছেন।

এ ব্যাপারে মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর নম্বরে একাধিকবার কল দিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তবে মন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব মাহবুবুল ইসলাম বলেছেন, ‘স্যার (আরিফুল হক চৌধুরী) ঠিকই বলেছেন। আগামী দুই মাসের মধ্যে মালয়েশিয়া শ্রমবাজার চালু হবে। শুধু কাগজপত্রের কাজ বাকি। বাকি সব হয়ে গেছে।’