Image description

চট্টগ্রামের সাত উপজেলায় ১০ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি। দুর্গম এলাকায় পৌঁছানো যাচ্ছে না ত্রাণ। উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সহযোগিতা করতে মাঠে নেমেছে সেনাবাহিনী। কক্সবাজারে সাত দিন ধরে দুর্বিষহ জীবন পার করছেন লাখ লাখ মানুষ। জেলার বিস্তীর্ণ জনপদ পানির নিচে। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন আড়াই লাখ মানুষ।  সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, কৃষি ও জনজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ৫ জুলাই থেকে গতকাল পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন স্থানে পানিতে ডুবে ও পাহাড় ধসে ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। দুর্গত এলাকায় খাদ্য সহায়তা অপ্রতুল। টিউবওয়েল ডুবে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির সংকটও তীব্র। পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কায় কক্সবাজার জেলা প্রশাসন জারি করেছে সর্বোচ্চ সতর্কতা। রাঙামাটির নিম্নাঞ্চলে বন্যায় কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে পশুর খামার। পানিতে তলিয়ে আছে ফসলি জমি। বান্দরবান শহর আবার প্লাবিত হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের সাবস্টেশনের ট্রান্সফরমার ডুবে যাওয়ায় বিকল্প উপায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। হবিগঞ্জে আরও ১২টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। রাজশাহীতে বাড়ছে পদ্মার পানি। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জারি করেছে ৭ জরুরি নির্দেশনা।

চট্টগ্রাম : বাঁশখালী উপজেলার বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী বাহারছড়া ইউনিয়নের বৃহত্তর গ্রাম ইলশা। এই গ্রামের হামিদ কাজির পাড়ার বাসিন্দা আবদুল করিম। বন্যার পানি বেড়ে যাওয়ায় আশ্রয় নিয়েছিলেন আশ্রয়কেন্দ্রে। শনিবার পানি কিছুটা কমলে বাড়ি গিয়ে দেখেন তাদের মাটির ঘরটি ভেঙে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এই গ্রামের আনোয়ারুল ইসলাম, সকিয়া ইয়াসমিনসহ অনেকের মাথা গোঁজার ঠাঁই বন্যার পানিতে ভেঙে গেছে। বাঁশখালীর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে বাহারছড়া ইউনিয়ন অন্যতম। উপকূলীয় এই ইউনিয়নের নয়টি গ্রামের মধ্যে পূর্ব ইলশা, পশ্চিম ইলশা, মধ্য ইলশা, উত্তর ইলশা, রত্নপুর, চাপাছড়িসহ প্রায় পুরো এলাকাই পানির নিচে তলিয়ে ছিল টানা চার দিন। বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের তীব্র সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে তাদের।  চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, বাহারছড়া ইউনিয়নের মতো চট্টগ্রামের ১৬ উপজেলায় ১৭৬টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা বন্যাকবলিত হয়েছে। বর্তমানে ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবার পানিবন্দি এবং ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৫৯০ জন। গত পাঁচ দিনে পাহাড়ধস, দেয়ালধস ও পানিতে ডুবে এ পর্যন্ত ১০ জন নিহত ও ৫ জন আহত হয়েছে। যদিও সরেজমিন পরিদর্শন ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য বলছে, এখন পর্যন্ত সাত উপজেলায় ২ লাখের বেশি পরিবারের ১০ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি।

২৯৭ কিমি সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত : প্রাথমিকভাবে সড়ক ও জনপথ বিভাগের আওতাধীন ২০টি সড়কের ৫০ দশমিক ৫৬ কিলোমিটার এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতাধীন জেলার ৫১৪টি সড়কের ২৪৭ দশমিক ৬৫ কিলোমিটার অংশ এবং ১৭৬টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাগুলো।

আরও এক শিশুর মৃত্যু : বন্যার পানিতে ডুবে সাতকানিয়ার দক্ষিণ রূপকানিয়া এলাকায় ইসমাইল হোসেন (২) নামে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার রাতে এই ঘটনা ঘটে। নিহত ইসমাইল ওই এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা জয়নাল আবেদীনের পুত্র।

রাঙ্গুনিয়ায় সেতু ধস : পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে রাঙ্গুনিয়ার পদুয়া ইউনিয়নের শিলক খালের ওপর নির্মিত ব্রিজঘাট বেইলি সেতু ধসে রাঙ্গুনিয়া-বান্দরবানের সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এতে দুই পাশে হাজারো যাত্রী চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। শনিবার (১১ জুলাই) ভোররাতের দিকে এই ঘটনা ঘটে।

জোয়ারে ভেসে এসেছে অজ্ঞাত যুবকের লাশ : চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের দক্ষিণ পরুয়াপাড়া সাত্তার মাঝির ঘাট এলাকায় সাগরের জোয়ারে ভেসে আসা অজ্ঞাত যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল বেড়িবাঁধের ব্লকের সঙ্গে আটকে থাকা লাশটি উদ্ধার করে পুলিশ।

কক্সবাজার : কক্সবাজারে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। চার-পাঁচ দিন ধরে পানিবন্দি হয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন দুর্গতরা। পানিবন্দি হাজারো পরিবারে পৌঁছায়নি কোনো ধরনের খাদ্যসহায়তা। প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলগুলো ত্রাণ তৎপরতা শুরু করলেও চাহিদার তুলনায় খুবই অপ্রতুল। টিউবওয়েল ডুবে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির সংকটও তীব্র হয়েছে।

এদিকে পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কায় কক্সবাজার জেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। পাহাড়ের পাদদেশ, ঢালু এলাকা এবং বন্যাকবলিত নিচু স্থানে বসবাসকারীদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নান জানিয়েছেন, বন্যায় কক্সবাজারের ৬৯টি ইউনিয়ন কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখনো পানিবন্দি রয়েছে আড়াই লাখ মানুষ।

রাঙামাটি : রাঙামাটির নিম্নাঞ্চলে বন্যায় কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে বাঘাইছড়ি, বিলাইছড়ি, বরকল ও রাজস্থলী উপজেলায় দুর্ভোগ চরমে। ডুবে গেছে গোলা ভরা ধান ও ফসলসহ জমি। ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে গবাদি পশুর খামার। রাজস্থলী উপজেলায় বন্যার পানিতে ডুবে দুই খামারির ৮টি গুরুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সকালে রাজস্থলী উপজেলায় ১ নম্বর ঘিলাছড়ি ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মহাজনপাড়ায় এ ঘটনা ঘটে।

বান্দরবান : বান্দরবান জেলা শহর আবার প্লাবিত হয়েছে। জেলা শহরের মেম্বারপাড়া, ইসলামপুর, ফায়ার সার্ভিস এলাকা, বড়ুয়ার টেক, আর্মিপাড়া, বালাঘাটা, কালাঘাটা, ক্যাচিংঘাট, মুসলিমপাড়া ও শেরেবাংলা নগর এলাকায় পানি বেড়ে কোথাও কোথাও ৮ ফুট পর্যন্ত ডুবে গেছে। বান্দরবান বিদ্যুৎ বিভাগের নতুন ব্রিজ-সংলগ্ন বিদ্যুৎ সাবস্টেশনের একটি ট্রান্সফরমারসহ বেশ কিছু যন্ত্রপাতি আংশিক ডুবে গেছে। এর ফলে এ সাবস্টেশনটিকে বন্ধ রেখে বিকল্প উপায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু রাখা হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, শনিবার দুপুর ১২টায় সাঙ্গু নদী বান্দরবান শহর পয়েন্টে বিপৎসীমার ২ মিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। অন্যদিকে মাতামুহুরী নদীতে বিপৎসীমার কাছাকাছি দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।

হবিগঞ্জ : টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে হবিগঞ্জে বন্যার পানিতে নতুন করে প্লাবিত হয়েছে আরও অন্তত ১২টি গ্রাম। এর আগে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়ন ও বাহুবল উপজেলার লামাতাসি ইউনিয়নসহ আশপাশের অন্তত ২৫টি গ্রাম বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন ওইসব গ্রামের প্রায় লক্ষাধিক মানুষ। বিশেষ করে বন্যাদুর্গতদের মধ্যে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

নোয়াখালী : টানা বর্ষণের প্রভাব পড়েছে নোয়াখালী জেলা শহর ও দ্বীপ হাতিয়ায়। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৪৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। আর এতেই নোয়াখালী পৌরসভার মাইজদীর প্রধান সড়ক ও দ্বীপ হাতিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। সামান্য বৃষ্টিতেই চরম দুর্ভোগে পড়ছেন পৌরসভার প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার বাসিন্দা। এদিকে উপকূলীয় হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপ, তমরুদ্দী, নলচিরাসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।

সাতক্ষীরা : দুই দিনের রাতভর টানা বর্ষণ ও দিনভর থেমে থেমে বৃষ্টিপাতে সাতক্ষীরার তালা, কলারোয়া, সাতক্ষীরা সদর, দেবহাটা, কালিগঞ্জ ও আশাশুনি উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে ভেসে গেছে মৎস্য ঘের, ছোটবড় পুকুর। পানিতে তলিয়ে আছে খালবিল, বাড়ির আঙিনা। এ ছাড়া পানিতে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বেশ কিছু অফিস প্রাঙ্গণ পানিতে থইথই করছে। চরম দুর্ভোগকে পড়েছেন শিক্ষার্থীসহ সরকারি অফিসে কাজে আসা সাধারণ মানুষ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরুরি নির্দেশনা : দেশের বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং দুর্গত এলাকায় জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ে সাতটি জরুরি নির্দেশনা দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গতকাল অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার পরিচালক আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে দেশের সব বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক, সিভিল সার্জন ও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের এ নির্দেশনা পাঠানো হয়।

এতে বলা হয়, সাম্প্রতিক বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে একটি জরুরি ভার্চুয়াল সভা হয়। সভায়  স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা যুক্ত ছিলেন। এ ছাড়া সভায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন), অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন), পরিচালক (প্রশাসন), সব বিভাগীয় পরিচালক, সব জেলার সিভিল সার্জন উপস্থিত ছিলেন। সভায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অনুমোদনক্রমে সাতটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

সিদ্ধান্তসমূহ : বন্যা আক্রান্ত সব উপজেলা, জেলা এবং বিভাগীয় পর্যায়ে ফোকাল পারসন মনোয়ন প্রদান করতে হবে। ফোকাল পারসন কন্ট্রোল রুম এবং অধিদপ্তরের সঙ্গে সার্বক্ষণিক সমন্বয় রক্ষা করবেন। প্রয়োজনীয় যোগাযোগ ও সমন্বয়ের জন্য ফোকাল পারসনের মোবাইল নম্বর সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও ব্যক্তিদের সরবরাহ করতে হবে। বন্যাদুর্গত জনগোষ্ঠীর জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সদস্যদের সমন্বয়ে বন্যা আক্রান্ত সব উপজেলা ও জেলায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক মেডিকেল টিম গঠন করতে হবে। বন্যাদুর্গতদের জরুরি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের লক্ষ্যে গৃহীত সব কার্যক্রম সম্পর্কে ফোকাল পারসন নিয়মিত প্রেস ব্রিফিং, প্রেস নোট প্রদানের মাধ্যমে গণমাধ্যমকে অবহিত করবেন। আজ বন্যাদুর্গতদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের লক্ষ্যে গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে অবহিতকরণের জন্য জরুরি প্রেস ব্রিফিং আয়োজন করতে হবে।

বন্যা আক্রান্ত সব উপজেলায় জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের জন্য সব ধরনের জরুরি ওষুধ, ওআরএস/স্যালাইন এবং পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটের পর্যাপ্ত মজুত ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। বন্যা আক্রান্ত সব উপজেলায় সাপের কামড়ে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা প্রদানের জন্য পর্যাপ্ত অ্যান্টি-স্নেক ভেনম মজুত রাখতে হবে। প্রয়োজনে পার্শ্ববর্তী স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান থেকে সমন্বয়ের মাধ্যমে সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। বন্যা আক্রান্ত সব উপজেলায় গর্ভবতী মহিলা ও শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রযোজনীয় ক্ষেত্রে সরকারি ব্যবস্থাপনায় প্রসূতিকে হাসপাতালে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করতে হবে। বন্যা আক্রান্ত সব উপজেলা এবং জেলায় নিরবচ্ছিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য সব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসক, নার্স, মিডওয়াইফ এবং অন্যান্য সব কর্মচারীর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।

পাহাড়ে আরও ভূমি ধসের শঙ্কা ছয় বিভাগে অব্যাহত থাকতে পারে ভারী বৃষ্টি : সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দেশজুড়ে আজসহ পাঁচ দিন বৃষ্টির দাপট অব্যাহত থাকতে পারে। এর মধ্যে প্রথম তিন দিন ঢাকাসহ দেশের ছয় বিভাগে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। এর জেরে কক্সবাজার, বান্দরবান, চট্টগ্রামসহ পার্বত্য জেলাগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় ভয়াবহ ভূমিধস বা পাহাড় ধসের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। পরে বৃষ্টির বিস্তার কিছুটা কমলেও দেশের অধিকাংশ এলাকায় বর্ষণ অব্যাহত থাকবে।

গতকাল সন্ধ্যায় প্রকাশিত আবহাওয়া অধিদপ্তরের ১২০ ঘণ্টার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আজ রংপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে। অন্যদিকে দেশের প্রায় সব বিভাগেই মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। ১৩ জুলাই ভারী বৃষ্টির কেন্দ্র কিছুটা সরে গিয়ে রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও খুলনা বিভাগে কেন্দ্রীভূত হতে পারে। একই সময়ে চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগেও অনেক জায়গায় বৃষ্টি হবে, যদিও সেখানে অতিভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা তুলনামূলক কম। ১৪ ও ১৫ জুলাই দেশের আট বিভাগেই অনেক জায়গায় বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। তবে এ দুই দিনে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির বিস্তার আগের তুলনায় কিছুটা কম হবে। তবু বিচ্ছিন্নভাবে ভারী বর্ষণের আশঙ্কা থাকবে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে মাঝারি অবস্থায় রয়েছে। এ কারণেই আগামী কয়েক দিন বৃষ্টিপাতের অনুকূল পরিস্থিতি বজায় থাকবে।

আবহাওয়াবিদদের মতে, টানা কয়েক দিনের এই বৃষ্টিতে পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস, নগরাঞ্চলে জলাবদ্ধতা এবং উত্তর-পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলের নদনদীর পানি দ্রুত বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে সিলেট, চট্টগ্রাম, পার্বত্য অঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলের নিচু এলাকায় বসবাসকারীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। স্বল্প সময়ে অতিভারী বৃষ্টির কারণে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে ভূমি ধসের প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। প্রশাসনকে এরই মধ্যে পাহাড়ের পাদদেশে ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

বিভিন্ন স্থান থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো আরও খবর-

চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামে প্রতি বছর পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটলেও সারা বছর উদাসীন থাকে প্রশাসন। কেবল বর্ষা এলেই তদারকি সংস্থাগুলোর তৎপরতা দেখা যায়। ২০০৭ সালের জুন মাসে এক রাতে পাহাড় ধসে ১২৭ জনের প্রাণহানির পর পাহাড় রক্ষণাবেক্ষণ ও ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে ৩৬ দফা সুপারিশ তৈরি করা হয়। কিন্তু গত দেড় যুগে প্রতি বছর গড়ে ১৩ জন মানুষের প্রাণহানি হলেও এসব সুপারিশ আজও বাস্তবায়িত হয়নি। এখনো ঝুঁকি নিয়ে লক্ষাধিক মানুষ পাহাড়ে বাস করছে।

পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যসচিব চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল সৈকত বলেন, বৃষ্টির শুরু থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে। পুনর্বাসন কেন্দ্রও খোলা হয়েছে। পরবর্তী বৈঠকে করণীয় ঠিক করা হবে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল সরোয়ার বলেন, ‘ধসের জন্য কেবল বৃষ্টি ও প্রকৃতি দায়ী নয়। এর পেছনে মনুষ্যসৃষ্ট কারণও আছে। পাহাড় কাটা, বৃক্ষনিধন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন, পাহাড়ের সঠিক ব্যবস্থাপনা না করাসহ নানা কারণে ধসের ঘটনা ঘটছে। তবে সুপারিশগুলো বাস্তবায়িত হলে অন্তত ক্ষয়ক্ষতি কমে আসবে।’

কক্সবাজার : জেলার উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ কয়েকটি উপজেলার পাহাড়ে চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে মানুষ। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, পাহাড় ধসের এই মারাত্মক ঝুঁকিতে এখন চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে কক্সবাজারের ১ লাখেরও বেশি মানুষ। এর মধ্যে উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন রোহিঙ্গা শিবিরের খাড়া পাহাড়ের ঢালে প্রায় ৮০ হাজার শরণার্থী অত্যন্ত বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে।

অন্যদিকে কক্সবাজার পৌরসভা, সদর, রামু, পেকুয়া, চকরিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় আরও ২০ থেকে ২৫ হাজার বাসিন্দা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করছে, যাদের জীবন এই মুহূর্তে চরম হুমকির মুখে।

সিলেট : টানা বৃষ্টিপাতে সিলেটে টিলা ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জেলা প্রশাসন থেকে ১৬০টি টিলাকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। টিলা ধসে প্রাণহানি ঠেকাতে জেলা প্রশাসনের নির্দেশে সংশ্লিষ্ট এলাকায় মাইকিং করা হচ্ছে। লাল কাপড় টাঙিয়ে টিলাগুলোকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। জানা গেছে, সিলেট সদর, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট, গোলাপগঞ্জ, বিয়ানীবাজার ও ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় ঝুঁকিপূর্ণ টিলার সংখ্যা বেশি। অবৈধভাবে টিলা কেটে পাদদেশে বাসাবাড়ি তৈরি করায় মাটি ধসে প্রাণহানির শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

শেরপুর : তিন দিনের টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার সীমান্ত সড়কের বালিজুরি গলাচিপা নামক স্থানের পাহাড় ধস হয়েছে। এতে বেশ কিছু গাছের ক্ষতি হয়েছে। সাময়িকভাবে যান চলাচল ব্যাহত হয়। তবে গতকাাল সন্ধ্যায় এ খবর লেখা পর্যন্ত স্থানীয় বন বিভাগ গাছ কেটে সাময়িকভাবে চলাচল উপযোগী করেছে। কিন্তু রাস্তার ওপর প্রচুর কাদামাটি থাকায় চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন।