অবসরপ্রাপ্ত কলেজশিক্ষক কবির হোসেন। বয়স একষট্টি বছর। ছেলেমেয়ে ছয়জন। পড়াশোনা শেষ করে সবাই এখন চাকরিজীবী। আটজনের সংসারে উপার্জন করছেন সাতজনই। পরিবারের আর্থিক উন্নতি এখন চোখে পড়ার মতো। কিন্তু এই সুখের দিন থাকবে না বেশি দিন। বড়জোর ১৫ থেকে ২০ বছর। এরপরই বদলে যাবে চেনা চিত্রটি। পরিবারের সদস্যদের বড় অংশই পা দেবেন বার্ধক্যে। কর্মক্ষম মানুষগুলো হয়ে পড়বেন অন্যের ওপর নির্ভরশীল।
কবির হোসেনের সংসার যেন আজকের বাংলাদেশ। দেশ এখন যাচ্ছে ‘ডেমোগ্রাফিক ট্রানজিশন’ বা জনসংখ্যাগত রূপান্তরের মধ্য দিয়ে। মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই এখন কর্মক্ষম। যাকে বলা হয় ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিক লভ্যাংশ। কোনো একটি দেশের জনসংখ্যার জন্ম ও মৃত্যুহার কমে গেলে জনসংখ্যার বয়স-কাঠামোতে যে পরিবর্তন আসে এবং এর ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিতের সুযোগ সৃষ্টি হয়, তাকে বলা হয় ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড। সাধারণত ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সীদের ধরা হয় কর্মক্ষম। অর্থাৎ, যখন একটি দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী (সাধারণত ১৫-৬৪ বছর বয়সী) নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর (০-১৪ বছর বয়সী শিশু এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সী প্রবীণ) তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হয়, তখন সম্ভাবনা তৈরি হয় দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির।
জনমিতিক লভ্যাংশের সময়সীমা শেষ হলেই বাড়বে নির্ভরশীল গোষ্ঠীর সংখ্যা। যদিও বাস্তব চিত্র হচ্ছে, এখনো কর্মক্ষম বয়সের বড় একটি অংশ রয়েছে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের বাইরে। তবে এখনো সঠিক এবং বাস্তবসম্মত নীতি দ্রুততার সঙ্গে গ্রহণ করলে জনমিতিক লভ্যাংশের সুফল মিলবে কিছুটা, তা না হলে উল্টো এই বিপুল জনগোষ্ঠী পরিণত হবে জনমিতিক বোঝায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ বিললাল হোসেন আগামীর সময়কে বলছিলেন, জনমিতিক লভ্যাংশের সুফল পেতে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানে যুক্ত করার পাশাপাশি নিশ্চিত করতে হবে তাদের সুস্বাস্থ্য। পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকৌশল ও সুশাসন অত্যন্ত জরুরি। জনমিতিক লভ্যাংশের কারণে সুফল পাওয়ার সুযোগ এরই মধ্যে অনেকটাই হাতছাড়া হয়ে গেছে। তবে এখনো কিছু সময় অবশিষ্ট রয়েছে। সেটি শতভাগ কাজে না লাগানো গেলে নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর চাপে পিষ্ট হবে দেশ।
বন্ধের পথে সুযোগের জানালা
দুনিয়া জুড়ে ডেমোগ্রাফি এবং উন্নয়ন অর্থনীতির অন্যতম গ্রহণযোগ্য বই হচ্ছে ‘দ্য ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড: এ নিউ পারসপেকটিভ অন দ্য ইকোনমিক কনসিকোয়েন্সেস অব পপুলেশন চেইঞ্জ’। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ ডেভিড ব্লুম, ডেভিড ক্যানিং এবং জেপি সেভিয়ার লেখা যুগান্তকারী গবেষণাধর্মী এ বইয়ের তথ্য বলছে, ১৯১১ সালে এই ভূখণ্ডে ১০০ কর্মক্ষম মানুষের ওপর নির্ভরশীল ছিল ৮৮ জন মানুষ। এরপর ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে নির্ভরশীলতার হার। তবে ১৯৭১ সালে দেশ একটি যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যায় এবং অনেক কর্মক্ষম মানুষ শহীদ এবং আহত হয়। তখন শত বছরের মধ্যে নির্ভরশীলতার হার সর্বোচ্চ ছিল ১১৬। এরপর আবার কমতে শুরু করে ২০২১ সালে ৫০-এ দাঁড়ায়। সর্বশেষ তথ্য বলছে, ২০২২ সাল থেকে কমতে শুরু করে নির্ভরশীলতার হার। সরকারের জনশুমারি ও গৃহগণনা জরিপেও উঠে এসেছে একই ধরনের চিত্র।
জনসংখ্যাবিদরা বলছেন, দেশে প্রথম জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল আশির দশকের পর থেকে, যা আর কয়েক বছরের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কাঠামো ন্যাশনাল ট্রান্সফার অ্যাকাউন্টসের তথ্য বলছে, ২০৩৬ সালের মধ্যেই প্রথম ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা অর্জনের সুযোগ রয়েছে। এরপর থেকে নির্ভরশীলতার হার বাড়তে থাকবে। তবে বিশ্বজনসংখ্যার সম্ভাব্য প্রবণতা: ২০০৪ সালের সংশোধিত সংস্করণের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে নির্ভরশীলতার হার সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছাবে ২০৪৫ সালে।
গবেষকরা বলছেন, কর্মক্ষম বিরাট জনগোষ্ঠী থাকার পরও মোটাদাগে কয়েকটি কারণে জনমিতিক লভ্যাংশের সুফল ভোগ করতে পারছে না বাংলাদেশ। সেগুলো হচ্ছে— যুব বেকারত্বের হার জাতীয় গড়ের তুলনায় অনেক বেশি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি ও সাক্ষরতার হার বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে, তবে শিক্ষার মান পৌঁছায়নি প্রত্যাশিত পর্যায়ে। নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ পুরুষদের তুলনায় এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে কম। মানবসম্পদ উন্নয়নে অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ, দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি এবং অসংক্রামক রোগের বাড়তি বোঝা কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর উৎপাদনশীলতা ও সুস্থতা কমিয়ে দিচ্ছে। সঞ্চয় ও বিনিয়োগের হারও কম।
বাংলাদেশ জনমিতিক লভ্যাংশের সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হলে কমে যাবে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি। পাশাপাশি বেকারত্ব আরও বাড়বে, প্রবীণ জনগোষ্ঠীর চাপ বাড়বে। বিপুল এই জনগোষ্ঠীর দেখভালে সরকারকে ব্যয় বাড়াতে হবে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে, স্বাস্থ্য খাতে খরচ বাড়বে পরিবারের। এর পাশাপাশি বাড়বে দারিদ্র্য ও বৈষম্য, সামাজিক অস্থিরতা এবং অপরাধের মাত্রাও বাড়বে আরও।
জনসংখ্যাবিদ অধ্যাপক বিললাল হোসেনের মতে, জনমিতিক সুযোগের সুফল অর্জনের জন্য জনমিতিক পরিবর্তন সরকারের রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের শীর্ষে থাকা উচিত। এ ছাড়া প্রবীণ জনগোষ্ঠীর চাপ সামলাতে আয়-নিরাপত্তা, বৃদ্ধাশ্রম, বয়সবান্ধব অবকাঠামো, জেরিয়াট্রিক (প্রবীণ) স্বাস্থ্যসেবার মানসম্মত ব্যবস্থার পাশাপাশি দরকার নীতিগত প্রস্তুতিও।