Image description

নির্বাচনি প্রতিপক্ষকে সরিয়ে দিতে হত্যার ছক এঁটে পরে বিদেশে বসে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়। এর পর হত্যার ঘটনাকে সাজানোর চেষ্টা করা হয় সড়ক দুর্ঘটনা হিসেবে। কিন্তু পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তে বেরিয়ে আসে হত্যার নেপথ্যের চাঞ্চল্যকর তথ্য। হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন ২০২১ সালের নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার লোচনপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রার্থী ওমর ফারুক মোল্লা। সে বছর তার নির্বাচনি প্রতিপক্ষ শাহান শাহ আলম বিপ্লবকে হত্যার পর দেশে ফিরে নির্বাচনেও অংশ নেন তিনি। কিন্তু ঘটনাটিকে প্রথমে সড়ক দুর্ঘটনার মামলা হিসেবে নেওয়া হলেও পরে হত্যা মামলা করেন নিহতের ভাই সোহাগ মিয়া। সেই মামলা হওয়ার পর সৌদি আরবে পালিয়ে যান ওমর ফারুক; সেই থেকে আর দেশে ফেরেননি তিনি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র এবং নিহতের পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বিপ্লবকে সরিয়ে দিতেই এ হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। আর ওই হত্যাকাণ্ডকে আড়াল করতে পুরো ঘটনাকে সাজানো হয় একটি সড়ক দুর্ঘটনা হিসেবে।

পিবিআই জানায়, বিপ্লব ২০১৬ সালের লোচনপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হয়েছিলেন। সে সময় বিপ্লবের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেন ওমর ফারুক মোল্লা। পরে ২০২১ সালের নির্বাচনে ওমর ফারুক মোল্লা নিজেই চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেন। একই গ্রামে পাশাপাশি বাড়ির বাসিন্দা হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই দুজনের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামাজিক আধিপত্য নিয়ে বিরোধ ছিল। ওমর ফারুক আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে এবং বিপ্লব বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এলাকায় কার প্রভাব বেশি, কোন অনুষ্ঠানে কাকে অতিথি করা হবে, কে কাকে দাওয়াত দিল বা দিল না—এসব বিষয় নিয়েও তাদের বিরোধ ক্রমেই তীব্র হতে থাকে। এর পর ২০২১ সালে লোচনপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সামনে রেখে বিপ্লবকে নির্বাচনি প্রতিপক্ষ হিসেবে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন ওমর ফারুক।

তদন্তে জানা যায়, হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনার পর ওমর ফারুক বিদেশে চলে যান। বিদেশ থেকেই পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন এবং অর্থের জোগান দেন। এ কাজে তিনি ব্যবহার করেন বিপ্লবের সাবেক কর্মচারী মামুনকে। বিপ্লবের ডিশ ব্যবসায় কাজ করার সময় অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে চাকরি হারিয়ে অপমানিত হওয়ায় মামুনও প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ খুঁজছিল। ওমর ফারুকের দেওয়া টাকায় মামুনের নেতৃত্বে কয়েক দফা বিপ্লবকে হত্যার চেষ্টা করা হলেও সেগুলো সফল হয়নি।

পিবিআই জানায়, ২০২১ সালের ১২ আগস্ট বিপ্লব নরসিংদী আদালতে কাজ শেষে মোটরসাইকেলে শ্বশুরবাড়ি ফিরছিলেন। সেদিন প্রথমে আদালত ও এর সংলগ্ন পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের আশপাশে চাপাতি ও ছুরি নিয়ে ওত পেতে ছিল হত্যাকারীরা। কিন্তু বিপ্লবের সঙ্গে সময় মিলিয়ে আক্রমণ করতে না পারায় ওই পরিকল্পনা পরিবর্তন করা হয়। পরে একটি নোয়া মাইক্রোবাস নিয়ে মোটরসাইকেলের পিছু নেয় তারা। প্রথমবার ধাক্কা দিয়ে হত্যার চেষ্টা ব্যর্থ হলে কিছুদূর গিয়ে আবারও জোরে ধাক্কা দেওয়া হয়। এতে মোটরসাইকেলের চালক মনির ও আরোহী বিপ্লব ছিটকে পড়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন। ধাক্কা দেওয়ার পর মাইক্রোবাসটির সামনের অংশ ভেঙে রাস্তার পাশে আটকে গেলে আসামিরা গাড়িটি ফেলে পালিয়ে যায়।

ওই হত্যার পর একে সাধারণ সড়ক দুর্ঘটনা হিসেবেই দেখা হয়। নিহতদের স্বজনরাও প্রথমে মামলা করতে আগ্রহী হননি। পরে ইটাখোলা হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির নায়েক মো. সাফায়েত হোসেন বাদী হয়ে নরসিংদীর শিবপুর মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা মাইক্রোবাসের চালকের বিরুদ্ধে সড়ক পরিবহন আইনে মামলা করেন।

ময়নাতদন্তকারী তিন সদস্যের মেডিকেল বোর্ড আঘাতজনিত অভিঘাত ও রক্তক্ষরণে মৃত্যুর কথা উল্লেখ করলেও প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলে যে, এটি দুর্ঘটনা নাকি হত্যাকাণ্ড—সেই সিদ্ধান্ত তদন্তে পাওয়া পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে। কিন্তু হাইওয়ে পুলিশ ঘটনাটিকে সড়ক দুর্ঘটনাই ধরে নিয়ে তদন্ত চালায়। প্রায় তিন মাস তদন্ত শেষে তারা মাইক্রোবাসের চালকের পরিচয় শনাক্ত করে তার বিরুদ্ধে সড়ক পরিবহন আইনে অভিযোগপত্র দাখিল করে।

এদিকে ঘটনার কিছুদিন পর নিহত বিপ্লবের ভাই সোহাগ মিয়া আদালতে একটি সিআর মামলা করেন। প্রথমে আদালত জিআর মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আসা পর্যন্ত সিআর মামলাটি স্থগিত রাখেন। পরে হাইওয়ে পুলিশ সড়ক দুর্ঘটনার অভিযোগপত্র দিলে বাদী নারাজি আবেদন করেন। এরপর আদালত সিআর মামলাটি জিআর মামলার সঙ্গে সংযুক্ত করে অধিকতর তদন্তের দায়িত্ব দেয় পিবিআই নরসিংদীকে।

পিবিআই তদন্ত শুরু করার পর মামলার চিত্র পাল্টে যেতে থাকে। তদন্তকারীরা মাইক্রোবাস চালকের মোবাইল ফোনের কল ডিটেইলস (সিডিআর), ঘটনার সময়কার মোবাইল টাওয়ারের তথ্য, আসামিদের পারস্পরিক যোগাযোগ এবং অন্যান্য ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণ করে মাইক্রোবাসে থাকা অন্য আসামিদেরও শনাক্ত করেন। পরে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে তিনজন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

তদন্তে জানা যায়, শুরুতে ওমর ফারুককে কেবল অর্থের জোগানদাতা হিসেবে দেখা হচ্ছিল। কারণ ঘটনার সময় তিনি বিদেশে ছিলেন। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত, মোবাইল ফোনের তথ্য, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং আসামিদের জবানবন্দি বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হওয়া যায়, পুরো হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী ছিলেন ওমর ফারুক নিজেই। বিদেশে বসেই তিনি হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন, অর্থায়ন করেন, সহযোগীদের দায়িত্ব ভাগ করে দেন। তদন্তের শেষ পর্যায়ে তিনিই এ হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে চিহ্নিত হন।

তদন্তে আরও জানা যায়, হত্যাকাণ্ডে ওমর ফারুক মোল্লা, মামুন, মাইক্রোবাসের মালিক মাসুম মিয়া, চালক কাওসার, মাসুদ মিয়া, সোহাগ মিয়া, পায়েলসহ মোট ১০ জন জড়িত ছিলেন। তবে মামুন তার ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে প্রকৃত সহযোগীদের কয়েকজনের নাম গোপন রেখে ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে তিনজন নিরপরাধ ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেন। পিবিআই তাদের অবস্থান, ঘটনার সময়কার অবস্থান এবং বিরোধের কারণ যাচাই করে নিশ্চিত হয়, তারা হত্যাকাণ্ডে জড়িত নন। পরে ওই তিনজনকে অভিযোগপত্র থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

দীর্ঘ দুই বছরের তদন্ত শেষে পিবিআই আগের দেওয়া সড়ক পরিবহন আইনের অভিযোগ বাতিল করে ওমর ফারুকসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১০৯, ৩০২ ও ৩৪ ধারায় ২০২৩ সালের ২৪ জুন সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করে।

নিহত বিপ্লবের ভাই সোহাগ মিয়া কালবেলাকে বলেন, ২০২১ সালের নির্বাচন যেন আমার ভাই না করতে পারে, সে জন্যই তাকে হত্যা করা হয়। প্রথমে আমরাও ভেবেছিলাম এটি সড়ক দুর্ঘটনা। কিন্তু পরে সন্দেহ হওয়ায় ঘটনার প্রায় ছয় মাস পর হত্যা মামলা করি। এ হত্যা মামলার খবর পেয়েই ওমর ফারুক পালিয়ে সৌদি আরব চলে যান। এর পর থেকে তিনি আর দেশে আসেননি। তাদের পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যই বিদেশে থাকেন। আর অন্য যেসব আসামি আছে তারা কারাগারেই আছে শুনেছি।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আশরাফ আলী কালবেলাকে বলেন, এ মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো একটি পূর্বপরিকল্পিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডকে অত্যন্ত কৌশলে সড়ক দুর্ঘটনা হিসেবে সাজানো হয়েছিল। প্রাথমিক তদন্তে শুধু ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং দৃশ্যমান পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করায় হাইওয়ে পুলিশ রাজনৈতিক বিরোধ, নির্বাচনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং পূর্বশত্রুতার বিষয়গুলো গুরুত্ব দেয়নি। ফলে প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটিত হয়নি। পরে প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত, ডিজিটাল তথ্য-প্রমাণ ও স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে জানা যায় এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়।