দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে উপসচিব থেকে যুগ্মসচিব পদে ১৭৯ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। বিএনপি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর জনপ্রশাসনে এটাই সবচেয়ে বড় পদোন্নতির ঘটনা। কিন্তু এই পদোন্নতির আনন্দের মধ্যেই অনেকেই হয়েছেন হতাশ। তাদের দাবি, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অন্তত দেড় শতাধিক কর্মকর্তা পদোন্নতি থেকে বাদ পড়েছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে দুটি পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করে। এর মধ্যে দেশে কর্মরত ১৭২ জন উপসচিবকে যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতি দিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছে। তাদের সিনিয়র সচিবের কাছে সরাসরি বা ই-মেইলে যোগদানপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে। অন্য প্রজ্ঞাপনে বিদেশে বাংলাদেশের বিভিন্ন মিশনে কর্মরত আরও সাতজন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হলেও পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তাদের নিজ নিজ কর্মস্থলেই দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জানানো হয়েছে, ভবিষ্যতে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিরূপ তথ্য বা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে এই পদোন্নতির আদেশ সংশোধন কিংবা বাতিল করার অধিকার সরকার সংরক্ষণ করবে।
এই পদোন্নতির তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নিয়মিত পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিসিএস ২৫তম ব্যাচকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাচের ৯৪ জন কর্মকর্তা যুগ্মসচিব হয়েছেন। পাশাপাশি অতীতে বঞ্চিত বিসিএস ১৫তম ও ২০তম ব্যাচের একজন করে কর্মকর্তা পদোন্নতি পেয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত বিসিএস ২৪তম ব্যাচের ৪৬ জন কর্মকর্তা এবার তালিকায় জায়গা পেয়েছেন। এছাড়া অন্যান্য ক্যাডারের বিভিন্ন ব্যাচের আরও ৩৭ জন কর্মকর্তাও যুগ্মসচিব পদে উন্নীত হয়েছেন।
এবারের পদোন্নতির তালিকায় রয়েছেন ১০ জন জেলা প্রশাসক (ডিসি)। তারা হলেন ঢাকার জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম, পটুয়াখালীর মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী, গাজীপুরের মো. নুরুল করিম ভূঁইয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আবু ছালেহ মো. মুসা জঙ্গী, রাজশাহীর কাজী শহিদুল ইসলাম, নীলফামারীর মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান, টাঙ্গাইলের শরীফা হক, শরীয়তপুরের তাহসিনা বেগম, চট্টগ্রামের মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা এবং মাগুরার মোতাকাব্বীর আহমেদ। এছাড়া স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) এ বি এম ইফতেখারুল ইসলাম খন্দকারও যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছেন।
তবে এই পদোন্নতির তালিকা প্রকাশের পর জনপ্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে অসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বিসিএস ২৫তম ব্যাচের প্রায় ২০৪ জন কর্মকর্তা পদোন্নতির জন্য যোগ্য হলেও পদোন্নতি পেয়েছেন মাত্র ৯৪ জন। অর্থাৎ শতাধিক কর্মকর্তা বাদ পড়েছেন। একইভাবে বিসিএস ২৪তম ব্যাচের প্রায় ১৮০ জন বঞ্চিত কর্মকর্তার মধ্যে মাত্র ৪৬ জনের ভাগ্যে পদোন্নতি জুটেছে।
জানা গেছে, পদোন্নতি না পাওয়া কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ বিগত সরকারের সময়ে বিভিন্ন মন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) কিংবা জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই কারণেই তাদের এবার বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
এ নিয়ে ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন কয়েকজন পদোন্নিবঞ্চিত কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাদের অনেকেই বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একান্ত সচিব এবং বিভিন্ন জেলার জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী অনেক কর্মকর্তাই পদোন্নতি পেয়েছিলেন। তাহলে একই ধরনের দায়িত্ব পালন করায় এবার তাদের কেন বাদ দেওয়া হলো? তাদের ভাষায়, ‘বৈষম্য দূর করার প্রত্যাশা থেকেই তো গণ-অভ্যুত্থান হয়েছিল। কিন্তু যদি একই ধরনের বৈষম্য থেকেই যায়, তাহলে পরিবর্তনের সুফল কোথায়?’
তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এসব অভিযোগ মানতে নারাজ। মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যেসব কর্মকর্তা পদোন্নতির সব ধরনের যোগ্যতা পূরণ করেছেন, তাদেরই বিবেচনা করা হয়েছে। তবে যাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, বিভাগীয় মামলা রয়েছে কিংবা আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদ দীর্ঘায়িত করতে বিশেষ ভূমিকা রাখার অভিযোগ রয়েছে, তাদেরকে পদোন্নতির তালিকায় রাখা হয়নি।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে যুগ্মসচিবের অনুমোদিত পদ রয়েছে ৫০২টি। নতুন পদোন্নতির আগে এই পদে কর্মরত কর্মকর্তার সংখ্যা ছিল ৮৮৯ জন। নতুন ১৭৯ জন যুক্ত হওয়ায় সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৮ জনে, যা অনুমোদিত পদের দ্বিগুণেরও বেশি। ফলে পদোন্নতি পেলেও অধিকাংশ কর্মকর্তাকে আপাতত আগের কর্মস্থলেই ‘ইনসিটু’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা।
‘সরকারের উপসচিব, যুগ্মসচিব, অতিরিক্ত সচিব ও সচিব পদে পদোন্নতি বিধিমালা, ২০০২’ অনুযায়ী যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে ৭০ শতাংশ প্রশাসন ক্যাডার এবং ৩০ শতাংশ অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের বিবেচনায় নিতে হয়। এছাড়া উপসচিব হিসেবে কমপক্ষে পাঁচ বছরসহ সংশ্লিষ্ট ক্যাডারে ১৫ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা অথবা উপসচিব হিসেবে অন্তত তিন বছরসহ মোট ২০ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা থাকলে একজন কর্মকর্তা যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতির জন্য বিবেচিত হওয়ার সুযোগ পান।
গতকাল দৈনিক আগামীর সময়ে ‘সব যোগ্যতা আছে, পদোন্নতি নেই—কপালে ভাঁজ প্রশাসনের হাজার কর্মকর্তার’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের পর সচিবালয়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়। সংবাদ প্রকাশের দিন বিকেলেই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় দীর্ঘ প্রতীক্ষিত পদোন্নতির প্রজ্ঞাপন জারি করল।