Image description

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত নাম হলেও বাংলাদেশে আইরিন খানকে নিয়ে নতুন করে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। গত ৮ জুলাই সরকার তাঁকে নিউইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেয়। একই দিন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনে তাঁকে দায়িত্ব পালনকালে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা, বেতন-ভাতা ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথা জানানো হয়।

আইরিন জুবাইদা খান একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মানবাধিকারকর্মী। চার দশকের বেশি কর্মজীবনে তিনি জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরে ২১ বছর কাজ করেছেন। নেতৃত্ব দিয়েছেন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও আন্তসরকারি সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ল অর্গানাইজেশন বা আইডিএলওতে। ২০২০ সাল থেকে তিনি জাতিসংঘের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাবিষয়ক বিশেষ র‌্যাপোর্টিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

যুদ্ধের ছায়া পেরিয়ে উচ্চশিক্ষায়

আইরিন জুবাইদা খানের জন্ম ঢাকায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর পরিবার নিরাপত্তার জন্য তাঁকে উত্তর আয়ারল্যান্ডে পাঠায়। আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব বৈরুতের তথ্য অনুযায়ী, পরে তিনি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টারে আইন পড়েন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড ল স্কুল থেকে ১৯৭৯ সালে এলএলএম ডিগ্রি অর্জন করেন।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, তিনি পাবলিক আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার বিষয়ে বিশেষায়ন করেন। ১৯৭৯ সালে ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্টসে মানবাধিকারকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন আইরিন খান। পরের বছর, ১৯৮০ সালে যোগ দেন জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরে।

মাঠপর্যায় থেকে বৈশ্বিক নেতৃত্বে

ইউএনএইচসিআরে কাজ করার সময় সদর দপ্তর ও মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন আইরিন খান। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত তিনি তৎকালীন জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার সাদাকো ওগাতার জ্যেষ্ঠ নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন।

১৯৯৫ সালে ভারতে ইউএনএইচসিআরের মিশন প্রধান হন। ১৯৯৯ সালে কসোভো সংকটের সময় বর্তমান উত্তর মেসিডোনিয়ায় ইউএনএইচসিআর দলের নেতৃত্ব দেন তিনি। পরে ওই বছরই তাঁকে আন্তর্জাতিক সুরক্ষা বিভাগের উপপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

২০০১ সালের আগস্টে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সপ্তম মহাসচিব হন আইরিন খান। এর মধ্য দিয়ে তিনি সংস্থাটির প্রথম নারী, প্রথম এশীয় ও প্রথম মুসলিম মহাসচিব হন।

তাঁর নেতৃত্বে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের ক্ষেত্রেও অ্যামনেস্টির কাজের পরিধি বিস্তৃত হয়। নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধে অ্যামনেস্টির একটি বৈশ্বিক প্রচারাভিযান তৈরির প্রক্রিয়াও শুরু করেন তিনি। প্রচারাভিযানটি ২০০৪ সালের মার্চে শুরু হয়।

দায়িত্ব পালনকালে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইসরায়েল ও অধিকৃত ফিলিস্তিনি অঞ্চল, কলম্বিয়া, কঙ্গো, সুদানের দারফুর, নেপালসহ বিভিন্ন এলাকায় উচ্চপর্যায়ের মিশনে নেতৃত্ব দেন তিনি।

মানবাধিকারের লড়াইয়ে নতুন অধ্যায়

অ্যামনেস্টি ছাড়ার পরও মানবাধিকার ও আইনের শাসন নিয়ে কাজ চালিয়ে যান আইরিন খান।

২০১০ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর হিসেবে মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও জেন্ডার-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কাজ করেন আইরিন খান। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে তিনি স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক ল স্কুলে ভিজিটিং প্রফেসর ছিলেন।

২০২০ সালের ১ আগস্ট জাতিসংঘের মতামত ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারবিষয়ক বিশেষ র‌্যাপোর্টিয়ার হিসেবে দায়িত্ব নেন আইরিন খান। ১৯৯৩ সালে এই ম্যান্ডেট চালুর পর তিনিই প্রথম নারী, যিনি এই পদে দায়িত্ব পান।

মানবাধিকারে অবদানের জন্য ২০০৬ সালে সিডনি পিস প্রাইজ পান তিনি। তাঁর ‘দ্য আনহার্ড ট্রুথ: পভার্টি অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস’ বইটি সাতটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে।