Image description

Ali Ahmad Mabrur (আলী  আহমদ মাবরুর)

 
 
একদিন এক অভাবগ্রস্ত ব্যক্তি মহানবী সা. -এর কাছে এসে খাদ্যের আবেদন জানালেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সা. এর ঘরেও সেদিন অতিরিক্ত কোনো খাবার ছিল না। তখন তিনি সাহাবিদের উদ্দেশে বললেন, "তোমাদের মধ্যে কে আজ এই অতিথির মেহমানদারির দায়িত্ব নেবে?" সঙ্গে সঙ্গে প্রখ্যাত সাহাবি হযরত আবু তালহা (রা.) দাঁড়িয়ে গেলেন এবং অতিথিকে নিজের বাড়িতে নিয়ে এলেন।
বাড়িতে পৌঁছে তিনি স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, "ঘরে কি কোনো খাবার আছে?"
 
তার স্ত্রী বললেন, "শুধু এতটুকু খাবার আছে, যা একজন মানুষের জন্য যথেষ্ট। যদি অতিথিকে খাওয়াই, তাহলে আমরা এবং আমাদের সন্তানরা না খেয়েই থাকতে হবে।"
এক মুহূর্তের জন্যও আবু তালহা (রা.) দ্বিধা করলেন না। তিনি বললেন, "শিশুদের ঘুম পাড়িয়ে দাও। তারা যেন ক্ষুধার কষ্ট অনুভব না করে। তারপর খাবার অতিথির সামনে পরিবেশন করো।"
রাতের খাবারের সময় প্রদীপের আলো ম্লান করে দেওয়া হলো। এতে অতিথি বুঝতেই পারলেন না কী ঘটছে। আবু তালহা (রা.) নিজের হাতে খাবার খাওয়ার ভান করতে লাগলেন, যেন অতিথির মনে না হয় যে তিনি একাই খাচ্ছেন। অতিথি নিশ্চিন্তে পেট ভরে আহার করলেন, আর আবু তালহা (রা.) ও তাঁর পরিবার সেদিন না খেয়েই রাত কাটালেন।
 
পরদিন সকালে আবু তালহা (রা.) রাসূলুল্লাহ সা. -এর কাছে গেলে তিনি হাসিমুখে বললেন,
"গত রাতে তোমরা তোমাদের অতিথির সঙ্গে যে আচরণ করেছ, আল্লাহ তা'আলা তাতে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়েছেন।"
 
একটি ক্ষুধার্ত পরিবার নিজের প্রয়োজন বিসর্জন দিয়ে একজন অতিথিকে সম্মানিত করেছিল। ইসলামের ইতিহাসে আতিথেয়তা ও আত্মত্যাগের এটি এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
ইয়ারমুকের যুদ্ধের আত্মত্যাগের ঘটনাও আমরা সবাই জানি। হিজরির প্রথম যুগে সংঘটিত ইয়ারমুকের যুদ্ধ ছিল ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ। যুদ্ধ শেষে যুদ্ধক্ষেত্রে অনেক মুসলিম যোদ্ধা গুরুতর আহত অবস্থায় পড়ে ছিলেন। তাদের অনেকেই মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন। প্রচণ্ড রোদ, রক্তক্ষরণ এবং দীর্ঘ যুদ্ধের ক্লান্তিতে সবাই তীব্র পিপাসায় কাতর।
 
এমন সময় একজন আহত যোদ্ধার কাছে এক পাত্র পানি নিয়ে যাওয়া হলো। তিনি পানি হাতে নিয়েই পাশ থেকে আরেক আহত মুসলিমের কাতর আহাজারি শুনতে পেলেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
"আগে আমার সেই ভাইকে পানি দাও। তার প্রয়োজন আমার চেয়ে বেশি।"
 
পানি দ্বিতীয়জনের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো। কিন্তু তিনিও আরেকজনের দিকে ইশারা করে বললেন, "না, আগে তাকে দাও।"
এভাবে তৃতীয়জন, চতুর্থজন, পঞ্চমজন... প্রত্যেকেই নিজের পিপাসাকে উপেক্ষা করে অন্য ভাইকে অগ্রাধিকার দিলেন।
 
যখন পানি নিয়ে আবার প্রথম ব্যক্তির কাছে ফিরে আসা হলো, তখন দেখা গেল তিনি ইন্তিকাল করেছেন। দ্বিতীয়জনের কাছে যাওয়া হলো, তিনিও আর বেঁচে নেই। শেষ পর্যন্ত যাদের জন্য পানি ঘুরে বেড়িয়েছিল, তাদের প্রত্যেকেই শাহাদাত বরণ করেছিলেন। কিন্তু কেউ নিজের আগে পানি পান করেননি।
 
মানব ইতিহাসে আত্মত্যাগের এমন উজ্জ্বল ও হৃদয়বিদারক দৃষ্টান্ত খুব কমই দেখা যায়। মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়েও তারা নিজেদের নয়, বরং অন্য ভাইয়ের জীবনকেই বেশি মূল্য দিয়েছিলেন। কিন্তু আমরা এখন ক্রমাগতভাবে সবচেয়ে স্বার্থপর মানুষে পরিণত হচ্ছি। আর এই যে, বিবর্তন ঘটছে তা নিয়েও আমাদের খুব বেশি অনুভূতি এখন আর কাজ করছে না। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন। আমিন।