আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন (ইসি) আইন, বিধি ও নির্বাচন পরিচালনার বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় একগুচ্ছ পরিবর্তনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তবে ইসির প্রতি ভোটকক্ষে ভোটারের সংখ্যা ৫০ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ ইতোমধ্যেই কমিশনের মধ্যেই উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
বর্তমানে প্রতি ভোটকক্ষে ৪০০ জন ভোটার থাকলেও তা বাড়িয়ে ৬০০ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ প্রস্তাবে আপত্তি জানিয়েছেন ইসির কর্মকর্তারা। তাদের আশঙ্কা, এতে ভোটকেন্দ্রে দীর্ঘ সারি তৈরি হবে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভোটগ্রহণ শেষ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
সম্প্রতি কমিশনের এক বৈঠকে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ এ প্রস্তাব উত্থাপন করেন। কর্মকর্তারা বাস্তবায়নগত নানা জটিলতার কথা তুলে ধরলেও তিনি নিজের অবস্থানে অনড় থাকেন। তার যুক্তি, ভোটকক্ষে ভোটারের সংখ্যা বাড়ালে নির্বাচন পরিচালনার ব্যয় কমানো সম্ভব হবে।
পরে তিনি ভোটের সময়ও ৩০ মিনিট বাড়ানোর প্রস্তাব দেন। সে অনুযায়ী সকাল ৮টার পরিবর্তে সকাল সাড়ে ৭টায় ভোটগ্রহণ শুরু এবং বিকেল ৪টার পরিবর্তে সাড়ে ৪টায় শেষ করার কথা বলেন, যাতে বাড়তি ভোটারের চাপ সামাল দেওয়া যায়।
নির্বাচন কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা টাইমস অব বাংলাদেশ-কে জানিয়েছেন, এ ধারণার ভিত্তি ছিল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতা। ওই নির্বাচনে প্রতি ভোটকক্ষে ভোটারের সংখ্যা ৫০০ থেকে বাড়িয়ে ৬০০ করা হয়েছিল।
স্থানীয় নির্বাচনের বাস্তবতা ভিন্ন
তবে কর্মকর্তারা বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। সংসদ নির্বাচনে একটি মাত্র পদে ভোট দেওয়া হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একাধিক পদে ভোট দিতে হয়।
উদাহরণ হিসেবে তারা বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে একজন ভোটারকে চেয়ারম্যান, সাধারণ সদস্য এবং সংরক্ষিত নারী সদস্য—এই তিনটি পৃথক পদে ভোট দিতে হয়।
এ ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সাধারণত ভোটার উপস্থিতিও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় বেশি থাকে। ফলে প্রতি ভোটকক্ষে আরও বেশি ভোটার যুক্ত হলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে।
বর্তমানে স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিধিমালা অনুযায়ী, একটি পুরুষ ভোটকক্ষে সর্বোচ্চ ৪০০ জন ভোটার রাখা যায়। আর নারী ভোটকক্ষে সাধারণত ৩০০ থেকে ৩৫০ জন ভোটার থাকেন।
নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাশুদ বলেন, প্রতি ভোটকক্ষে ভোটারের সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়টি মূলত নির্বাচন ব্যয় কমানোর দৃষ্টিকোণ থেকেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘প্রতি ভোটকক্ষে ভোটারের সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়টি মূলত ব্যয় কমানোর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিবেচনা করা হচ্ছে।’
তিনি আরও জানান, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিষয়টি নিয়ে আরও আলোচনা হবে।
আরও বড় সংস্কার
ভোটগ্রহণ পদ্ধতিতে পরিবর্তনের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার নির্বাচনসংক্রান্ত আইন ও বিধিমালায় আরও বিস্তৃত সংস্কারের কাজ করছে নির্বাচন কমিশন।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীক ছাড়া অনুষ্ঠিত হবে। ফলে সব প্রার্থী স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
এ কারণে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে মোট ভোটারের এক শতাংশের স্বাক্ষর জমা দেওয়ার বর্তমান বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে কমিশন।
এ ছাড়া পলাতক ব্যক্তিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা এবং মনোনয়নপত্রের নিরাপত্তা জামানতের পরিমাণ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা চলছে।
আরেকটি প্রস্তাব হলো, দ্বৈত নাগরিকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ বন্ধ করা। বর্তমানে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দ্বৈত নাগরিকত্ব অযোগ্যতার কারণ হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমন কোনো বিধিনিষেধ নেই।
এ বিষয়ে কমিশনার আবদুর রহমানেল মাশুদ বলেন, ‘এটি সরকারের নীতিগত বিষয়। সরকার চাইলে এ ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।’
বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত বেসরকারি সংস্থার কর্মীদের ক্ষেত্রেও নতুন বিধিনিষেধ আনার কথা ভাবছে নির্বাচন কমিশন। প্রস্তাব অনুযায়ী, এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কেউ চাকরি ছাড়ার অন্তত এক বছর না পেরোলে নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না।
প্রার্থীদের তথ্য প্রকাশে আরও স্বচ্ছতা
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীদের জন্য হলফনামা বাধ্যতামূলক করার বিষয়েও আলোচনা করছে কমিশন।
প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রার্থীদের সম্পদ, দায়-দেনা, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং তাদের বিরুদ্ধে থাকা ফৌজদারি মামলার তথ্য হলফনামায় প্রকাশ করতে হবে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এসব তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বর্তমানে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
এ ছাড়া নির্বাচনী ব্যয়ের বর্তমান সীমা পর্যালোচনা করে তা সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে কি না, তাও বিবেচনা করছে কমিশন।
আইন সংশোধনের ক্ষমতা নেই ইসির
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার-সংক্রান্ত আইন সরাসরি সংশোধনের ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের নেই। প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের সুপারিশ সরকারকে জানানোই কমিশনের ভূমিকা।
এ লক্ষ্যে কমিশন ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছে এবং একটি খসড়া প্রস্তাব তৈরির নির্দেশ দিয়েছে।
কমিশনার আবদুর রহমানেল মাশুদ বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়নের ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের থাকলেও প্রার্থীর যোগ্যতা ও অযোগ্যতার মতো বিষয়গুলো আইনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
তিনি বলেন, ‘এসব ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংশোধনের উদ্যোগ মূলত সরকারকেই নিতে হবে। তবে নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে সুপারিশ দিতে পারে।’