Image description

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি আবারও বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখে। ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক যুদ্ধ শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকেই অস্থিতিশীল করেনি, বরং কয়েক দশকের পুরোনো যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি কৌশলগত সম্পর্কেও নতুন ফাটল সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে তেল, নিরাপত্তা ও সামরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা ওয়াশিংটন-রিয়াদ জোট এবার কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থানের বিপরীতে সৌদি আরব সংঘাত এড়িয়ে কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। মার্কিন সামরিক পরিকল্পনায় সৌদি আকাশসীমা ব্যবহারে অনীহা, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতিতে দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একই সময়ে চীন, রাশিয়া ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে সৌদি আরব বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের একক প্রভাবকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, সাত দশকের পুরোনো এই কৌশলগত জোট কি নতুন রূপ নিতে যাচ্ছে, নাকি মতপার্থক্য আরও গভীর হবে? ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হওয়া এই নতুন সমীকরণ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা এবং বিশ্ব রাজনীতির শক্তির ভারসাম্যকেও নতুনভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

সাত দশকের জোটে ফাটল
১৯৪৫ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট এবং সৌদি বাদশাহ আবদুল আজিজ ইবনে সৌদের ঐতিহাসিক বৈঠকের মধ্য দিয়ে দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপিত হয়। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে, আর সৌদি আরব বিশ্ব জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর সৃষ্ট উত্তেজনা, ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধ কিংবা ইয়েমেন সংকট- সব সময়ই সম্পর্ক নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। কিন্তু এবার ইরান যুদ্ধকে ঘিরে যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে, তা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভিন্ন। কারণ, এবার মতবিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দুই দেশের নিরাপত্তা কৌশল, আঞ্চলিক নেতৃত্ব এবং ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতি।

কেন অবস্থান বদলাল সৌদি আরব
একসময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ব্যক্তিগত সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিল। ট্রাম্পের প্রথম বিদেশ সফরও ছিল সৌদি আরবে। তাঁর জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে যুবরাজের সম্পর্কও ছিল অত্যন্ত উষ্ণ। কিন্তু ইরান যুদ্ধের পর সেই সম্পর্কেও দূরত্ব তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যুদ্ধ চলাকালে ট্রাম্প প্রকাশ্যেই যুবরাজকে নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেন। একই সময়ে সৌদি নেতৃত্বও মার্কিন প্রশাসনের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকাশ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করতে শুরু করে।

সম্পর্কের টানাপোড়েনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত পাওয়া যায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সফরে। তিনি বাহরাইন, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর করলেও সৌদি আরব সফরসূচিতে ছিল না।

যদিও পরে বাহরাইনে অনুষ্ঠিত বৈঠকের ফাঁকে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর বৈঠক হয়, তবুও সৌদি সফর বাদ যাওয়াকে কূটনৈতিক অঙ্গনে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়েছে।
সৌদি আরবের অবস্থান পরিবর্তনের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে- প্রথমত, ২০১৯ সালে আবকাইক তেল স্থাপনায় হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে প্রত্যাশিত সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখায়নি।
দ্বিতীয়ত, সৌদি নেতৃত্ব মনে করে, বড় ধরনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত নিজেদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়; অথচ উপসাগরীয় দেশগুলোকে যুদ্ধের মূল্য দিতে হয়।

তৃতীয়ত, বর্তমানে সৌদি আরব ‘ভিশন ২০৩০’ বাস্তবায়নে শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। যুদ্ধ শুরু হলে বিদেশি বিনিয়োগ, পর্যটন এবং শিল্পায়ন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এক সময় ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের অন্যতম প্রবক্তা ছিল সৌদি আরব। ইয়েমেন, সিরিয়া, লেবানন এবং ইরাকে ইরানের প্রভাব বিস্তার নিয়ে রিয়াদ দীর্ঘদিন ধরে উদ্বিগ্ন ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাত শুরু হওয়ার পর সৌদি নেতৃত্ব দ্রুত বুঝতে পারে, পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে উপসাগরীয় অঞ্চলই। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে সৌদি আরব জানে, যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি অচল হয়ে গেলে শুধু তাদের অর্থনীতিই নয়, পুরো বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে।

এছাড়া ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে যুদ্ধ শুরু হলে সৌদি আরবের তেল স্থাপনা, শিল্পাঞ্চল, সমুদ্রবন্দর এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সংঘাত নয়, বরং কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দেন।

‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নিয়ে মতবিরোধ
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর ইরানকে চাপে রাখতে এবং হরমুজ প্রণালিতে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর লক্ষ্যে একটি বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে এই পরিকল্পনাকে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি আরবের সামরিক ঘাঁটি, আকাশসীমা এবং লজিস্টিক সুবিধা ব্যবহারের অনুমতি চায়। কিন্তু সৌদি আরব এতে সম্মতি দেয়নি।
রিয়াদের আশঙ্কা ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানে সহযোগিতা করলে ইরান সরাসরি সৌদি ভূখণ্ডে পাল্টা হামলা চালাতে পারে। এমনকি দেশটির তেল উৎপাদন ও রপ্তানিও বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে। সৌদি আরবের এই অবস্থান ওয়াশিংটনের জন্য ছিল অপ্রত্যাশিত। কারণ, অতীতে প্রায় সব বড় সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র সৌদির সহযোগিতা পেয়েছে।

হরমুজ সংকট বদলে দিয়েছে সৌদির হিসাব
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথগুলোর একটি। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এবং বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
ইরান সাময়িকভাবে এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করার পর সৌদি নেতৃত্ব উপলব্ধি করে যে, বড় ধরনের সামরিক সংঘাত হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে উপসাগরীয় দেশগুলোই। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’-এ সৌদি আরব নিজেদের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি। রিয়াদের আশঙ্কা ছিল, এই অভিযান শুরু হলে ইরান সরাসরি সৌদি তেলক্ষেত্র, বন্দর এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা চালাতে পারে।

সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র‌্যাটনির ভাষায়, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার ঘটনাই উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা ভাবনায় মৌলিক পরিবর্তন এনে দিয়েছে। এখন তারা বুঝতে পারছে, শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করলে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

সেনা প্রত্যাহারের আলোচনা
ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সৌদি আরবে মার্কিন সেনা উপস্থিতি পুনর্মূল্যায়নের আলোচনা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে দেশটিতে মোতায়েন থাকা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সামরিক সম্পদ অন্যত্র স্থানান্তরের বিষয়ও বিবেচনায় রয়েছে।
তবে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এটি তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত নয়। বরং সৌদি আরবের অবস্থান পরিবর্তনের পর যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক কৌশল নতুন করে মূল্যায়ন করছে।

নতুন বাস্তবতার সূচনা
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো স্পষ্ট করে দিয়েছে, সৌদি আরব এখন আর আগের মতো এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে না। বরং জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে তারা বহুমুখী কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা কৌশল গ্রহণ করেছে। চীন, রাশিয়া, পাকিস্তান এবং আঞ্চলিক অন্যান্য শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার পাশাপাশি ইরানের সঙ্গেও সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছে রিয়াদ। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন শুধু যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি সম্পর্ক নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত ভারসাম্যকেই নতুন রূপ দিতে পারে।

বহুমুখী কূটনীতির পথে রিয়াদ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরব তাদের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে। আগে প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল থাকলেও এখন তারা বহুমুখী কৌশল গ্রহণ করেছে।

যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বুঝতে পেরেছেন, বর্তমান বিশ্বে কেবল একটি শক্তির ওপর নির্ভরশীল থাকা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই তিনি একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের নীতি গ্রহণ করেছেন। বিশেষ করে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন বিশ্বরাজনীতিতে আলোচনার জন্ম দেয়। বহু বছর ধরে বৈরিতায় থাকা দুই দেশের মধ্যে দূতাবাস পুনরায় চালু হওয়া শুধু কূটনৈতিক ঘটনা নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের নতুন বাস্তবতার প্রতীক। চীনের মধ্যস্থতায় ২০২৩ সালে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন ছিল সেই নীতির অন্যতম বড় উদাহরণ। এছাড়া পাকিস্তান, ভারত, রাশিয়া এবং অন্যান্য এশীয় দেশের সঙ্গেও অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়িয়েছে রিয়াদ।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতার মাধ্যমে সৌদি আরব স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, তারা এখন আর শুধু সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর না করে আলোচনার মাধ্যমে আঞ্চলিক সংকট সমাধানে আগ্রহী।

চীনের উত্থান, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ
চীন বর্তমানে সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা। একই সঙ্গে অবকাঠামো, প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং শিল্প খাতে বিপুল বিনিয়োগ করছে বেইজিং।
সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’ বাস্তবায়নে চীনের ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে রিয়াদ এখন ওয়াশিংটনের পাশাপাশি বেইজিংকেও কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে।
এ বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগের কারণ। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের যে একচ্ছত্র প্রভাব ছিল, চীনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক উপস্থিতি তা ধীরে ধীরে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।

রাশিয়ার সঙ্গে বাস্তববাদী সম্পর্ক
ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা বিশ্বের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও সৌদি আরব রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে। বিশেষ করে ওপেক প্লাস জোটের মাধ্যমে তেল উৎপাদন ও মূল্য নিয়ন্ত্রণে দুই দেশের সমন্বয় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় প্রভাব ফেলছে।
ওয়াশিংটন একাধিকবার তেল উৎপাদন বাড়ানোর আহ্বান জানালেও সৌদি আরব অনেক ক্ষেত্রে রাশিয়ার সঙ্গে সমন্বয় করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটিও যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি সম্পর্কে দূরত্ব বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

পাকিস্তান ও এশিয়ার দিকে নজর
চীন ও রাশিয়ার পাশাপাশি পাকিস্তান, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপানের সঙ্গেও অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াচ্ছে সৌদি আরব। বিশেষ করে পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক প্রশিক্ষণ, প্রতিরক্ষা শিল্প এবং গোয়েন্দা সহযোগিতা আগের তুলনায় আরও জোরদার হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দেওয়ার কৌশল নয়; বরং বিকল্প অংশীদার তৈরি করে জাতীয় নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা।

ট্রাম্প-বিন সালমান সম্পর্কেও শীতলতা
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে তাঁর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ আরব মিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যপ্রাচ্য নীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল সৌদি আরব। কিন্তু ইরান যুদ্ধের সময় দুই নেতার মধ্যে মতপার্থক্য প্রকাশ্যে চলে আসে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে একাধিক বারফোন করে অবস্থান পরিবর্তনের অনুরোধ জানান।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, বিশেষ দূত এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টারাও সৌদি নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু সৌদি আরব নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেনি। এতে ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। পরে হোয়াইট হাউসে সৌদি নীতিকে ঘিরে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয় এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি পুনর্মূল্যায়নের আলোচনা শুরু হয়।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, ইরানকে সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে কঠোর চাপে না রাখলে দেশটি পারমাণবিক কর্মসূচি আরও এগিয়ে নেবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাব বাড়াবে। তাই ওয়াশিংটনের কাছে সৌদি আরবের অনীহা শুধু একটি সামরিক পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার ঘটনা নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদারের অবস্থান পরিবর্তনের ইঙ্গিত।

মার্কিন নীতিনির্ধারকদের আশঙ্কা, সৌদি আরব যদি ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দূরে সরে যায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের প্রভাবও কমে যেতে পারে।

মার্কিন সামরিক কৌশলের পুনর্মূল্যায়ন
ইরান যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক উপস্থিতি নতুন করে মূল্যায়ন শুরু করেছে। পেন্টাগনের কর্মকর্তারা সৌদি আরবে মোতায়েন কিছু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যুদ্ধবিমান এবং সেনা মোতায়েনের প্রয়োজনীয়তা পুনর্বিবেচনা করছেন। যদিও এখনো বড় ধরনের সেনা প্রত্যাহারের কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি, তবুও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি ওয়াশিংটনের কৌশলগত বার্তা। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বোঝাতে চাইছে, নিরাপত্তা সহযোগিতা পারস্পরিক আস্থার ওপর নির্ভর করে।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারে প্রভাব
ইরান যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি সম্পর্কে টানাপোড়েনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ওঠানামা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি ভবিষ্যতে নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হয়, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতি আবারও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে। বাংলাদেশসহ জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্যও এটি উদ্বেগের বিষয়।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকটকে স্থায়ী বিচ্ছেদ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে শত শত বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তি, গোয়েন্দা সহযোগিতা, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান এবং জ্বালানি নিরাপত্তা এখনো দুই দেশকে পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল করে রেখেছে। তবে আগের মতো নিঃশর্ত অংশীদারিত্বের যুগ শেষ হয়েছে বলেও তারা মনে করেন। এখন সম্পর্ক হবে আরও বাস্তববাদী, স্বার্থভিত্তিক এবং পরিস্থিতিনির্ভর।

ভবিষ্যৎ কোন পথে
সামনের দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি সম্পর্কের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে ইরানকে ঘিরে পরিস্থিতির ওপর। যদি কূটনৈতিক সমাধান এগিয়ে যায়, তাহলে দুই দেশের মধ্যকার মতবিরোধও ধীরে ধীরে কমতে পারে। অন্যদিকে, নতুন করে বড় ধরনের সংঘাত শুরু হলে সৌদি আরব আবারও কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হবে- একদিকে ঐতিহাসিক মিত্র যুক্তরাষ্ট্র, অন্যদিকে নিজের জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ।

বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতের মধ্যপ্রাচ্যে একক কোনো শক্তির প্রভাব নয়, বরং বহুমেরুকেন্দ্রিক কূটনীতিই প্রাধান্য পাবে। সৌদি আরবও সেই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। সবশেষ বলা যায়, ইরান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এই যুদ্ধ শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করেনি; বরং বহু দশকের পুরোনো যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি সম্পর্ককেও কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে।

রিয়াদ এখন আর আগের মতো ওয়াশিংটনের প্রতিটি কৌশলগত সিদ্ধান্তে নিঃশর্ত সমর্থন দিচ্ছে না। বরং জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বহুমুখী কূটনৈতিক পথ বেছে নিচ্ছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রও বুঝতে পারছে যে মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতা বদলে গেছে। চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব, রাশিয়ার সক্রিয় উপস্থিতি এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ওয়াশিংটনের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি সম্পর্ক হয়তো ভেঙে যাবে না, কিন্তু এটি আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বার্থনির্ভর, ভারসাম্যপূর্ণ এবং বাস্তববাদী সম্পর্কে রূপ নেবে। মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ রাজনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে এই পরিবর্তনের প্রভাব দীর্ঘদিন ধরে অনুভূত হবে।

শীর্ষনিউজ