একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে, অন্যদিকে বিভিন্ন মাধ্যমে আবার বাজারে তারল্যও সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে মুদ্রানীতির কাঙ্ক্ষিত ফল মিলছে না।
একই সময়ে সংকুচিত হচ্ছে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ, কমছে বিনিয়োগ, কিন্তু মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশিত হারে কমছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ও সরবরাহব্যবস্থার সংকট।
এসব মিলিয়েই দেশের অর্থনীতি একটি দুষ্টচক্রে বা ভিসিয়াস সাইকেলে আটকে পড়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী।
সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মুদ্রানীতির কার্যকারিতা, মূল্যস্ফীতি, সরকারি ঋণ, ব্যাপক মুদ্রার প্রবৃদ্ধি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্বৃত্ত নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেন এই সাবেক অর্থসচিব এবং সাবেক মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি)। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন জাগো নিউজের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক সাঈদ শিপন।
জাগো নিউজ: রিজার্ভ মানি টার্গেট ও ব্যাপক মুদ্রার (এম-টু) লক্ষ্যমাত্রা কীভাবে নির্ধারণ করা হয়?
মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী: রিজার্ভ মানি টার্গেট এবং এম-টু বা ব্যাপক মুদ্রার লক্ষ্যমাত্রা মুদ্রানীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অর্থনীতিতে কত পরিমাণ অর্থ সরবরাহ থাকবে, সেটি নির্ধারণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচক বিশ্লেষণ করে।
এর মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি, সরকারি খাতের ঋণের চাহিদা, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের পরিস্থিতি, স্থানীয় বাজারে সম্ভাব্য প্রভাবসহ নানান বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়। আগে বছরে একবার মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হতো, এখন ছয় মাস পরপর তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
জাগো নিউজ: রিজার্ভ মানি টার্গেট নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় কী?
মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাস্তব অর্থনীতিতে কত পরিমাণ পণ্য ও সেবা উৎপাদিত হচ্ছে। সাধারণত, নামেমাত্র জিডিপির সঙ্গে একটি অনুপাত বিবেচনা করেই রিজার্ভ মানি ও ব্যাপক মুদ্রার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। অর্থনীতির উৎপাদনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অর্থ সরবরাহ থাকাই মূল উদ্দেশ্য।
জাগো নিউজ: বাস্তবে কি এই লক্ষ্যমাত্রা ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে?
মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী: সবসময় সম্ভব হয় না। বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি খুব কম। কিন্তু সরকারের ঋণের চাহিদা বেশি। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংককে সরকারকে ঋণ দিতে হচ্ছে। আবার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখতে বাজার থেকে ডলার কিনতে হচ্ছে। ডলার কেনার অর্থ হলো বাজারে নতুন টাকা ছাড়া। ফলে পরিকল্পনার বাইরে অতিরিক্ত তারল্য সৃষ্টি হয়।
জাগো নিউজ: এর প্রভাব মূল্যস্ফীতির ওপর কীভাবে পড়ে?
মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী: যদি অর্থনীতিতে পণ্য ও সেবার তুলনায় অর্থের পরিমাণ বেড়ে যায়, তখন অর্থনীতিতে ‘মানি চেইসিং টু ফিউ গুডসের (অল্প পণ্যের পেছনে বেশি অর্থ ধাওয়া করা)’ পরিস্থিতি তৈরি হয়। অর্থাৎ বেশি টাকা কম পণ্যের পেছনে ছুটতে থাকে। তখন স্বাভাবিকভাবেই মূল্যস্ফীতি বাড়ে।
জাগো নিউজ: বাংলাদেশ ব্যাংক তো এখন সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির কথা বলছে। তাহলে মূল্যস্ফীতি কেন কমছে না?
মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী: কারণ নীতিগত ঘোষণা আর বাস্তব পরিস্থিতি এক নয়। কাগজে-কলমে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি থাকলেও বাস্তবে বিভিন্ন উইন্ডোর মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে তারল্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
স্ট্যান্ডিং লোন ফ্যাসিলিটি আছে, আরও কয়েকটি ব্যবস্থা আছে। একই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রা কেনার কারণেও বাজারে নতুন টাকা যাচ্ছে। ফলে বাস্তবে অর্থ সরবরাহ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে থাকছে না।
জাগো নিউজ: তাহলে কি এটিই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার প্রধান কারণ?
মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী: এটি অন্যতম কারণ, তবে একমাত্র কারণ নয়। দীর্ঘদিন ধরে সংকোচনমূলক নীতি অনুসরণ করার পরও মূল্যস্ফীতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নামেনি। কারণ, মুদ্রানীতির পাশাপাশি আরও কিছু কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে।
জাগো নিউজ: সেই কাঠামোগত সমস্যাগুলো কী?
মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী: সরবরাহব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্য, চাঁদাবাজি এবং বাজারে শৃঙ্খলার অভাব। কৃষক যে পণ্য ১০ টাকায় বিক্রি করেন, সেটি ভোক্তাকে ৪০ টাকায় কিনতে হয়। এই ব্যবধান শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে দূর করা সম্ভব নয়। বাজারে শৃঙ্খলা আনতে হবে।
জাগো নিউজ: সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির কোনো নেতিবাচক দিকও কি রয়েছে?
মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী: অবশ্যই। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। ফলে বিনিয়োগ কমছে, শিল্প-কারখানার সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং বাস্তব অর্থনীতি চাপের মুখে পড়ছে। একদিকে মূল্যস্ফীতি কমছে না, অন্যদিকে বিনিয়োগও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অর্থনীতি এক ধরনের ভিসিয়াস সাইকেলে আটকে গেছে।
জাগো নিউজ: ব্যাপক মুদ্রার হিসাবে দেখা যাচ্ছে, মানুষের হাতে নগদের তুলনায় মেয়াদি আমানতের পরিমাণ অনেক বেশি। এটিকে কীভাবে দেখছেন?
মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী: এটি ইতিবাচক লক্ষণ। কারণ মানুষ যখন মেয়াদি আমানতে অর্থ রাখে, তখন সেই সঞ্চয় আনুষ্ঠানিক আর্থিক খাতে প্রবেশ করে। ব্যাংক সেই অর্থ আবার বিনিয়োগে ব্যবহার করতে পারে। অর্থাৎ সঞ্চয় উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
জাগো নিউজ: কিন্তু একই সময়ে তো অভিযোগ রয়েছে, বেসরকারি খাত পর্যাপ্ত ঋণ পাচ্ছে না।
মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী: সেটিই বাস্তবতা। কারণ, সরকারের ঋণগ্রহণ বেড়ে গেলে ব্যাংকের আমানতের একটি বড় অংশ সরকারি ঋণ অর্থায়নে চলে যায়। ফলে বেসরকারি খাত তুলনামূলকভাবে কম ঋণ পায়। এতে বিনিয়োগের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়।
জাগো নিউজ: বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি বছর যে লাভ করে, সেটিকে কীভাবে দেখা উচিত?
মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী: আমি এটিকে ব্যবসায়িক লাভ বলবো না। এটি মূলত উদ্বৃত্ত। বাংলাদেশ ব্যাংক একটি নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান। তার কোনো প্রতিযোগী নেই। মুদ্রা ইস্যুর ক্ষমতা থেকে যে আয় হয়, সেটিকে সিনিয়োরেজ বলা হয়। এছাড়া রিপো, রিভার্স রিপোসহ বিভিন্ন মুদ্রানীতি পরিচালনার কার্যক্রম থেকেও আয় হয়।
জাগো নিউজ: তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংকের লাভকে কি সাফল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই?
মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী: না, এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রমের অংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের শতভাগ মালিক সরকার। ফলে এই উদ্বৃত্ত শেষ পর্যন্ত সরকারের কাছেই যায় এবং এটি সরকারের নন-ট্যাক্স রাজস্ব হিসেবে যুক্ত হয়।
তাই কত লাভ হলো, সেটি বড় বিষয় নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো এই অর্থ যেন অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ে অপচয় না হয়ে সরকারের কোষাগারে জমা হয় এবং জনস্বার্থে ব্যবহৃত হয়।