Image description

এয়ারবাসের সঙ্গে পারা যায়নি। তারা লেগে ছিল। তাদের উড়োজাহাজও কিনতে হবে। শেষ পর্যন্ত সেই চাপ সামলে উঠতে পারেনি সরকার। এয়ারবাস থেকে চারটি উড়োজাহাজ কেনা হচ্ছে। তবে বোয়িংয়ের মতো এখানেও তাড়াহুড়া— ‘স্বল্পতম সময়ে’ চুক্তির তোড়জোড়।

প্রয়োজন না থাকার পরও এসব জাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র বাধ্য করেছে বোয়িং থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করতে। এবার করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। বিষয়টি জানাচ্ছিলেন সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা।

কীভাবে বাধ্য করল জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বললেন, ‘ইইউ এরই মধ্যে বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। গত মাসে বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার নিয়ে আলোচনার সময় তারা এ অভিযোগ জানায়। তাদের কাছ থেকে না কিনলে এসব অভিযোগ চলতেই থাকবে। তাদের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্যও অনেক। কাজেই চটানো যাবে না। আমাদের রপ্তানির প্রায় অর্ধেক সেখানে যায়। তাই দুপক্ষকেই খুশি করার কৌশলী রাস্তায় থাকতে হচ্ছে।’

সরকারের গ্রিন সিগন্যাল পেয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় বলেছে, এয়ারবাসের উড়োজাহাজ কিনতে হবে। বিমান বলেছে, ঠিক আছে। মন্ত্রণাদাতা মন্ত্রণা দিয়েছে, সে অনুযায়ী কাজ করছেন অধীনরা— এমনটাই জানাচ্ছিলেন ওই কর্মকর্তা।

গত ৯ জুন ছিল মন্ত্রণালয়ের সভা। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানমের সভাপতিত্বে সভায় সিদ্ধান্ত হয় এয়ারবাস থেকে চারটি A350-900 চওড়া কাঠামোর উড়োজাহাজ কেনার। স্বল্পতম সময়ে কেনার প্রক্রিয়া শেষ করার সিদ্ধান্তও সেখানেই। এতটাই তাড়াহুড়ো করা হচ্ছে যে, নতুন করে কোনো কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন কমিটি হবে না। এপ্রিল মাসে বোয়িং থেকে উড়োজাহাজ কেনার যে কমিটি ছিল, তারাই মূল্যায়নের কাজটি করবে। ১ শতাংশ সাইনিং মানির টাকাটা বিমানকেই দিতে হবে। আরও সিদ্ধান্তের মধ্যে কেনার এ অনুমোদন করিয়ে নিতে হবে বিমান পরিচালনা পর্ষদ থেকেই। সবশেষে সিদ্ধান্তেও তাড়াহুড়া রয়েছে। এয়ারবাস যে সময়সীমা উল্লেখ করেছে, তার সঙ্গে মিল রেখে কেনার কাজটি শেষ করবে বিমান।

৯ জুনের এ সিদ্ধান্ত পরদিনই কার্যবিবরণী আকারে বিমানে চলে যায়। ‘অবশ্য পালনীয় সিদ্ধান্ত’ পেয়ে তার পরদিনেই বৈঠকে বসে বিমান কর্তৃপক্ষ। সেখানেই সিদ্ধান্ত হয় পরিচালনা পর্ষদে তুলে অনুমোদন করিয়ে নেওয়ার। দু-এক দিনের মধ্যেই পর্ষদ সভা ডেকে অনুমোদন করিয়ে নেওয়া হবে। এরপর পাঠানো হবে মন্ত্রিসভা বৈঠকে। এর আগে বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি থেকে অব্যাহতি নিতে হবে। তাদের নিয়মানুযায়ী টেন্ডার ডাকার বাধ্যবাধকতা আছে। এয়ারবাসের উড়োজাহাজ কেনার প্রস্তাবটি সিঙ্গেল সোর্স প্রপোজাল। কারণ তারাই নির্মাতা, তারাই সরবরাহকারী। এখানে টেন্ডারের সুযোগ নেই।

কোন বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকার এয়ারবাসের উড়োজাহাজ কিনছে— জানতে চাওয়া হয়েছিল ৯ জুনের বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তার কাছে। তার কথা, ‘এটি সভার কার্যবিবরণীতেই আছে।’ সেখানে বলা হয়েছে, বিষয়টি শুধু বাণিজ্যিক বা আর্থিক বিবেচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং একসঙ্গে বাংলাদেশের বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থ গভীরভাবে সম্পৃক্ত। বিশেষত, বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাকশিল্পের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ (৫০-৫৫ শতাংশ) ইউরোপীয় বাজারে রপ্তানি হয়ে থাকে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের গভীরতা কৌশলগত গুরুত্বকে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করে। পাশাপাশি ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ও উন্নয়ন সহযোগিতা বিভিন্ন কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হওয়ায় এ অঞ্চলের প্রস্তাবগুলো সামগ্রিক কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা সমীচীন। সেক্ষেত্রে চারটি এয়ারবাস কেনার আলোচনা হয় এবং বোয়িংয়ের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির ক্ষেত্রে অনুসৃত প্রক্রিয়া অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত হয়।

কয়েক দশক ধরেই ঢাকার আকাশ দখলের প্রতিযোগিতা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান বোয়িং ও ফ্রান্স-জার্মানির নেতৃত্বাধীন এয়ারবাসের। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বেশি থাকায় বারবার পিছিয়ে পড়ে এয়ারবাস। যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে তাদের বিক্রি প্রস্তাব পাস করিয়ে নেয়। ২০০৭ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় দেশটি ১০টি উড়োজাহাজ বিক্রির চুক্তি করে বাংলাদেশের সঙ্গে। পরে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এসে তা বাস্তবায়ন করতে বাধ্য হয়। এবারও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বোয়িং থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। যার দাম প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। প্রতিটি উড়োজাহাজের দাম গড়ে ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এসব উড়োজাহাজ ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালে সরবরাহ করবে।

বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তির পর এয়ারবাস দৃশ্যত পিছিয়ে পড়লেও তারা লেগে ছিল। সরকারের বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত ধরনা দিয়েছে। নতুন করে দিয়েছে বিক্রির প্রস্তাব। এয়ারবাসের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রাফায়েল গোমেজ নোয়া বিমানমন্ত্রীর কাছে মে মাসে পাঠানো এক চিঠিতে জানিয়েছেন, তারা আবার আলোচনা শুরু করতে চান এবং এগিয়ে নিতে আগ্রহী।

এয়ারবাসের বিক্রি প্রস্তাব বিশ্লেষণে মিলেছে, প্রাথমিকভাবে চারটি দূরপাল্লার A350-900 উড়োজাহাজ বিক্রির পরিকল্পনা তাদের। উড়োজাহাজগুলো ২০৩৪ ও ২০৩৫ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে সরবরাহ হবে। প্রথমটি ২০৩৪ সালের জানুয়ারি-জুনে, দ্বিতীয়টি একই বছরের জুলাই-ডিসেম্বরে, তৃতীয়টি ২০৩৫ সালের জানুয়ারি-জুনে এবং চতুর্থটি একই বছরের জুলাই-ডিসেম্বরে। সব ছাড় সমন্বয়ের পর প্রতিটি উড়োজাহাজের সম্ভাব্য নিট মূল্য দাঁড়ায় ১৬ কোটি ৫০ লাখ ৮৫ হাজার ৫৫০ ডলার (প্রায় ১ হাজার ৯৮১ কোটি টাকা)। বোয়িংয়ের তুলনায় এয়ারবাসের দাম বেশি হলেও তারা ছাড় দিয়ে বাংলাদেশে নতুন করে প্রবেশ করতে চাইছে।

অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম আগামীর সময়কে বলেছেন, এয়ারবাস এবং বোয়িং দুটিই এয়ারক্রাফট ম্যানুফ্যাকচারিং প্রতিষ্ঠান। এখানে একটি কম্পিটিশন সবসময় থাকে। দুপক্ষই এখানে শক্তিশালী। আমাদের আন্ডার ডেভেলপড কান্ট্রিতে সাধারণত পরাশক্তি যারা আছে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন; তাদের তো একটা প্রভাব থাকেই আমাদের ওপর। তারা চাইবে তাদের কমার্শিয়াল ইন্টারেস্ট সার্ভ করতে। আমাদের স্বার্থ আমাদেরই দেখতে হবে।’

তিনি আরও বলছিলেন, ‘বর্তমান বহরের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত না করে নতুন বিনিয়োগে গেলে তা ভবিষ্যতে আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে, এত দীর্ঘমেয়াদি ডেলিভারি সময়সীমার ক্ষেত্রে ঝুঁকি থেকেই যায়।’