Image description

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে দেড় হাজারের বেশি মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ও স্থাপনায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। তবে এই ঘটনা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে বিতর্কিত করতেই ঘটানো হয়েছিল বলে দাবি করছেন বিভিন্ন রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষক। তাদের মতে, জুলাইয়ের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের স্থাপনা ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগের কোনো সম্পর্ক নেই। জুলাই আন্দোলন ছিল মুক্তিযুদ্ধেরই একটি অংশ এবং একে বিতর্কিত করার লক্ষ্যেই একটি গোষ্ঠী এ ঘটনাগুলো ঘটিয়েছে।

এ বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার স্ট্রিমকে বলেন, ‘জুলাইয়ের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ও স্থাপনায় ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের কোনো সম্পর্ক নেই। মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ও স্থাপনায় ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের অনেকগুলোই ছিল অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা। অর্থাৎ আন্দোলনটাকে বিতর্কিত করার জন্য অনেক ক্ষেত্রে এগুলো করা হয়েছে। আমরা মনে করি, এগুলোর তদন্ত হওয়া উচিত এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত ছিল, তা বের করা উচিত। এগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে বিতর্কিত করা।’

একই কথা জানিয়ে কবি ও চিন্তক মোহাম্মদ রোমেল বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থানের সময় বা এর কিছুদিন পর পর্যন্ত একধরনের অস্থিরতা চলছিল। আওয়ামী লীগ ফিরে আসবে—এমন নানা ধরনের গুজব, নানা ধরনের আন্দোলন দেখা যাচ্ছিল। সুতরাং ওইটার পরিপ্রেক্ষিতে যারা গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষে ছিল, তারা তো একটা প্রতিরোধের জায়গা থেকে অনেক কিছু করেছে। আর মুক্তিযুদ্ধের কিছু কিছু স্থাপনা তো উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অনেকে সাবোটাজ করার জন্য ভেঙেছে। সেটি পুরোপুরি আলাদা। কারণ জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে তো মুক্তিযুদ্ধের কোনো বিরোধ নেই। বরং মুক্তিযুদ্ধেরই ধারাবাহিকতা আসলে জুলাই।’

আর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি, লেখক ও গবেষক মফিদুল হকের মতে, জুলাই আন্দোলনের পর মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ও স্থাপনায় ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের বিচার করার সময় চলে এসেছে। এটি কেন ঘটল, সেটার জন্য তদন্তের প্রয়োজন।

অন্তর্বর্তী সরকারসহ একটি গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা দেখছেন কেউ কেউ

জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ভাঙচুরের কোনো সম্পর্ক না থাকলেও এর সঙ্গে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের একটি মহলের পরোক্ষ সমর্থন ছিল বলে মনে করেন লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফিরোজ আহমেদ। স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের মূল ধারার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ও স্থাপনায় ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের আসলে কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা বহু জায়গায় বরং এটা দেখব যে ব্যক্তিগতভাবে শেখ হাসিনার ভাস্কর্য ভেঙেছে, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের অন্যান্য ফলকগুলোকে অক্ষুণ্ণ রেখেছে। এরকম বহু জিনিস আমি দেখেছি। এই যে ব্যাপক হারে ভাঙচুর, এটার সঙ্গে জুলাইয়ের সম্পর্ক আমি দেখতে চাই না। দায়িত্ব ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের যে এটা যেন না হয়। অর্থাৎ কাকে শাস্তি দেব, কাকে রাখব, কোনটা রাখব—এই সিদ্ধান্তটা সরকারের নেওয়ার কাজ। এটা তার দঙ্গলবাজদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার কথা না। এটা ছেড়ে দিয়েছে মানে আমি ধরে নিই যে আসলে অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে একটা অংশ ছিল, যারা এটার সমর্থক ছিল।’

অন্যদিকে এসব ঘটনায় একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর পরোক্ষ সমর্থন ছিল বলে মনে করেন নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশনের (এনপিএ) সদস্য অনিক রায়। স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ‘জুলাইয়ের পরে আমরা লক্ষ করছি প্রচুর ভাস্কর্য ভাঙচুর হয়েছে। আমরা লক্ষ করছি মুক্তিযোদ্ধা-সংশ্লিষ্ট প্রচুর ভাস্কর্যে আগুন দেওয়া হয়েছে। এগুলো আসলে একটা উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী, যারা জুলাই আন্দোলনকে একটা ইসলামি বিপ্লব হিসেবে দেখাতে চেষ্টা করেছে, মূলত তাদের দ্বারা পরিচালিত কাজ। তাদের জন্য আসলে গত দুই বছর ধরে—এটি টানা একটি লম্বা সময়—নানাভাবে জুলাই আসলে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। কিন্তু জুলাইয়ের সঙ্গে আসলে মুক্তিযুদ্ধের কোনো দ্বিমত বা অন্য কোনো জায়গার সম্পর্কই নেই। বরং মুক্তিযুদ্ধ জুলাইয়ের জন্য অন্যতম একটা অনুপ্রেরণার জায়গা ছিল। এ ছাড়া জুলাই আন্দোলনের সময় বিভিন্ন গান বা বিভিন্ন বক্তব্য যেগুলো খুব জনপ্রিয় হচ্ছিল, সেগুলোর অধিকাংশ মূলত আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার বা মুক্তিযুদ্ধের আগে-পরে তৈরি করা গান। ফলে সেই জায়গা থেকে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে এটার কোনো খারাপ সম্পর্ক তো মূলত ছিলই না, এটি আসলে অনুপ্রেরণার জায়গা ছিল।’

দেড় হাজারের বেশি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত

২০২৪ সালের ২০ আগস্ট একটি জাতীয় দৈনিক সারা দেশে ভাঙা ভাস্কর্য ও ম্যুরাল নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাদের প্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৫ থেকে ১৪ আগস্টের মধ্যে ৫৯টি জেলায় ১ হাজার ৪৯৪টি ভাস্কর্য, রিলিফ ভাস্কর্য (সিরামিক বা টেরাকোটা দিয়ে দেয়ালে খোদাই করে ফুটিয়ে তোলা অবয়ব), ম্যুরাল ও স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও উপড়ে ফেলা হয়েছে। এসব ভাস্কর্য ও ম্যুরালের বেশির ভাগই ছিল শেখ মুজিবুর রহমান, স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক। এর বেশির ভাগই ভাঙচুর ও আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটেছে ৫, ৬ ও ৭ আগস্ট।

ওই প্রতিবেদন মতে, ১৪ আগস্টের মধ্যে ঢাকা মহানগর এলাকার ১৫টি স্থানে ১২২টির বেশি, ঢাকা বিভাগে ২৭৩টি, চট্টগ্রাম বিভাগে ২০৪, রাজশাহীতে ১৬৬, খুলনায় ৪৭৯, বরিশালে ১০০, রংপুরে ১২৯, সিলেটে ৪৯ ও ময়মনসিংহ বিভাগে ৯২টিসহ মোট ১ হাজার ৪৯২টি ভাস্কর্য, রিলিফ ভাস্কর্য, ম্যুরাল ও স্মৃতিস্তম্ভ ভেঙে, উপড়ে ফেলে এবং আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আর শেখ মুজিবুর রহমানের পরিপূর্ণ অবয়ব কাঠামোর ভাস্কর্য ধ্বংস করা হয়েছে সাতটি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোডে ত্রিভুজ আকৃতির সড়কদ্বীপে ছোট-বড় শতাধিক ভাস্কর্য ছিল। প্রয়াত ভাস্কর শামীম সিকদারের ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ নামের এই শিল্প স্থাপনায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, ইয়াসির আরাফাত, জগদীশচন্দ্র বসু, লালন সাঁইসহ দেশ-বিদেশের কবি, সাহিত্যিক, বিপ্লবী, রাজনীতিক ও বিজ্ঞানীদের আবক্ষ ভাস্কর্য ছিল। এর কয়েকটি ছাড়া সব ভাস্কর্যই ভেঙে ফেলা হয়।

এদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন দুই দফা ভাঙচুরের শিকার হয় মেহেরপুরের মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিকেন্দ্র। হামলায় এই স্থাপনার ছোট-বড় প্রায় ৬০০ ভাস্কর্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।