Image description

রাজধানীর মিরপুরের মনিপুর ও কাজীপাড়া এলাকায় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। দুই মাস ধরে চলা এ দুর্ভোগের জন্য ঢাকা ওয়াসা ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়াকে দায়ী করলেও এলাকাবাসী দুষছেন ত্রুটিপূর্ণ পাম্প ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে। পাম্প নিয়ে ওয়াসা কর্মকর্তাদের লুকোচুরিতে ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা। প্রতিদিনই রান্নাবান্না, গোসল ও শৌচাগার ব্যবহারের মতো জরুরি কাজে পানি কিনে ব্যবহার করতে হচ্ছে। ওয়াসার পানির গাড়ি নিয়েও রয়েছে অভিযোগ।

স্থানীয়রা বলছেন, ওয়াসার গাড়ির কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। কখনো দুপুরে, কখনো আবার রাতে গাড়ি পাওয়া যায়। অনেক সময় রাত ৩টার দিকেও গাড়ি পাওয়া গেছে। আবার সকাল ১০টায়ও গাড়ি আসছে। এমনও দিন গেছে যখন গাড়ির দেখা মেলেনি। দুই-তিন দিন না আসারও অভিযোগ রয়েছে।

তিন বছর ধরে পূর্ব মনিপুর এলাকায় পরিবার নিয়ে থাকেন এস এম তারিকুল ইসলাম। পানি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘ট্যাংকিতে বেশিরভাগ সময় পানি আসে না। মাঝেমধ্যে ২-১ ফুট পানি পাওয়া যায়। ৫০ টাকা করে গ্যালন ভরে পানি কিনে এনে রান্নাবান্না ও গোসল করতে হয়। প্রতিদিন ১০-১২ গ্যালন কেনা লাগে। খাওয়ার জন্য বোতলজাত পানি কিনতে হয়। খুবই বাজে অবস্থায় রয়েছি আমরা।’

আরেক বাসিন্দা সাগর মল্লিক বলেন, ‘দুই মাস ধরে পানি পাচ্ছি না। অনেক কষ্টে ওয়াসার গাড়ি থেকে পানি কিনে গোসল ও খাওয়া-দাওয়া সারি। কোনোভাবেই পানি না পেলে মিরপুর-১ নম্বরে আত্মীয়ের বাসায় যেতে হয়। এভাবে আর কতদিন বলেন? এই ভোগান্তির তো শেষ হওয়া প্রয়োজন।’

শুধু বাসাবাড়ি নয়, পানি সংকটের প্রভাব স্থানীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও পড়েছে। তাদেরও বিভিন্ন জায়গা থেকে পানি জোগাড় করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালাতে হয়। সেলুন মালিক সৈকত হোসেন বলেন, ‘সেলুনে অনেক পানির প্রয়োজন হয়। এখন আমাদের পানি কিনে কিংবা কোনো বাসায় পাওয়া গেলে সেখান থেকে নিয়ে আসতে হয়।’

ঢাকা ওয়াসার মডস জোন-৪ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মাজহারুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, ‘ভাকুর্তায় প্লান্টের পাম্প ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণের কারণে কিছুদিন বন্ধ ছিল। তবে এখন পাম্প ঠিক হয়ে গেছে। প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা করে পানি ছাড়া হচ্ছে। এর ফলে মনিপুরে না ঢুকলেও কাজীপাড়ার বেশ কিছু বাড়িতে পানি পাওয়া যাচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘মনিপুরে পানি না পাওয়ার পেছনে প্লান্টের পাম্প নষ্ট হওয়া বড় কারণ নয়। এখানে বড় কারণ হলো যে নলকূপগুলো রয়েছে, সেখানে পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যায় না। এ জন্য নতুন করে দুটি নলকূপ তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। এই দুটির কাজ শেষ হলে আশা করি ওই এলাকায় পানি সরবরাহ বাড়বে।’

সরেজমিন দেখা গেছে, মনিপুর এলাকার প্রবেশমুখে মিরপুর-২ নম্বর বড়বাগ বাজারের বিপরীত পাশে একটি নলকূপ তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। তবে এখনো মাটি খননের কাজ শুরু হয়নি। সেখানে থাকা পুরোনো নলকূপটি ভেঙে ফেলা হচ্ছে। ওয়াসার নিযুক্ত শ্রমিকরা জানান, পানির স্তর খোঁজার জন্য এক হাজার ফুট পর্যন্ত খনন করা লাগতে পারে। সেখানেও পানি না পেলে আরও নিচে খনন করা হবে।

কাজীপাড়া এলাকায় শুরুর দিকে বাইশবাড়ি পানির পাম্পেও আরেকটি নলকূপ তৈরির কাজ করছে ঢাকা ওয়াসা। দুদিন ধরে এই নলকূপটি বসানোর কাজ চলছে। তবে এখনো পানির দেখা পাননি বলে জানান সেখানকার ওয়াসার নিযুক্ত শ্রমিক তালেব মিয়া। তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমরা ৭০০ ফুট খনন করেছি। তবুও পানির দেখা মিলছে না। মনে হচ্ছে আরও ২৫০ ফুট খনন করলে পানির দেখা পাওয়া যেতে পারে।’

তবে নতুন নতুন নলকূপ বসানোই টেকসই সমাধান নয় বলে জানিয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ। তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘ঢাকা শহরের জন্য দীর্ঘদিন ধরে আমরা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে আমরা শহরের বিভিন্ন জায়গায় গভীর নলকূপ তৈরি করে সেখান থেকে পানি উত্তোলন করি। কিন্তু যে পরিমাণ উত্তোলন করা হয়, সে পরিমাণ পানি আবার ফিরে আসে না। এর ফলে ঘাটতি থেকে যায়। যে কারণে প্রতি বছর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ৩ ফুট করে নিচে নেমে যাচ্ছে। এতে নলকূপগুলো আর পানি পায় না। এ কারণেই মনিপুর-কাজীপাড়া এলাকায় পানির সংকট তৈরি হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘গভীর নলকূপ স্থাপন করে পানি তোলা টেকসই ব্যবস্থাপনা নয়। ভূপৃষ্ঠের অর্থাৎ সারফেস ওয়াটারের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হবে। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে না পারলে ঢাকা শহরে অস্তিত্বের সংকট তৈরি হবে।’

সাভারের ভাকুর্তার প্লান্টে দুটির পাম্প নষ্টের অভিযোগ: রাজধানীর বাইরে সাভার উপজেলার ভাকুর্তা ইউনিয়নের সোলাই মার্কেট এলাকা ও চায়রা মুসরি খোলা এলাকায় দুটি ‘সাভার-কেরানীগঞ্জ ওয়েলফিল্ড প্লান্ট আয়রন রিমুভাল প্লান্ট’ স্থাপন করেছে ঢাকা ওয়াসা। যেখানে ৪২টির মতো পানির পাম্প রয়েছে, যা থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৫ কোটি লিটার পানি উৎপাদন করা হয়। এর অধিকাংশ পানি মিরপুর অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। সপ্তাহখানেক আগে প্লান্ট দুটির পাম্প নষ্টের অভিযোগ ওঠে।

সাভারের ভাকুর্তায় চায়রা মুসরি খোলার প্লান্ট-২ এর নিরাপত্তাকর্মী হুমায়ুন জানান, সেখানে কোনো কর্মকর্তাই থাকেন না। তারাই দেখভাল করেন। কর্মকর্তারা মাঝেমধ্যে এসে পরিদর্শন করেন। পাম্প নষ্টের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এলাকাবাসী ১০-১২ দিন হলো পাম্প ঠিক করতে দিচ্ছে না। এর আগে ওই সময় ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণ হয়। তারপর ৩ থেকে ৪ দিন পাম্প বন্ধ ছিল।’

সোলাই মার্কেট এলাকার প্লান্ট-১ এ পাম্পের ইনচার্জ মো. খোকন বলেন, ‘পাম্পের বিষয়ে কারও সঙ্গে কথা বলা যাবে না। এটা আমাদের নিয়মে নেই।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা ওয়াসার এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ভাকুর্তায় অনেক পাম্প বসানোর কারণে স্থানীয় মানুষ তাদের চাপকলে পানি পান না। এর পরিপ্রেক্ষিতে ওয়াসা আশপাশের কিছু মানুষের বাড়িতে পানির লাইন দিয়েছে। সেই লাইন সবাই পাননি। যারা দূরের বাসিন্দা তারা পানি না পেয়ে ১৫-২০ দিন আগে লাঠিসোটা নিয়ে এসে পাম্প বন্ধ করে দিয়েছে। পাম্প বন্ধ থাকায় মিরপুর এলাকায় পানির ক্রাইসিস দেখা দিয়েছে।’

তবে এই ঘটনাকে পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন ঢাকা ওয়াসার মডস জোন-৪ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাজহারুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘প্লান্টের পাম্প ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণের কারণেই নষ্ট হয়েছিল। ৩-৪ দিন পর আবার ঠিক হয়ে গেছে। আর এলাকাবাসীর বাধার ঘটনা শুরুর দিকে ছিল। এরপর আর এমন ঘটনা ঘটেনি।’