জুলাই আন্দোলন নিয়ে কটূক্তি করেছেন জনপ্রিয় সাহিত্যিক প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী ও অভিনয়শিল্পী মেহের আফরোজ শাওন। এর আগেও ক্রমাগতভাবে জুলাই আন্দোলনের বিপরীতে লিখেছেন তিনি। এ মাসে আন্দোলনকে কটাক্ষ করে ফেসবুক পোস্টে ‘জুলাই সিডিআই’ লিখে পোস্ট করেছেন। এই সংক্ষিপ্ত বিষয়ের অর্থটি অশালীন হওয়ায় জুলাই আন্দোলনকারী ও সপক্ষের মানুষেরা তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। অনেকে শারীরিকভাবে আঘাত করা, হামলা ও মামলার হুমকি দিয়েছেন। অন্যদিকে শাওনের পোস্টের প্রতিবাদে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জুলফিকার নিউটন ফেসবুকে অশালীন ভাষা ব্যবহার করছেন। ফলে এমন ফেসবুক পোস্টে তার শিক্ষার্থীসহ অনেকেই সমালোচনা করছেন। অতীতের কর্মকাণ্ড মনে করিয়ে তাকে অশালীন ভাষায় হেয় করতেও দেখা গেছে।
এমন বাস্তবতায় বিশিষ্টজনেরা মনে করেন মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকা উচিত; কিন্তু সেই স্বাধীনতা যেন বিবেকহীন না হয়। তাদের ভাষ্য, যেহেতু শিক্ষক ও শিল্পীদের মানুষ অনুসরণ করে-সেক্ষেত্রে তাদের সতর্কতার সঙ্গে কথা বলা উচিত। বুদ্ধি, বিবেক ও আত্মসংযম না থাকলে শিল্পী ও শিক্ষকের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা থাকে না। আর যারা জুলাই আন্দোলন নিয়ে অশালীন ভাষায় কথা বলেন তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার পরামর্শও দিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ ও লেখক ড. মাহবুব উল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে কমবেশি অশালীন ভাষার ব্যবহার আগেও ছিল। তবে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনীতিতে অশালীন ভাষার প্রয়োগ ভয়াবহভাবে বেড়ে গেছে। এটি অসহিষ্ণুতার লক্ষণ। এ ধরনের অসহিষ্ণুতার মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের বিকাশ সম্ভব নয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে অশালীন মন্তব্যের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যারা জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে অশালীন ভাষায় সমালোচনা করছেন, তাদের অনেকেই কোনো জবাবদিহির মুখোমুখি হচ্ছেন না। যদি কারও বক্তব্যে রাষ্ট্রবিরোধী বা গণতন্ত্রবিরোধী উপাদান থাকে, তাহলে আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। প্রত্যেককে নিজের বক্তব্যের দায় বহন করতে হবে।
অন্যদিকে জুলাইয়ের পক্ষে যারা একই (অশালীন) ধরনের ভাষা ব্যবহার করছেন তাদের বিষয়ে তিনি বলেন, উসকানি থাকলেও সংযত থাকাই গণতান্ত্রিক আচরণের পরিচয়। তাই পালটা প্রতিক্রিয়ায় অশালীন ভাষা ব্যবহার না করে শালীন ও দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত।
ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। নানা ধরনের অপপ্রচার, গালিগালাজ ও অশালীন ভাষার বিস্তার দেশের সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর।
অধ্যাপক জুলফিকার নিউটন ও অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওনের ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলমান প্রতিক্রিয়া রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতির স্খলন বলে মন্তব্য করেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। শুক্রবার বিকালে তিনি যুগান্তরকে বলেন, যে কোনো ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার মতামত, পছন্দ-অপছন্দ প্রকাশ করতে পারেন। কিন্তু সেই মতপ্রকাশকে কেন্দ্র করে পক্ষে-বিপক্ষে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা শালীনতার সব সীমা অতিক্রম করেছে। উভয়পক্ষের ভাষা ও আচরণ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এটিকে আর ন্যূনতম রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে ফেলা যায় না। আমরা আধুনিক গণতান্ত্রিক ও সভ্য সমাজের বাসিন্দা-এ কথা বলাও কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
তার মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক মতভেদের প্রকাশ এখন যুক্তি, তর্ক ও ভিন্ন মতের চর্চা থেকে সরে গিয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীনতার দিকে চলে গেছে।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে মতবিনিময়ের ক্ষেত্রে শালীন ভাষা ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি চর্চার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মোকাবিলার একটি ভাষা, পদ্ধতি ও সংস্কৃতি রয়েছে। কিন্তু এখন সেগুলো আর দেখা যাচ্ছে না। পুরো বিষয়টি চূড়ান্ত নোংরামির পর্যায়ে চলে গেছে। এই পরিস্থিতিতে আমি ব্যক্তিগতভাবে খুবই বিব্রত ও লজ্জিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ও অধিকারকর্মী অধ্যাপক সামিনা লুৎফা নিত্রা বলেন, যার যার শব্দ চয়ন তার তার রুচি এবং সাংস্কৃতিক মান প্রকাশক। এ বিষয়ে আলাদা কিছু বলার নেই। তবে যেহেতু শিক্ষক ও শিল্পীদের সাধারণ মানুষ অনুসরণ করে, তাদের ভাষা এবং শব্দ প্রয়োগে সচেতন ও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। নারীবিদ্বেষী শব্দচয়ন বা বিদ্বেষমূলক ভাষা ব্যবহার অনুচিত। তিনি বলেন, শাওনের মতপ্রকাশকে তিনি ব্যক্তিগত মতামত হিসাবেই দেখেন। তবে এ ধরনের বক্তব্য নিয়ে অতিরিক্ত আলোচনা না করে বিপরীতে জুলাই কেন হয়েছে, কেন সেই আন্দোলন জরুরি ছিল, হত্যার বিচার, আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন-এসব বিষয়েই সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষ এবং শিক্ষকদের বেশি কথা বলা উচিত বলে মনে করেন তিনি।