২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) দেশের অন্তত ছয়টি মাজারে হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে গবেষণা ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান ‘মাকাম’। এসব হামলায় একজন নিহত এবং নারীসহ অন্তত ১০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সংস্থাটি তাদের ষান্মাসিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে এই তথ্য জানিয়েছে। একই সঙ্গে তারা ক্ষতিগ্রস্ত মাজারগুলোর ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং হামলাকারীদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ে অন্তত ছয়টি মাজারে হামলার ঘটনা ছাড়াও একটি মাজারের ওরস পালনে পুলিশি বাধা, একটি ওরসে হামলার চেষ্টা এবং একটি হামলার গুজব শনাক্ত করা হয়েছে।
মাকামের তথ্য অনুযায়ী, প্রমাণিত হামলার ঘটনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটে গত ১১ এপ্রিল কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পীর আবদুর রহমান ওরফে শামীম বাবার দরবারে। পবিত্র কোরআন অবমাননার অভিযোগে সেখানে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং পীর শামীমকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় তাঁর দুই অনুসারী গুরুতর আহত হন। এ ছাড়া প্রায় ২০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়, যার মধ্যে ১০ লাখ টাকা নগদ এবং ৪ ভরি স্বর্ণ লুট করা হয়। উক্ত ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও খেলাফত মজলিসের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততা উঠে এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রমাণিত ৬টি হামলার মধ্যে সর্বোচ্চ দুটি ঘটেছে কুষ্টিয়ায়। মাজার হামলার জেরে একটি মসজিদেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলার পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত দুটি দরবারে ওরসসহ যাবতীয় কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। হামলার নেপথ্যে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাত, স্থানীয় কোন্দল, মাদক ও জুয়া নিয়ন্ত্রণের অজুহাত এবং মাজারের বিপুল সম্পত্তি নিয়ন্ত্রণের লড়াই প্রধান ভূমিকা রেখেছে।
প্রতিবেদনে মাকাম জানিয়েছে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও তার অঙ্গসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির অন্তত দুটি বড় ঘটনায় সরাসরি যুক্ত বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া একটি হামলার ঘটনায় খেলাফত মজলিসের স্থানীয় সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
যে সব হামলার নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেছে সেসবের মাত্র দুটি ঘটনায় মামলা করা হয়েছে। এগুলো হলো কুষ্টিয়ার পীর আবদুর রহমান ওরফে শামীম হত্যা মামলা এবং ঢাকার মিরপুরে শাহ আলী বাগদাদীর মাজার হামলার মামলা। তদন্তাধীন এ দুটি মামলায় ভিডিও ফুটেজ ও প্রমাণের ভিত্তিতে কুষ্টিয়ায় ৪ জন এবং ঢাকায় ৩ জনসহ মোট ৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মাকাম তাদের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের তুলনায় ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে মাজারে হামলার ঘটনা সংখ্যার দিক থেকে কমে এসেছে। তবে ঘটনার সংখ্যা কমলেও হামলা প্রতিরোধে প্রশাসন কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর মাজারে হামলা বন্ধ হবে বলে দেশবাসী আশা করলেও কুষ্টিয়ায় পীর শামীম হত্যা ও ঢাকার মিরপুরে শাহ আলী বাগদাদীর মাজারে হামলার ঘটনা সেই প্রত্যাশায় আঘাত হেনেছে। পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ধারাবাহিকতায় বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলেও এ বিষয়ে গাফিলতি দৃশ্যমান বলে মাকাম অভিযোগ করেছে। মামলা হলেও তদন্ত ও বিচারের ক্ষেত্রে আশানুরূপ পদক্ষেপ লক্ষ করা যাচ্ছে না।
এর আগে গত ২ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল মাকাম। সেখানে যাচাই-বাছাইয়ের পর ৯৭টি মাজার হামলার প্রমাণ পাওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। নতুন ছয়টিসহ এ পর্যন্ত মোট ১০৩টি মাজার হামলার ঘটনার প্রমাণ মিলেছে।
সামাজিক স্থিতিশীলতা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিপূর্ণ দেশ গঠনের লক্ষ্যে মাকাম সরকারের নিকট জোর দাবি জানিয়েছে—মাজারে হামলার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত প্রমাণিত ১০৩টি হামলার ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত মাজার, দরগাহ ও দরবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হোক এবং প্রতিটি ঘটনার স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।