Image description

মনিরা হক। আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইমিগ্রেশন শাখায় পদায়নে ছিলেন একনাগাড়ে দীর্ঘ প্রায় সাড়ে চার বছর। গুম-খুনের নায়ক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এমনকি মন্ত্রীর মানি কালেকক্টর টিমের অন্যতম সদস্য হিসেবেও তাকে আখ্যায়িত করা হতো। এছাড়া একই সঙ্গে শেখ হাসিনার এক সময়ের পিএস, সাবেক প্রভাবশালী আমলা ও এমপি আলাউদ্দিন নাসিমেরও ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন এই মনিরা হক। আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিমই নিজের এলাকা পরশুরামে ইউএনও হিসেবে পদায়নের ব্যবস্থা করেন মনিরা হককে। আলাউদ্দিন নাসিমের রেফারেন্সেই পরশুরাম থেকে পরবর্তীতে সরাসরি চলে আসেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। সেই মনিরা হকই এখন ফেনীর জেলা প্রশাসক।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ডিসি নিয়োগকে কেন্দ্র করে দফায় দফায় ঘুষ কেলেঙ্কারি হয়। এ নিয়ে অনেক হইচইও হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৫ অক্টোবর, ২০২৫ চারটি জেলায় নতুন জেলা প্রশাসক পদায়ন দেওয়া হয়। এই পদায়নটি ছিল ইতিপূর্বের পদায়নগুলোর চেয়েও বিতর্কিত। পরদিন ১৬ অক্টোবর, ২০২৫ গণমাধ্যমে এই মর্মে খবর প্রকাশিত হয় যে, “৪ আওয়ামী সুবিধাভোগী কর্মকর্তাকে ডিসি নিয়োগ, রয়েছে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ”। আলোচিত এই চার কর্মকর্তারই একজন হলেন ফেনীর বর্তমান জেলা প্রশাসক মনিরা হক। প্রশাসনে তখন এই মর্মে চাউর ছিল যে, ফেনীর ডিসি পদে পদায়নে ৭ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, ৭ কোটি টাকার ডিসি মনিরা হক ফেনীর জেলা প্রশাসক পদে বসেই অত্যন্ত বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন ঘুষের টাকা তোলার জন্য। ডিসি মনিরা হকের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, ৭ কোটির বড় অংশই দিয়েছেন একজন ব্যবসায়ী। তিনি নাকি আশংকা করছেন, আওয়ামী কর্মকর্তা হিসেবে যে কোনো সময় ডিসি পদ থেকে প্রত্যাহার হতে পারেন। তাই শুরু থেকেই বেপরোয়া ঘুষ বাণিজ্যে নেমে পড়েছেন। জেলা প্রশাসনের অধীন অবৈধ আয়ের এমন কোনো খাত নেই, যা তিনি কাজে লাগাচ্ছেন না। কৃষিজমি সুরক্ষা আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ না করা অর্থাৎ মাটি খেকো সিন্ডিকেটগুলোকে ছাড় দেওয়া, মাদকের বিস্তার, অবৈধ ইটভাটা, এমনকি সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বাধা সৃষ্টির মতো গুরুতর অভিযোগও উঠেছে বেপরোয়া দুর্নীতিবাজ জেলা প্রশাসক মনিরা হকের বিরুদ্ধে। চাঁদাবাজ ও ভূমিদস্যু চক্রের সঙ্গে যোগসাজশে একটি ইউপি ভবন নির্মাণের কার্যক্রমে ডিসি মনিরা হক অবৈধভাবে বাধা সৃষ্টি করেছেন বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এছাড়া, অভিযোগ রয়েছে, মাটি খেকো সিন্ডিকেটের কাছ থেকে ডিসি মনিরা হক বিশেষ মাধ্যমে নিয়মিত চাঁদা তোলেন। এ কারণে জেলার ছয়টি উপজেলায় তাঁর আমলে কৃষিজমি, খাসজমি, খাল ও নদীর তীর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মাত্রা ভয়াবহভাবে বেড়ে গেছে। ফেনী জেলায় বর্তমানে অবৈধ ইটভাটার সংখ্যাই বেশি। যেসব ইটভাটা বৈধ বলে দাবি করা হচ্ছে, সেগুলোতেও বাস্তবতার সঙ্গে কাগজপত্রের কোনো মিল নেই। ইটভাটা স্থাপন আইনের ব্যাপক লঙ্ঘন চলছে। ইটভাটা স্থাপন আইন, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও সরকারি নীতিমালা বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসনের ভূমিকা বর্তমানে নেই বললেই চলে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান পরিচালনার বিষয়ে মাঝেমধ্যে নামেমাত্র কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তা লোক দেখানো। আদতে জেলা প্রশাসনের চাঁদা বা ঘুষের রেট বাড়ানোর এটি একটি কৌশল ছাড়া কিছুই নয়, বলছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, নামেমাত্র এসব অভিযানের পর পরিস্থিতির কোনোই উন্নতি হতে দেখা যায়নি। বরং অবৈধ ইটভাটার মালিক এবং মাটি খেকোদের দৌরাত্ম আরও বেড়েছে।
প্রসঙ্গত, গত বছরের অক্টোবরে যখন মনিরা হককে ফেনীর জেলা প্রশাসক পদে পদায়ন করা হয় এ নিয়ে অনেক বিতর্ক দেখা দেয়। পদায়নের পরদিন “ফেনীর নতুন জেলা প্রশাসক মনিরা হক, যোগদানের আগেই বিতর্ক” শিরোনামে খবরও প্রকাশিত হয়। মনিরা হক ইতিপূর্বে ২০১৬-১৭ সালে পরশুরাম উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পদে থাকাকালে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেন। প্রভাবশালী আলাউদ্দিন নাসিমের প্রভাবই ছিল মনিরা হকের প্রভাব। আলাউদ্দিন নাসিমের প্রভাব খাটিয়ে তিনি নানা অনিয়ম-অপকর্ম করেন। এই আলাউদ্দিন নাসিমের হাত ধরেই চলে আসেন সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রে মন্ত্রণালয়ে। ২০১৭ সালের ৩ এপ্রিল থেকে ২০২১ সালের ৩০ জন পর্যন্ত সুরক্ষা ও সেবা বিভাগের সংবেদনশীল ইমিগ্রেশন শাখায় কাজ করার সুযোগ পান তিনি। ওই সময়ের গুম-খুনের নায়ক, ফ্যাসিস্ট স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। এক পর্যায়ে মন্ত্রীর সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য হিসেবেও আবির্ভূত হন। তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব ড. হারুন অর রশীদ বিশ্বাসের নেতৃত্বে ওই সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়েছিল। সিন্ডিকেটে অন্য আরও ছিলেন যুগ্মসচিব ধনঞ্জয় কুমার দাস, প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোল্লা ইব্রাহিম হোসেন, সহকারী একান্ত সচিব মনির হোসেন, জনসংযোগ কর্মকর্তা শরীফ মাহমুদ অপু। এমন কোনো অপকর্ম নেই যা এরা করেনি। সিন্ডিকেটের সংগৃহীত টাকা বস্তায় করে মন্ত্রীর বাসায় নেওয়া হতো। সিন্ডিকেটের সদস্যরাও প্রত্যেকে বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হন ওই সময়। যে কোনো কারণে হোক শেষ দিকে এই সিন্ডিকেটের সদস্যদের মধ্যে কিছুটা বিরোধ দেখা দেয়। মনিরা হক অন্যত্র পদায়ন নেন।

৫ আগস্ট, ২০২৪ শেখ হাসিনা-আসাদুজ্জামান কামালরা দেশ ছেড়ে পালানোর পর ফ্যাসিস্ট কর্মকর্তা মনিরা হকও বেশ কিছুদিন ‘গা ঢাকা’ দিয়ে থাকেন। পরবর্তীতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অন্যান্য ফ্যাসিস্ট কর্মকর্তাদের মতো মনিরা হকও জামায়াত কানেকশনে পুনর্বাসিত হন। এক পর্যায়ে পদায়ন পান শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। এবং এখানেও উন্নয়ন শাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন তিনি। ওই সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয় ছিল পুরোপুরিই জামায়াতের নিয়ন্ত্রণে। অন্তর্বর্তী সরকারের শুরু থেকেই জেলা প্রশাসক পদায়ন নিয়ে ঘুষ লেনদেনের অনেক অভিযোগ ছিল। এ নিয়ে একাধিক তদন্ত কমিটিও গঠিত হয়েছে, যদিও কোনো তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনই আলোর মুখ দেখেনি। আদতে ঘুষ লেনদেনের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাবশালী ব্যক্তিরা সরাসরি জড়িত ছিলেন। মনিরা হকসহ ৪ আওয়ামী সুবিধাভোগী কর্মকর্তা ডিসি পদে পদায়নের ক্ষেত্রেও ঘুষ লেনদেনের একই অভিযোগ ওঠে। মনিরা হক ৭ কোটি টাকায় ফেনীর ডিসি পদ বাগিয়ে নেন বলে জনপ্রশাসনে চাউর হয়। তিনি যেহেতু ইতিপূর্বে আওয়ামী লীগ আমলে এক সময় পরশুরামের ইউএনও পদে ছিলেন তাই ফেনী সম্পর্কে পুরোপুরিই জানা আছে তাঁর। ফেনী থেকে বড় অংকের টাকা তুলতে পারবেন, সেই হিসাব-নিকাশ তাঁর আছে। এ লক্ষ্যেই ফেনীতে পদায়ন নিয়েছেন বলে জানিয়েছে তার ঘনিষ্ঠরা।

শীর্ষনিউজ