জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের ওপর আলোচনায় সরব ছিলেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। বিরোধী দলের ৯১ জন সদস্য প্রস্তাবিত বাজেটের বিভিন্ন দিকের সমালোচনা করেছেন, পরিবর্তনের দাবিও তুলেছেন। কিন্তু অর্থবিলের কোথায় কী পরিবর্তন চান, তা উল্লেখ করে তাঁদের কেউই দফাওয়ারি কোনো সংশোধনী প্রস্তাব দেননি।
সংসদ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে অর্থবিলে কোনো সংশোধনী প্রস্তাব না দেওয়ার ঘটনা বিরল।
বাজেট নিয়ে সংসদে প্রায় ৪৬ ঘণ্টা আলোচনা শেষে গত সোমবার অর্থবিল পাসের জন্য তোলা হয়। বিরোধী দলের বেশ কয়েক জন সদস্য জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব দিলেও কোনো সংশোধনী প্রস্তাব দেননি।
গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে নির্দিষ্টকরণ বিল এবং আগের দিন সোমবার অর্থবিল-২০২৬ পাস হয়। মূলত শুল্ক-করের পরিবর্তনগুলো আনা হয় অর্থবিলের মাধ্যমে। কোনো সংসদ সদস্য প্রস্তাবিত শুল্ককরে কোনো পরিবর্তন চাইলে তাঁকে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে অর্থবিলে সংশোধনী প্রস্তাব দিতে হয়।
সংসদীয় প্রক্রিয়া অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী কোনো বিল ‘সংসদে অবিলম্বে বিবেচনার’ প্রস্তাব দেওয়ার পর সংসদ সদস্যরা বিলটি জনমত যাচাইয়ে পাঠানোর প্রস্তাব করতে পারেন। ওই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শেষে তা সাধারণত নাকচ হয়ে যায়। এরপর পরবর্তী ধাপে (বিল পাসের আগে) সংসদ সদস্যরা বিলের কোথায় কোথায় সংশোধন চান, তা উল্লেখ করে সুনির্দিষ্টভাবে প্রস্তাব দিতে পারেন।
জনমত যাচাই, সংশোধনী প্রস্তাবের নোটিশ সংসদ সদস্যের একটি নির্দিষ্ট সময় আগেই দিয়ে রাখতে হয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী যেকোনো সংশোধনী প্রস্তাব গ্রহণ বা নাকচ করার ইচ্ছা ব্যক্ত করতে পারেন। সেটি কণ্ঠভোটের মাধ্যমে গৃহীত বা নাকচ হয়। মূলত এই সংশোধনীর মাধ্যমেই বিলে পরিবর্তন আসে।
জাতীয় সংসদের দুজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা কর্মজীবনে এর আগে পাঁচ-ছয়টি সংসদ দেখেছেন। কোনো অর্থবিলে বিরোধী দলের সংশোধনী প্রস্তাব ছিল না—এমন ঘটনা তাঁরা স্মরণ করতে পারছেন না। এবারই এর ব্যতিক্রম হলো।
বাজেট নিয়ে সংসদে প্রায় ৪৬ ঘণ্টা আলোচনা শেষে গত সোমবার অর্থবিল পাসের জন্য তোলা হয়। বিরোধী দলের বেশ কয়েক জন সদস্য জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব দিলেও কোনো সংশোধনী প্রস্তাব দেননি।
জাতীয় সংসদের দুজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা কর্মজীবনে এর আগে পাঁচ-ছয়টি সংসদ দেখেছেন। কোনো অর্থবিলে বিরোধী দলের সংশোধনী প্রস্তাব ছিল না—এমন ঘটনা তাঁরা স্মরণ করতে পারছেন না। এবারই এর ব্যতিক্রম হলো।
সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সাধারণত যেকোনো বিলে বিরোধী দলের সদস্যরাই বেশি সংশোধনী প্রস্তাব দিয়ে থাকেন। সরকারি দলের সদস্যরাও সংশোধনী প্রস্তাব দিতে পারেন। সরকারি দলের সদস্যদের আনা সংশোধনী সাধারণত গৃহীত হয়। তবে বিরোধী দলের সদস্যদের সংশোধনী যে একেবারেই গ্রহণ করা হয় না, তা নয়। অনেক ক্ষেত্রে বিরোধী দলের আনা সংশোধনীও গ্রহণ করা হয়।
এবার অর্থবিলে ১১ জন সংসদ সদস্য ৬৪টি সংশোধনী প্রস্তাব এনেছিলেন। তাঁরা সবাই সরকারি দলের সদস্য। তাঁদের সব কটি সংশোধনী গ্রহণ করা হয়। অর্থবিলে আনা সংশোধনীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল করমুক্ত আয়সীমা চার লাখ টাকা করা। প্রস্তাবিত অর্থবিলে করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার কথা ছিল।
বিরোধী দলের মূল উদ্বেগ ছিল বাজেট বাস্তবায়নের পরিকল্পনার অভাব নিয়ে। কাঠামোগত সমস্যা, অস্বচ্ছতা, পরিকল্পনার ঘাটতি ও বাস্তবায়ন সক্ষমতার সংকট অর্থবিলে ছোটখাটো সংশোধনীর মাধ্যমে সমাধান হবে না। এসব বিষয় বিবেচনা করেই তাঁরা অর্থবিলে সংশোধনী প্রস্তাব আনেননি। তাঁরা পুরো বিলটি জনমত যাচাইয়ে পাঠানোর প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু ভোটে সে প্রস্তাব বাতিল হয়ে যায়।নাজিবুর রহমান, জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য
প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে করমুক্ত আয়সীমা চার লাখ টাকা করার বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। পরে সরকারি দলের সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী অর্থবিলের তফসিলে প্রস্তাবিত করধাপে সংশোধনী আনার প্রস্তাব দেন, যাতে করমুক্ত আয়সীমা চার লাখ টাকা করা হয়। তাঁর প্রস্তাবটি গৃহীত হলে নতুন অর্থবছরে করমুক্ত আয়সীমা চার লাখ টাকা নির্ধারিত হয়।
সংসদীয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এভাবে সুনির্দিষ্ট সংশোধনী প্রস্তাব এনে সংসদে তা পাস করানো না হলে বিলে পরিবর্তন আনা যায় না। অর্থাৎ বাজেট আলোচনায় কোনো দাবি তোলা হলেও সেটি অর্থবিলে প্রতিফলিত করতে হলে সংশ্লিষ্ট দফায় লিখিত সংশোধনী প্রস্তাব থাকা জরুরি।
এর একটি উদাহরণ দেখা যায় বাইসাইকেলের যন্ত্রাংশে শুল্ক কমানোর প্রস্তাব নিয়ে। গত ২৯ জুন বাজেট আলোচনায় সংসদ নেতা তারেক রহমান বক্তব্য দেওয়ার পর বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বাইসাইকেলের ওপর সব শুল্ক প্রত্যাহারের মৌখিক প্রস্তাব দেন। তখন সংসদ নেতা প্রস্তাবটি পরীক্ষা করে বিবেচনার জন্য অর্থমন্ত্রীকে আহ্বান জানান। পরে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব থাকলে ভালো হয়।
কিন্তু অর্থবিলের সংশ্লিষ্ট দফায় এ বিষয়ে কোনো লিখিত সংশোধনী প্রস্তাব ছিল না। ফলে অর্থবিলে বাইসাইকেলের যন্ত্রাংশের ওপর কর কমানো হয়নি। অবশ্য অর্থবিল পাস হয়ে যাওয়ার কিছু সময় পর অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংসদকে জানান, বিরোধীদলীয় নেতা বাইসাইকেলের যন্ত্রাংশ আমদানিতে কর কমানোর যে প্রস্তাব করেছেন, তাঁরা সেটি গ্রহণ করছেন। তবে যেহেতু ‘শুল্কের বিষয় ক্লোজ’ হয়ে গেছে, অর্থাৎ অর্থবিল পাস হয়ে গেছে, তাই পরে এ বিষয়ে তাঁরা একটি সিদ্ধান্ত দেবেন।
অর্থবিলে সংশোধনী প্রস্তাব না দেওয়ার বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, জনবিরোধী যেসব কর প্রস্তাব করা হয়েছিল, সেগুলো নিয়ে তাঁরা বক্তব্য দিয়েছেন। সরকারি দল মোটামুটি তা শুনেছে। বিশেষ করে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ বাদ দেওয়া হয়েছে।
নাজিবুর রহমান বলেন, বিরোধী দলের মূল উদ্বেগ ছিল বাজেট বাস্তবায়নের পরিকল্পনার অভাব নিয়ে। কাঠামোগত সমস্যা, অস্বচ্ছতা, পরিকল্পনার ঘাটতি ও বাস্তবায়ন সক্ষমতার সংকট অর্থবিলে ছোটখাটো সংশোধনীর মাধ্যমে সমাধান হবে না। এসব বিষয় বিবেচনা করেই তাঁরা অর্থবিলে সংশোধনী প্রস্তাব আনেননি। তাঁরা পুরো বিলটি জনমত যাচাইয়ে পাঠানোর প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু ভোটে সে প্রস্তাব বাতিল হয়ে যায়।