স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। কাগজে-কলমে তার দায়িত্ব দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা, থানা-পুলিশের চাকা সচল রাখা আর জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়া। তবে জাতীয় সংসদ কিংবা বাইরের সভা-সমাবেশে তার বক্তৃতা-বিবৃতি শুনে যে কারও মনে প্রশ্ন ওঠতে পারে তিনি আসলে কোন মন্ত্রণালয়ের চাবি হাতে বসে আছেন!
অর্থনীতি, বাজেট ব্যবস্থাপনা, সংবিধান সংস্কার থেকে পররাষ্ট্রনীতি-হেন কোনো বিষয় নেই যা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অনর্গল জ্ঞান বিতরণ করেন না। তবে বিপত্তি বাধে শুধু নিজের মন্ত্রণালয় নিয়ে কথা বলার সময়; তখন তার কণ্ঠ যেন একবারে মিনমিনে হয়ে যায়। কারণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে আসলেই খারাপ!
মুগ্ধতা ছড়ানো বক্তৃতা
সংসদে দাঁড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে তুলোধোনা করার এই সুযোগ হাতছাড়া করেননি বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। বেশ রসিয়ে রসিয়ে তিনি বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন বক্তব্য দেন তখন সারা দেশ মুগ্ধ হয়ে শোনে। আমিও শুনি। কিন্তু আরও বেশি খুশি হতাম যদি তিনি তার মন্ত্রণালয়ে কাজ দিয়ে মুগ্ধতা ছড়াতেন।’
রুমিন ফারহানা সংসদে খুন, নারী-শিশু নির্যাতন এবং পুলিশের ওপর হামলার একের পর এক পরিসংখ্যান তুলে ধরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশাল বাজেট বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এত বিপুল অর্থ ঢালার পরও দেশের অবস্থার আদৌ কোনো উন্নতি ঘটবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন তিনি।
বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মুহাম্মদ আবদুল খালেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই ‘সর্বজ্ঞ’ রূপ এবং নিজের ঘর সামলাতে না পারার ব্যর্থতা নিয়ে তোপ দাগেন।
তিনি বলেন, ‘দেশের প্রতিটি নিউজ পোর্টাল খুললে শুধু রক্ত আর লাশের খবর। দেশের মানুষ ঘরের বাইরে বের হলে নিরাপদে ফিরবে কি না তার গ্যারান্টি নেই। অথচ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দেখলে মনে হয় তিনি পুরো মন্ত্রিসভার দায়িত্ব একাই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন! তিনি অর্থনীতি বোঝেন, তিনি সংবিধান সংস্কার বোঝেন, শুধু বোঝেন না ওনার নিজের নাকের ডগায় পুলিশ কী করছে আর দেশের মানুষ কীভাবে মরছে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও দমে যাওয়ার পাত্র নন। নিজের মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতার কৈফিয়ত দেওয়ার ধার না ধেরে, তিনি উল্টো জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক ইতিহাস শুনিয়ে দেন।
জামায়াতে ইসলামীর আরেক সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন মন্ত্রীর এই সবজান্তা স্বভাব দেখে কিছুটা কৌতুকের ছলে মনে করিয়ে দেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অনেক কাজই করতে পারেন, তাতে সমস্যা নেই। কিন্তু আমরা দেখছি তার মন্ত্রণালয়ের নিজের কাজ তিনি করছেন না।’ দেশের অর্থনীতি চাঙা করতে হলেও যে আগে আইনশৃঙ্খলা ঠিক করা দরকার, এই অতি সাধারণ পাঠটিই তিনি মন্ত্রীকে সবিনয়ে স্মরণ করিয়ে দেন।
বদির খোঁজে গয়েশ্বর
মন্ত্রীর জন্য সবচেয়ে বড় চমকটি অপেক্ষা করছিল নিজ দলের সিনিয়র নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের কাছ থেকে। সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, দেশের সবচেয়ে বড় মাদকের চালান আসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ির আশপাশ–অর্থাৎ কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে, অথচ সেই স্বর্গদ্বার এখনো বন্ধ করা গেল না!
গয়েশ্বর চন্দ্র রায় রসিকতা করে বলেন, ‘আগে শুনতাম বদি, এখন তো বদি নেই। বদি বধ হয়ে গেছে, এখন ওখানকার দায়িত্ব কে নিয়েছে? মাদক চোরাকারবারীরা বাড়ির আশপাশের লোক, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তো চেনার কথা। এতদিনে ওইদিক থেকে মাদক আসা বন্ধ হওয়া উচিত ছিল। আইন দিয়ে কোনো কিছু হয় না। আইন প্রয়োগ করার জন্য সাহস লাগে, ইচ্ছাও লাগে।’
প্রতি মিনিটে তিন লাখ টাকার কথামালা
গত ২৮ জুন রাতে সংসদে টানা প্রায় এক ঘণ্টা ধরে বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, যার সিংহভাগ জুড়েই ছিল জামায়াতে ইসলামীর চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার। মন্ত্রীর এমন দীর্ঘ ও অপ্রাসঙ্গিক ‘টক শো’ দেখে ক্ষোভে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে বিরোধী দল।
মন্ত্রীর এই দীর্ঘ বক্তৃতা নিয়ে সংসদের বাইরেও এখন বেশ আলোচনা চলছে। যেখানে সংসদের প্রতি মিনিটের আয়োজনে জনগণের ট্যাক্সের প্রায় তিন লাখ টাকা খরচ হয়, সেখানে তিনি নিজের কাজের খতিয়ান না দিয়ে এমন এক ঘণ্টার রাজনৈতিক বক্তৃতায় জনগণের পকেটের টাকা দেদারসে ওড়াচ্ছেন বলে সমালোচনা হচ্ছে।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির মিটিংয়ে বসে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। অথচ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অন্য সব বিষয়ের ব্যস্ততায় এই সভাটি করার সময়ই পাচ্ছেন না। সর্বশেষ সভাটি হয়েছিল প্রায় দেড় মাস আগে, গত ১২ মে।
পুলিশের খাতা বনাম মন্ত্রীর ব্যাখ্যা
পুলিশের নিজস্ব পরিসংখ্যান বলছে, গত মে মাসে দেশে ৩১০টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এপ্রিলে এটি ছিল ২৮৮টি এবং মার্চে ছিল সর্বোচ্চ ৩১৭টি। এপ্রিল ও মে মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা যেন উৎসবের আমেজে বেড়েছে; মে মাসে ১ হাজার ৯৫২ জন এবং এপ্রিলে ২ হাজার ১১ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। মে মাসে নানা অপরাধে মোট ১৮ হাজার ১৪৯টি এবং এপ্রিলে ১৭ হাজার ১৮০টি মামলা হয়েছে।
তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পরিসংখ্যানে অপরাধচিত্র আরও করুণ। তাদের হিসাবে, দেশে প্রতিদিন গড়ে খুন হচ্ছেন ১১ জন। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই সারা দেশে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ১ হাজার ৯৩০ জন। এর ওপর মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে দেশজুড়ে জেঁকে বসেছে ‘মব জাস্টিস’ বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এক চমৎকার হিড়িক।
কেবল মে মাসেই দেশে ৬৬টি মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যেখানে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে ৩১ জনকে। এছাড়া বছরের প্রথম ছয় মাসের সামগ্রিক হিসাবে নারী ও শিশু নির্যাতনের সংখ্যা ২ হাজার ৭৪৪ মামলা ছাড়িয়ে গেছে।
এমন অপরাধচিত্রের পরেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি, বর্তমান সরকারের আমলে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ‘ব্যাপক’ উন্নতি হয়েছে! পুলিশের পরিসংখ্যানে হত্যা-ধর্ষণের সংখ্যা এত বেশি হওয়ার ব্যাখ্যাও হাজির করেছেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘মানুষ এখন স্বাধীনভাবে মামলা করতে পারছে। আগে সামাজিক বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে ভুক্তভোগীরা থানায় যেতে ভয় পেত, ফলে অপরাধের ঘটনা চাপা পড়ে থাকত। এখন কোনো হস্তক্ষেপ নেই, পুলিশ শতভাগ স্বাধীন। তাই মানুষ বেশি বেশি মামলা করছে আর খাতায়-কলমে অপরাধের সংখ্যা বেশি দেখাচ্ছে।’
‘অন্য কাজের ব্যস্ততায়’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ নিজের মন্ত্রণালয়ে বসারও ফুরসত পান না। সচিবালয়ের চেয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েই বেশি সময় কাটাতে পছন্দ করেন। এ ছাড়া বেইলি রোডের সরকারি বাসা ও গুলশানের বাসায় সমান্তরাল দুটি মিনি-অফিস সামলাতেই তার সারা বেলার এনার্জি শেষ হয়ে যায়।
রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রীর দুনিয়ার সব বিষয়ে এমন অগাধ ও ‘সর্বজনীন’ জ্ঞান থাকা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে নিজের পরীক্ষার খাতা সাদা রেখে অন্যদের উত্তরপত্র লিখে দিতে গেলে সাধারণ মানুষ তাকে আর ‘কাজের মানুষ’ মনে করে না।