জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষের ফ্লোরে দুই নেতার করমর্দন দেখে একটা বিষয় মনে পড়লো। ব্যারিষ্টার মওদুদ আহমদ আমাকে খুবই স্নেহ করতেন। অনেক গল্প করতেন। অতীত স্মৃতি শেয়ার করতেন নানা সময় কথাবার্তায়।
২০০১ সালের নির্বাচনে বিজয়ের পর তিনি আইনমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। মন্ত্রণালয়ের অফিস কক্ষে একদিন তার সাথে নানা বিষয়ে কথা হচ্ছিল। তখন সংবিধান সংশোধনের একটা উদ্যোগ ছিল। তিনি বললেন আমাদের রাজনৈতিক বিভাজন হয়তো কোনদিন দূর হবে না। বললাম কারণ কি? বললেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সম্মত হয়েছিলেন জাতীয় ইস্যু গুলো নিয়ে যে বিভাজন রয়েছে সে গুলো দূর করতে। যেমন, শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা ও শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে বেগম জিয়া জাতীয় স্বার্থে নমনীয় হলেও শেখ হাসিনা মানছে না। তাই বিষয়টি জিয়ে থাকবে এবং রাজনৈতিক বিভাজন আরো বাড়বে। এটা দেশের জন্য ভাল নয়।
এ প্রসঙ্গে তিনি শহীদ জিয়াউর রহমানের একটা উদাহরণ দিলেন। বললেন শহীদ জিয়াউর রহমানের সময়ে তিনি উপ-প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তখন প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান। জিয়াউর রহমান প্রেসিডেন্ট গ্যালারিতে এসে প্রায় নিয়মিত সংসদ অধিবেশন ফলো করতেন।
একদিন তৎকালীন আওয়ামী লীগের নেতা ও বিরোধী দলীয় নেতা আসাদুজ্জামানের উত্তেজিত বক্তব্য জিয়ার রহমান প্রেসিডেন্ট গ্যালারি থেকে দেখলেন। অধিবেশন শেষ হতেই প্রেসিডেন্ট ডাকলেন প্রধানমন্ত্রীকে। প্রধানমন্ত্রী সংসদ ভবনে রাষ্ট্রপতির সাথে দেখা করলেন। জিয়াউর রহমান তখন জানতে চাইলেন বিরোধী দলীয় নেতা আজ এত ক্ষ্যাপে গেলেন কেন! তাঁর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে আসুন তিনি কেন এতটা রেগে আছেন। জাতীয় স্বার্থে হলে তার দাবী আমি পূরণ করবো।
শাহ আজিজুর রহমান প্রেসিডেন্টের নিকট থেকে ফিরে উপ-প্রধানমন্ত্রী মওদুদ আহমদের রুমে আসলেন। জানালেন প্রেসিডেন্ট ডেকেছিলেন এবং বিরোধী দলীয় নেতার কাছে গিয়ে আলোচনা করে চাহিদা জেনে আসতে পরামর্শ দিয়েছেন। শাহ আজিজুর রহমান তখন মওদুদ আহমদকে সঙ্গে যাওয়ার অনুরোধ করলেন। সরকারি দলের দুই নেতা বিরোধী দলের অফিস কক্ষে গেলেন। কক্ষে প্রবেশ করে কুশল বিনিময় শেষে শাহ আজিজুর রহমান তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বললেন কি হয়েছে আপনার। এত ক্ষ্যাপলেন কিয়ের লাইগা।
বিরোধী দলীয় নেতা তখন একটা ডিমান্ড নোট দিলেন। এসব পূরণ না হলে তিনি সংসদ থেকে ওয়াকআউট করবেন বলে সাফ জানিয়ে দিলেন।
ডিমান্ড নোট নিয়ে শাহ আজিজুর রহমান ও মওদুদ আহমদ পরে বঙ্গভবনে প্রেসিডেন্টের কাছে গেলেন। প্রেসিডেন্ট ডিমান্ড নোট দেখে বলে দিলেন তাৎক্ষণিকভাবে কোনটা সামাধান করবেন। আর কোনটা বলতে হবে বিবেচনায় আছে। তারা আবার বিরোধী দলীয় নেতার কাছে গিয়ে প্রেসিডেন্টের সম্মতির বিষয় জানিয়ে আসলেন। এভাবে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে সৌজন্য এবং সৌহার্দ্যের রাজনীতি আমাদের দেশে ছিল।
শেখ হাসিনা ভারত থেকে দেশে ফেরার পর ১৯৮১ সাল থেকেই জাতীয় ঐক্য বিনষ্টের সূচনা হয়। সেটা ধীরে ধীরে জাতিকে দুই মেরুতে বিভাজিত করে
।
শেখ হাসিনা বিহীন বাংলাদেশে আবারো জাতীয় ঐক্যের পথে হাঁটবে দেশ। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বিভাজন থাকবে। তবে জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নে পরস্পরের সহযোগিতার সংস্কৃতি ফিরে আসার শুভ সূচনা হয়েছে এই সংসদে। জাতীয় ইস্যুতে সব দল একমত হবেন এটাই সকলের প্রত্যাশা। জাতিকে বিভাজন নয়, ঐক্যের মাধ্যমেই এগিয়ে যাবে দেশ।
