সংসদ কোনো তোষামোদের জায়গা নয়, এটি দায়িত্ব পালনের জায়গা বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। আজ সোমবার জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘সরকারি দল কিংবা বিরোধী দল, সবার চিন্তাধারা এক হওয়া সম্ভব নয়। সবার চিন্তা একই রকম হলে এত লোকের বক্তৃতা বা এত সময় খরচের প্রয়োজন হতো না, দুই পক্ষ থেকে একজন করে কথা বললেই চলত। আমরা জনগণের ভালোবাসা এবং ভোটে নির্বাচিত হয়ে মহান আল্লাহর ইচ্ছায় এই সংসদে আসার সুযোগ পেয়েছি। তাই প্রত্যেকেই নিজের বিবেক, মহান আল্লাহ এবং প্রিয় জনগণের কাছে দায়বদ্ধ।’
বাজেট অধিবেশনকে বছরের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সেশন আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘এর ভিত্তির ওপরই পুরো বছরটি কেমন যাবে তা নির্ভরশীল এবং সব সদস্য সেই দায়িত্ববোধ থেকেই বক্তব্য দিয়েছেন।’
বাজেটের সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের চেয়ে এর গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্বের দিকে আলোকপাত করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সংসদ মূলত দুটি চাকার ওপর চলে—একটি সরকারি দল এবং অন্যটি বিরোধী দল। যেকোনো একটি চাকা অকেজো হয়ে গেলে পুরো যানবাহনটিই অচল হয়ে পড়বে। চাকায় পিন বা পেরেক মেরে ফুটো করার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। সংসদে কুচিকুচি করে কাটার পর ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানোর যে মানসিকতা, সেই বিভাজনের যন্ত্রটি ফেলে দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
জামায়াত আমির বলেন, সরকারি দলের সব অভিপ্রায় বিরোধী দল চোখ বন্ধ করে মেনে নেবে না, আবার সরকার ভালো কোনো উদ্যোগ নিলে বিরোধী দল কেবল বিরোধিতার খাতিরে তার বিরোধিতা করবে না। তিনি সরকারি দলকে বিরোধী পক্ষকে সম্মান করার এবং বিরোধী দলকে সরকারকে সংগত কারণে সহযোগিতা করার মানসিকতা রাখার আহ্বান জানান।
সংসদে নিজের নবীণত্বের কথা স্বীকার করে জামায়াত আমির বলেন, নবীণরা প্রবীণদের কাছ থেকে ভালো কিছু শিখতে চায়, মন্দ কিছু নয়। অতীতে সংসদে দাঁড়িয়ে ব্যক্তিকে তোষামোদ করার জন্য গান, কবিতা ও স্বপ্নবিলাস করার যে সংস্কৃতি ছিল, তার তীব্র সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের ট্যাক্সের টাকা খরচ করে সংসদকে তোষামোদের জায়গায় পরিণত করা উচিত নয়। এটি দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার এবং দায়িত্ব পালন করার জায়গা। ব্যক্তিকে খুশি করতে গিয়ে অন্যকে আঘাত করার এবং চরিত্র হননের যে 'ব্যাড কালচার' অতীতে ছিল, স্পিকারের মাধ্যমে তা পুরোপুরি বন্ধ করার জোর দাবি জানান তিনি।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সরকারি দলের কেউ কেউ এই সমালোচনাকে স্বাগত জানিয়েছেন আবার কেউ বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। এই বৈচিত্রই সংসদের সৌন্দর্য। সম্পূরক বাজেটের ওপর কাটমোশন অবলীলায় অগ্রাহ্য করার প্রচলিত রেওয়াজের সমালোচনা করে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, এবার বিরোধী দল ও সরকারি দলের পক্ষ থেকে আসা যৌক্তিক প্রস্তাবনাগুলো অর্থমন্ত্রী সংশোধিত আকারে গ্রহণ করবেন, যাতে দেশবাসী বোঝে এই আলোচনা কেবল সময়ের অপচয় বা কথার ফুলঝুরি ছিল না।
বাজেট বাস্তবায়নের দীর্ঘদিনের একটি কাঠামোগত সংস্কারের প্রস্তাব এনে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই-জুন অর্থবছর হওয়ার কারণে বছরের শেষের দিকে বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে তাড়াহুড়ো করে কাজ করা হয়। এর ফলে প্রথম ১০ মাসে যেখানে মাত্র ৪২ শতাংশ কাজ হয়, সেখানে শেষ সময়ে বাকি কাজ করতে গিয়ে অপচয় ও লুটপাটের দুয়ার উন্মুক্ত হয়। এই সংকট নিরসনে তিনি বাংলাদেশের অর্থবছরকে জুলাই-জুনের পরিবর্তে ক্যালেন্ডার ইয়ার বা জানুয়ারি-ডিসেম্বর মেয়াদে নির্ধারণ করার জোরালো প্রস্তাব পুনর্ব্যক্ত করেন, যা দেশের ক্ষতি হ্রাস করবে এবং কাজের গতি বৃদ্ধি করবে।
বিরোধীদলীয় নেতা মনে করিয়ে দেন যে, বাজেট সংসদে প্রণীত হলেও তা বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব অর্পিত থাকে রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ ও কর্মকর্তাদের ওপর, তাই তাদের মাধ্যমে জনগণের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।
শীর্ষনিউজ