Image description

খুলনার পাইকগাছা উপজেলার একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে দ্বৈত নাগরিকত্ব, অনিয়ম ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই প্রধান শিক্ষক ও তার পরিবারের সদস্যরা ভারতের পশ্চিমবঙ্গে স্থায়ীভাবে বসবাস করলেও বাংলাদেশে চাকরি ও সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন।

অভিযুক্ত দীপক চন্দ্র সরকার পাইকগাছা উপজেলার খড়িয়া নবারুণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। অভিযোগে বলা হয়েছে, তার নাম ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশেও ভোটার হিসেবে তালিকাভুক্ত।

দীপক চন্দ্র সরকার পশ্চিমবঙ্গের উত্তর বর্ধমানের শক্তিগড় থানার ২ নম্বর বরশুল গ্রামের ১ নম্বর মনমোহন দে রোডের পশ্চিমাংশের বাসিন্দা। তিনি আবার পাইকগাছা উপজেলার লস্কর ইউনিয়নের খড়িয়া ঢেমশাখালী গ্রামের ভোটার। দীপকের স্ত্রী অপর্ণা সরকার, মেয়ে জয়শ্রী সরকার, বড় ভাই দুলাল চন্দ্র সরকার ও তার স্ত্রী সুশীলা সরকার, ছোট ভাই তাপস সরকার ও তার স্ত্রী বর্ণালী সরকার ভারতের স্থায়ী বাসিন্দা ও ভোটার।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, পরিবারের সদস্যদের ভারতে রেখে তিনি বাংলাদেশে স্কুল পরিচালনার পাশাপাশি অনিয়ম ও নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করছেন। ২০২৪ সালে স্কুলে পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নিরাপত্তাকর্মী ও আয়া নিয়োগে অনিয়ম ও মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ওঠে। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয়রা বিক্ষোভ ও স্মারকলিপি প্রদান করেন। তবে দীর্ঘদিন পার হলেও নিয়োগ প্রক্রিয়া চূড়ান্তভাবে কার্যকর হয়নি বলে জানা গেছে। স্থানীয়দের দাবি, ওই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অন্তত ৩০ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে।

এ ছাড়া ২০২২–২৩ অর্থবছরে স্কুলের পাঁচ লাখ টাকার প্রণোদনা অনুদান ব্যয়ের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এর মধ্যে ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা শিক্ষার্থী ও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হলেও বাকি অর্থ ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা প্রকাশ চন্দ্র সরকার বলেন, প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে দ্বৈত নাগরিকত্ব ও অনিয়মের বিষয়ে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দেওয়া হলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, প্রাপ্ত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) নির্দেশে উপজেলা রিসোর্স অফিসার মো. ঈমান উদ্দিন ২০২৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর একটি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। এরপর ইউএনওর নির্দেশে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার শাহজাহান আলীর নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত টিম ২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি আরেকটি প্রতিবেদন জমা দেয়। একই বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর জেলা শিক্ষা অফিসার এস এম ছায়েদুর রহমান আরও একটি তদন্ত করেন।

 

সর্বশেষ চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো এক প্রতিবেদনে ইউএনও উল্লেখ করেন, ভোটার তালিকা অনুযায়ী প্রধান শিক্ষক দীপক চন্দ্র সরকারের নাম ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও রয়েছে। এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী কোনো শিক্ষককে অবশ্যই বাংলাদেশের নাগরিক হতে হয়। বিদেশি নাগরিকের এমপিওভুক্ত পদে থাকা প্রশ্নবিদ্ধ এবং বিধিবহির্ভূত।

এদিকে ইউএনওর প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে খুলনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) কানিজ ফাতেমা লিজা গত ২৬ ফেব্রুয়ারি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালকের কাছে প্রতিবেদন পাঠান। প্রতিবেদনে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর ও স্পর্শকাতর হওয়ায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানান। তবে অভিযোগের বিষয়ে চার মাস পার হলেও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানা গেছে।

দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করে প্রধান শিক্ষক দীপক চন্দ্র সরকার বলেন, আমি এ দেশের নাগরিক, ভারতের ভোটার নই। স্কুলের অনুদান আত্মসাৎ কিংবা নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগও সত্য নয়।