Image description

নদীভাঙন থেকে নতুন রাস্তা রক্ষা করতে তৈরি করা হচ্ছে তীর রক্ষা বাঁধ। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার আগেই ধসে পড়ছে বাঁধের বিভিন্ন অংশ। ফেটে গেছে ব্লক, আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো- সিমেন্টের বদলে বালু আর মাটি দিয়ে তৈরি নিম্নমানের এসব ব্লক ভাঙা যাচ্ছে হাত দিয়েই।

নেত্রকোনা সদর উপজেলার রৌহা ইউনিয়নের তেলীগাতী এলাকায় মগড়া নদীর তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণে এমন চরম অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এলাকাবাসীর তীব্র প্রতিবাদের মুখে বর্তমানে প্রকল্পের নির্মাণকাজ বন্ধ রেখেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, নেত্রকোনা সদরের বৃহৎ মা-র মাজারের পার্শ্ববর্তী তেলীগাতী থেকে ছোট গারা পর্যন্ত ২ হাজার ৪৫০ মিটার নতুন সড়ক ও নদীতীর রক্ষায় এই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৮৫০ মিটার অংশে নদীর ভাঙন রোধে ব্লক স্থাপন করা হচ্ছে। পুরো প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। আগামী ২৬ জুলাইয়ের মধ্যে এই কাজ শেষ করার সময়সীমা নির্ধারিত রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা জনি মিয়া, বেলায়েত করিম ও সুমন মিয়াসহ বেশ কয়েকজন ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, বাঁধের কাজে চরম ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। ব্যবহৃত ব্লকে প্রয়োজনীয় সিমেন্ট দেওয়া হয়নি, বরং বালু ও মাটির পরিমাণ বেশি থাকায় হাত দিয়েই তা গুঁড়ো করা যাচ্ছে। এই বর্ষায় বাঁধের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে এবং ব্লক দেবে গেছে।

বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী বলেন, এখনো নদীতে পুরোপুরি পানিই আসেনি, তাতেই বাঁধের এই দশা! এই বর্ষায় যখন নদীর পানি বাড়বে এবং মাটি নরম হবে, তখন পুরো বাঁধ ধসে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। সরকারের এতগুলো টাকা পুরোটাই জলে যাচ্ছে। আমরা এই নিম্নমানের কাজ থেকে পরিত্রাণ চাই এবং এর সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।

অনিয়মের অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করতে পারেননি এলজিইডির নেত্রকোনার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ওয়াহিদুজ্জামান। তবে তিনি পুরো বিষয়টিকে কিছুটা ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন।

তার দাবি, মূল সাইটে ঢালাই করা ব্লকগুলোর মধ্যে প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ ব্লক চুরি হয়ে যাওয়ায় ঠিকাদার বাইরে থেকে কিছু ব্লক আনিয়েছিলেন। সেগুলো নিম্নমানের হওয়ায় স্থানীয় জনগণ ও এলজিইডির কর্মকর্তারা মিলে কিছু ভেঙে ফেলেছেন এবং বাকিগুলো সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে। ইতোমধ্যে সেই নিম্নমানের ব্লকগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলেও তিনি জানান।

বাঁধ দেবে যাওয়ার বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, এবার চৈত্র মাস থেকেই আগাম বৃষ্টি (আর্লি রেইন) শুরু হয়েছে। বাঁধের ওপরের অংশের কাজ এখনো বাকি থাকায় বৃষ্টির পানি নিচ দিয়ে ঢুকে মাটি সরিয়ে ফেলেছে, ফলে দু-এক জায়গায় একটু দেবে গেছে। ব্লক পুরোপুরি সেটিং হয়ে গেলে আর এই সমস্যা থাকবে না। আগামী ২৬ জুলাইয়ের মধ্যে কাজ শেষ না হলে প্রয়োজনে শুধু সময় বাড়ানো হবে, কিন্তু প্রকল্পের ব্যয় কোনোভাবেই বাড়ানো হবে না বলে স্পষ্ট জানান তিনি।

কাজের মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র মাসখানেক বাকি থাকলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। স্থানীয়দের প্রতিবাদের মুখে ঠিকাদার কাজ বন্ধ রাখায় এবং বর্ষা কড়া নাড়ায় নতুন রাস্তা ও বাঁধের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্প যদি উদ্বোধনের আগেই ধসে পড়ে, তবে তা সরকারি অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছুই হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।