আশ্রয়ণ প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের মাথার ওপর স্থায়ী ছাদ নিশ্চিত করা। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাস্তবায়িত এ প্রকল্পে খরচ হয়েছে ১১ হাজার কোটির বেশি টাকা।
কিন্তু দেশের বিভিন্ন জেলায় আশ্রয়ণ প্রকল্প সরজমিনে ঘুরে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। কোথাও বরাদ্দ পাওয়া পরিবার ঘরে থাকছে না, কোথাও সরকারি ঘর বিক্রি হয়ে গেছে মোটা অংকের টাকায়, আবার কোথাও বছরের পর বছর খালি পড়ে থাকা ঘর মাদকসেবী ও জুয়াড়িদের আস্তানায় পরিণত হয়েছে। বণিক বার্তার অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অনেক প্রকল্পেই প্রকৃত উপকারভোগীর পরিবর্তে স্থানীয় প্রভাবশালী, মধ্যস্বত্বভোগী কিংবা অননুমোদিত ব্যক্তিরা ঘর দখল করে আছেন।
ঢাকার কেরানীগঞ্জ উপজেলার রোহিতপুর ইউনিয়নের সাহাপুর (ধর্মশুর) আশ্রয়ণ প্রকল্পে ২০২২ সালে ৪৫টি ঘর ভূমিহীন ও গৃহহীনদের বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। গতকাল সরজমিনে দেখা যায়, ৪৫টি ঘরের ২১টিতেই তালা ঝুলছে। তালায় জমে থাকা মরিচা ও চারপাশের মাকড়সার জালই বলে দিচ্ছিল, দীর্ঘদিন ধরে এসব ঘরে কেউ থাকে না।
অন্যদিকে যে ২৪টি ঘরে মানুষ বসবাস করছে, তাদের অনেকেরই সরকারি বরাদ্দ নেই। অনুসন্ধানে জানা গেছে, কেউ স্থানীয় প্রভাবশালীদের সহায়তায়, কেউ আত্মীয়ের নামে বরাদ্দ পাওয়া ঘরে, আবার কেউ অর্থের বিনিময়ে এসব ঘরে থাকছে।
সরজমিনে দেখা যায়, রাহিমা নামের এক নারী তার প্রতিবন্ধী বোনের নামে বরাদ্দ পাওয়া ঘরে স্বামী-সন্তান নিয়ে থাকছেন। সেলিনা নামের এক বিধবা নারী বাড়িভাড়া দিতে না পেরে স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতার সহযোগিতায় একটি খালি ঘরে ওঠেন। স্বামী পরিত্যক্তা আরেক নারী জানান, একজন সমাজকর্মী ও ‘জুলাই যোদ্ধা’র সহায়তায় তিনি সন্তানদের নিয়ে সেখানে উঠেছেন; পরে কাগজপত্র করে দেয়ার আশ্বাস দেয়া হয়েছে। তবে তাদের কারো কাছেই বৈধ কোনো বরাদ্দপত্র নেই।
এ বিষয়ে কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. উমর ফারুক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যারা নথির বাইরে বা অবৈধভাবে অবস্থান করছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। একই সঙ্গে যারা বরাদ্দ পেয়েও বসবাস করছেন না, তাদের বরাদ্দ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।’
কেরানীগঞ্জের চিত্রটি বিচ্ছিন্ন নয়। দেশের বিভিন্ন জেলার আশ্রয়ণ প্রকল্পেও মিলেছে একই ধরনের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার প্রমাণ।
রংপুর সদর উপজেলার কাটাবাড়ির বড়ভিটা ও বেলতলা আশ্রয়ণ প্রকল্পে দুই বছর আগে নির্মিত ৩৯টি ঘরের মধ্যে ৩১টিই খালি পড়ে আছে। যে আটটি ঘরে মানুষ আছে, তারাও বিদ্যুৎ না থাকা, ভাঙা রাস্তা, ডেবে যাওয়া টয়লেট ও ফেটে যাওয়া মেঝের মতো নানা সমস্যায় ভুগছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকায় কিছু ঘর এখন মাদকসেবীদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে।
আবার নওগাঁর রাণীনগরে মালিপুকুর আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১২টি ঘর বিক্রির অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারি কোনো অনুমোদন ছাড়াই স্ট্যাম্পে সই নিয়ে একেকটি ঘর ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ ১০ হাজার টাকায় হাতবদল হয়েছে। বর্তমানে সেখানে বসবাসকারী অনেকেই সরাসরি টাকা দিয়ে ঘর কেনার কথা স্বীকার করেছেন।
মালিপুকুর আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর বিক্রির অভিযোগ নিয়ে জানতে চাইলে রাণীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাকিবুল হাসান বলেন, ‘৩২টি ঘরের মধ্যে ১২টি বেচাকেনার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব ঘরের বরাদ্দ বাতিলের প্রক্রিয়া চলছে।’
একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে নাটোরেও। জেলার সাতটি উপজেলায় প্রায় ছয় হাজার ঘর নির্মাণ করা হলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক ঘর এখন পরিত্যক্ত। কোথাও প্রকৃত ভূমিহীন নন—এমন ব্যক্তিরা ঘর বরাদ্দ পেয়েছেন, আবার কেউ জীবিকার প্রয়োজনে অন্যত্র চলে যাওয়ায় ঘরগুলো জঙ্গলাকীর্ণ হয়ে পড়েছে। নাটোরের জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন বলেন, ‘যারা বরাদ্দ নিয়ে ঘরে থাকছেন না, তদন্ত করে তাদের বরাদ্দ বাতিল করা হবে।’
নির্মাণ শেষ হলেও দীর্ঘদিন ধরে ৬২টি ঘর উপকারভোগীদের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি যশোরের মণিরামপুরে। প্রায় দেড় বছর ধরে খালি পড়ে থাকা এসব ঘরের কোনো কোনোটি মাদকসেবী ও জুয়াড়িদের আস্তানায়, আবার কোথাও গবাদিপশুর খাদ্য ও জ্বালানি সংরক্ষণের স্থানে পরিণত হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সম্রাট হোসেন জানিয়েছেন, দ্রুত ঘরগুলো হস্তান্তরের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার মহিষকুড় আশ্রয়ণ প্রকল্পেও প্রায় ৪৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ১৮টি ঘর এক বছর ধরে অব্যবহৃত পড়ে আছে। জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ বলেন, ‘প্রকৃত ভূমিহীনদের দ্রুত সেখানে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়া হবে।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং বিভিন্ন জেলার অভিন্ন চিত্র ইঙ্গিত দিচ্ছে যে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর বরাদ্দ, তদারকি ও ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম এবং কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের এসব অনিয়ম বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘সর্বগ্রাসী দুর্নীতি আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পেও তার প্রভাব স্পষ্ট। ফলে একদিকে নিম্নমানের অবকাঠামো তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের পরিবর্তে অযোগ্য ব্যক্তিরা ঘর পেয়েছেন। এতে সরকারি সম্পদের অপচয় হয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘পুরো প্রকল্পের একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নিরীক্ষা করে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত সরকারি কর্মকর্তা, মধ্যস্বত্বভোগী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।’
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের অন্যতম আলোচিত একটি উদ্যোগ ছিল এ আশ্রয়ণ প্রকল্প। দুর্নীতির কারণে বিগত সময়ে প্রকল্পটি একাধিকবার গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে। দেশজুড়ে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর (শেখ হাসিনা) কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে।
প্রসঙ্গত, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে দেশে গৃহহীন পুনর্বাসন কর্মসূচি শুরু হয়। ১৯৯৭ সালে ভূমিহীন পরিবারকে জমিসহ ঘর দেয়ার কর্মসূচি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত বিভিন্ন পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় সাড়ে আট লাখের বেশি পরিবার স্থায়ী আবাসন পেয়েছে। আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় ৪ লাখ ৮৫ হাজারের বেশি পরিবারকে আড়াই শতাংশ জমিসহ আধাপাকা ঘর দেয়ার লক্ষ্য রয়েছে। প্রকল্পের এ পর্বের বেশির ভাগ ঘরও বরাদ্দ দেয়া হয়ে গেছে। শুরুতে ১ হাজার ১৬৯ কোটি টাকার প্রকল্পটি বিগত সরকারের সময় ধারাবাহিক সংশোধনের মাধ্যমে বেড়ে ১১ হাজার ১৪২ কোটি ৮৭ লাখ টাকায় পৌঁছায়।
বিগত সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্পের অব্যবস্থাপনা, অনিয়মের বিষয়ে গতকাল একাধিকবার যোগাযোগ করেও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন যশোর প্রতিনিধি আব্দুল কাদের, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি গোলাম সারোয়ার, নাটোর প্রতিনিধি মাহবুব হোসেন, নওগাঁ প্রতিনিধি আরমান হোসেন ও রংপুর প্রতিনিধি এসএম পিয়াল