Image description

রাজধানীর পানি সরবরাহ ও জলাবদ্ধতা নিরসনে নেওয়া একাধিক বড় প্রকল্পে অনিয়ম, দুর্নীতি ও নিম্নমানের কাজের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে ঢাকা ওয়াসার অধীন পদ্মা (জশলদিয়া) পানি শোধনাগার প্রকল্প এবং রামপুরা-কমলাপুর পাম্পিং স্টেশন নির্মাণে প্রকৌশলগত ত্রুটি, অতিরিক্ত ব্যয় এবং ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনের বিভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে কয়েকটি দাপ্তরিক নথিতে।

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন তৎকালীন প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম। তিনি ছিলেন পদ্মা-জশলদিয়া প্রকল্পের মহাদুর্নীতির হোতা ওয়াসার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তাকসিম এ খানের বিশেষ সহযোগী। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করা হলেও তৎকালীন ক্ষমতার দাপটে তা চাপা পড়ে। এখন এসবের কোনো হদিস নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন তাকসিম এ খান এবং প্রকৌশলী রফিকুল।

রাজধানীর মানুষকে নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়ে গত দেড় দশকে নেওয়া হয়েছিল একের পর এক বড় প্রকল্প। সে সময় বলা হয়েছিল, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমবে, ঢাকাবাসী পাবে আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনা। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা ভিন্ন। হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্প ঘিরে উঠেছে অনিয়ম-দুর্নীতি, নিম্নমানের কাজ ও অর্থ লোপাটের অভিযোগ। সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে পদ্মা-জশলদিয়া পানি শোধনাগার প্রকল্প।

অভিযোগ আছে, জুলাই বিপ্লবের আগে ওয়াসার তৎকালীন এমডি তাকসিম এ খানের সরাসরি তত্ত্বাবধানে চলে একের পর এক লুটপাট। বিশেষ করে তিন হাজার ৮০০ কোটি টাকার পদ্মা-জশলদিয়া পানি শোধনাগার প্রকল্পে হয়েছে পুকুরচুরি। পদ্মা প্রজেক্টে প্রতিদিন পানি আসার কথা ৪৫ কোটি লিটার। কিন্তু এখন আসে মাত্র ২৩ কোটি লিটার।

দুদকের নথি থেকে জানা যায়, সীমাহীন দুর্নীতির কারণে তিন হাজার ৮০০ কোটি টাকার পদ্মা প্রকল্প এবং ৪০০ কোটি টাকার কমলাপুর-রামপুরা পাম্পিং স্টেশন প্রকল্প দুটি ব্যর্থ প্রজেক্টে পরিণত হয়।

এছাড়া দাশেরকান্দি পয়োশোধনাগার এবং রামপুরা-কমলাপুর পাম্পিং স্টেশন নির্মাণ প্রকল্পেও চলে লুটপাট। এ নিয়ে দুদকের অনুসন্ধান শুরু হয় তাকসিম এ খানের সময়। তবে ক্ষমতার দাপটে তা চাপা পড়ে। ওয়াসার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুদকে অভিযোগ হলেও এটা নিয়ে মতামত বা নিষ্পত্তি কিছুই মেলেনি।

ওয়াসার অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম বর্তমানে ওএসডি হিসেবে আছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তাকে ওএসডি করা হয়। ওই সময় তাকসিম এ খানের প্রধান সহযোগী হিসেবে তাকে প্রকল্প পরিচালক পদে বসানো হয়েছিল।

অভিযোগ আছে, বর্তমানে ওয়াসার সিনিয়রিটির তালিকায় এক নম্বরে থাকায় রফিকুল ইসলাম ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতির জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রধান প্রকৌশলীর পদে বর্তমানে একজনকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, বিভিন্ন মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট আমলের এই কর্মকর্তা জোর তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন।

পদ্মা-জশলদিয়া প্রকল্পের দুর্নীতির হোতা সাবেক এমডি তাকসিম এ খান এবং তার সহযোগী প্রকল্প পরিচালক ছিলেন প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম। এর বাইরে ছিলেন চীনা ঠিকাদারের (সিএএমসিই) লোকাল এজেন্ট দরবেশখ্যাত সালমান এফ রহমান। আরো অভিযোগ আছে, এই লুটপাটের প্রকল্প থেকে প্রাপ্ত অর্থ মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং বোন শেখ রেহানার কাছে সরাসরি পৌঁছে দিতেন তাকসিম এ খান। ওই টাকা আওয়ামী লীগের দলীয় ফান্ডেও যেত বলে অভিযোগ আছে।

তিন হাজার ৮০০ কোটি টাকার পদ্মা প্রজেক্ট থেকে প্রতিদিন ৪৫ কোটি লিটার পানি আসার কথা থাকলেও এখন আসে মাত্র ২৩ কোটি লিটার। দুদকের নথি থেকে জানা যায়, সীমাহীন দুর্নীতির কারণে পদ্মা প্রকল্প এবং ৪০০ কোটি টাকার কমলাপুর-রামপুরা পাম্পিং স্টেশন প্রকল্প দুটি ব্যর্থ প্রজেক্টে পরিণত হয়। পদ্মা প্রকল্পে নিম্নমানের পাইপ দেওয়ায় পাইপ দিয়ে কোনোদিনই ৪৫ কোটি লিটার পানি আনা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি বুঝতে পেরেই পানি সরবরাহ লাইন করতে বাধা দেন তাকসিম এ খান। তাই প্রতিদিন ৪৫ কোটি লিটার পানি না পাওয়ার অজুহাত হিসেবে বলা হতো, ডিস্ট্রিবিউশন লাইন না থাকায় ৪৫ কোটি পানি আনা যাচ্ছে না। চুক্তি মোতাবেক ৪৫ কোটি লিটার পানি না আনা হলেও ঠিকাদারকে ফাইনাল বিল দেওয়া হয়।

শুধু তাই নয়, প্রকল্পের সব কাজ না করা সত্ত্বেও ওয়ারেন্টি পিরিয়ডে ওয়াসা নিজের টাকায় প্রকল্পের কাজ করে ঠিকাদারের ১০% জামানতের ৩৮০ কোটি টাকা ঠিকাদারকে দিয়ে দেয়। এর মাধ্যমে প্রমাণ হয়, সাবেক এমডি তাকসিম এ খান এবং পিডি রফিক ওয়াসার স্বার্থ না দেখে ঠিকাদারের স্বার্থ দেখেছেন। বিনিময়ে তারা আর্থিকভাব লাভবান হয়েছেন।

নথি অনুযায়ী, পদ্মা-জশলদিয়া পানি শোধনাগার প্রকল্পে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিএএমসিই-এর সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির বিপরীতে ডাকটিল কাস্ট আয়রন পাইপ কে-৯ ক্লাস পাইপ আমদানির ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি নিয়ে দুদক তদন্তও শুরু করে। তদন্তের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞ মতামত নেওয়া হয়।

বুয়েটের মেটালার্জিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৎকালীন বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. আহমেদ শরীফ স্বাক্ষরিত মতামতে বলা হয়, প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদনে পাইপলাইন সংস্থাপনের জন্য মোট প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। তবে এতবড় প্রকল্পে পাইপলাইনের ক্ষেত্রে যে মানদণ্ড অনুসরণ করা প্রয়োজন, সেখানে ব্যবহৃত কে-৯ ক্লাস পাইপ যথেষ্ট উপযোগী নয় বলেও মত দেওয়া হয়। নথিতে উল্লেখ করা হয়, এ ধরনের বড় প্রকল্পে কে-১০ ক্লাস পাইপ অধিক উপযোগী।

বিশেষজ্ঞ মতামতে আরো বলা হয়, চুক্তিপত্রে ডাকটিল কাস্ট আয়রন পাইপ কে-৯ উল্লেখ থাকলেও এর প্রযুক্তিগত বিবরণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে ভবিষ্যতে কাজের মান নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমনকি চুক্তির একটি ধারা উদ্ধৃত করে বলা হয়, বাস্তবায়ন চলাকালে কোনো ভুল বা ঘাটতি ধরা পড়লে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এমন ধারা ভবিষ্যতে দায় এড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে।

প্রকল্পের শুরুতেই আরেকটি বড় অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স চায়না সিএএমসিই ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির সময় যথাযথ দরকষাকষি না করায় ওয়াসার প্রায় হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ওয়াসার সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, প্রকল্পের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়েছিলেন।

এদিকে, ওয়ারেন্টি মেয়াদের মধ্যেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজ ওয়াসা ১০৫ কোটি টাকা খরচ করে নিজে করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে ওয়াসার ভেতরেও ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। বৈদেশিক ঋণনির্ভর প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে ঢাকা ওয়াসার মোট ঋণ প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে বলে জানা গেছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এসব প্রকল্প যদি কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত এই ঋণের দায় জনগণের ঘাড়েই চাপবে।

এরই মধ্যে ওয়াসা পানির দাম ১৬ বার বাড়ায়। অথচ পানি সরবরাহ ও সেবার মান নিয়ে নগরবাসীর অভিযোগ কমেনি। অনেক এলাকায় এখনো পানিতে দুর্গন্ধ, ময়লা ও অনিয়মিত সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে।

ওয়াসার সিবিএ সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেন পাটওয়ারী বলেন, আমি দীর্ঘদিন ওয়াসায় ঢুকতে পারিনি। অনেক কিছুই জানি না। সে সময়কার ওয়াসার এমডি তাকসিম এ খান অনেক দুর্নীতি করেছেন, এটা সবারই জানা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওয়াসার এক কর্মকর্তা বলেন, পদ্মা-জশলদিয়া প্রকল্পে নিম্নমানের পাইপ বেশি সক্ষমতার অবস্থান ব্যাখ্যা করে লুটপাট করা হয়েছে। তিনি বলেন, তাকসিম এ খানের খাস লোক তৎকালীন পিডি প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম। তিনি দুর্নীতি করে শত শত কোটি টাকা লোপাট করেছেন।

পদ্মা পানি শোধানাগার নির্মাণ প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী এমএ রশিদ বলেন, আমি ঢাকা ওয়াসার পদ্মা পানি শোধনাগার নির্মাণ প্রকল্পের শুরু থেকেই প্রকল্প পরিচালক হিসেবে সাত বছর দায়িত্ব পালন করি। প্রকল্পটি ছিল দুই ফেজে সাত হাজার কোটি টাকার, যার প্রথম ফেজ ছিল তিন হাজার ৮০০ কোটি টাকার। প্রথম ফেজে নিম্নমানের পাইপ আনতে বাধা দেওয়ায় শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার অত্যন্ত কাছের মানুষ ক্ষমতাধর এমডি তাকসিম এ খান আমাকে চাকরির শেষ পাঁচ বছর ওএসডি করে রাখেন। এর পর ওয়াসার এমডি তার পছন্দের লোক প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামকে সে সময় পিডির দায়িত্বে বসান। পরে বিভিন্ন কেনাকাটায় একের পর এক দুর্নীতি করে পদ্মা-জশলদিয়া প্রকল্পে লুটপাট করা হয়। ফলে আজ যেখানে দিনে ৪৫ কোটি লিটার পানি আসার কথা, সেখানে প্রতিদিন ঢাকায় আসছে ২২-২৩ কোটি লিটার।

এসব বিষয় নিয়ে পদ্মা-জশলদিয়ার সাবেক প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামকে সম্প্রতি বেশ কয়েকবার মোবাইল ফোনে কল করেও পাওয়া যায়নি। পরে তার দুর্নীতির নির্দিষ্ট কিছু প্রশ্ন জানতে কয়েক দিন আগে তাকে এসএমএস করা হয়। তারও কোনো উত্তর দেননি তিনি।

এ বিষয়ে ওয়াসার এমডি আমিনুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, পদ্মা-জশলদিয়া প্রজেক্টের ডিজাইনে তো ত্রুটি ছিল। ট্রান্সমিশন লাইনের কাজ পুরোটা নেওয়া হয়নি। এজন্য পুরো সক্ষমতার প্রতিদিন ৪৫ কোটি লিটার পানি আমরা আনতে পারছি না। বর্তমানে দিনে ২৩ কোটি লিটার পানি ঢুকছে।

এ প্রকল্পের সাবেক পিডি প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামের দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়াসার এমডি আমিনুল বলেন, এ বিষয়ে আমার কোনো ধারণা নেই। তবে উনি (প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম) নির্দিষ্ট কোনো দায়িত্বে নেই, সংযুক্ত অবস্থায় আছেন।

তিনি বলেন, দুদকে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, এটা জেনেছি। বিষয়টি নিয়ে দুদক এখনো কোনো নিষ্পত্তি বা মতামত দেয়নি।

প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার জন্য দৌড়ঝাঁপ করছেনÑএ বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়াসার এমডি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিতে গেলে পানি সরবরাহ নিয়ে কাজ করেন এমন এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমি জুলাই আন্দোলনের পর এই মন্ত্রণালয়ে যোগদান করি। আমি কিছুই জানি না।

তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ে ছয় বছর আগের পুরাতন নথির অবস্থা আসলে বলা কঠিন। তবে তাকসিম এ খানের সময় যে দুর্নীতি হয়েছে, এটা আমরা গণমাধ্যমে কিছু কিছু জানতে পেরেছি।